শনিবার ০৪ এপ্রিল ২০২০

২১ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

মাহমুদুল হাসান

মার্চ ২৬,২০২০, ০১:২০

মার্চ ২৬,২০২০, ০১:২০

বড় ধরনের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

  • শনাক্তদের ১২ দশমিক ২৮ শতাংশ মৃত্যু
  • সারা দেশে আরও ১০টি পরীক্ষাগার চালু
  • সীমিত আকারে হলেও সমাজে ছড়িয়েছে ভাইরাসটি

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বে অন্তত বিশ হাজারের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত্যুর হিসাবে ইতালি এখন শীর্ষে। চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস বিশ্বের সবদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

বিদেশফেরত আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে করোনা দেশে সংক্রমিত হয়েছে। ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সমাজে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়।

অথচ দেশে মাত্র ৩৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। সেই হিসাবে আক্রান্তের মধ্যে দেশে মৃত্যুঝুঁকি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।

প্রতিবেশী ভারতের চেয়েও বাংলাদেশে প্রাণহানির বেশি ঝুঁকি রয়েছে। ভারতে সাড়ে পাঁচশতের বেশি আক্রান্তের বিপরীতে মারা গেছে মাত্র ১০ জন।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ৩৯ জনের বিপরীতে প্রাণহানি ঘটেছে পাঁচজনের। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে দেশে করোনায় মৃত্যুঝুঁকি আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ।

গতকাল কোনো ব্যক্তির শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা না হলেও একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।

গত তিনদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুও হারও বাড়তে শুরু করেছে। যারা করোনার প্রভাবে মৃত্যুল কোলে ঢলে পড়ছেন তারা অধিকাংশ দেশে অন্যের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন এবং তাদের সবার বয়স ষাটোর্ধ্ব। করোনার ইউরোপের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বেশি ভয়াবহভাবে আঘাত হানতে পারে বলে ধারণা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

সরকারের পক্ষ থেকে উত্তরণের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হলেও স্বভাবতই দেশের পরিস্থিতি শিগগিরই উন্নতি হচ্ছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। দেশে চলছে অঘোষিত লক ডাউন। এখনো বিদেশফেরত সবার হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তাই ছুটি ঘোষণা করে সরকার হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামাজিক অসচেতনতার জন্য সেটা উৎসবে রূপ নিয়েছে।

হুড়োহুড়ি আর অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে সবাই গ্রামে ফিরেছে। এতে হাজারো লোকের সংস্পর্শের মাধ্যমে রোগটি প্রান্তিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশেষজ্ঞরা।

তাই সরকার দ্রুত দেশের সব গণপরিবহন বন্ধ করে দেয়। এতেও থামানো যায়নি। তাই সেনাবাহিনীর মাধ্যমে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে চেষ্টা অব্যহত রাখা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, করোনা ভাইরাস এখন সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেশের বয়স্ক লোকদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই কোনো কোনো অঞ্চল বা জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি জ্বর, সর্দি কিংবা করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার উপসর্গ নিয়ে ফোন আসছে সে তথ্য বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআর সেখানে পরীক্ষা চালালে রোগের অবস্থা নির্ণয় করতে পারবে। তাই এই পন্থা অবলম্বনের পরামর্শ দেন তারা।

দেশের সর্বশেষ অবস্থা : করোনার ছোবলে গতকাল দেশে আরও একজনের প্রাণহানি ঘটেছে। এনিয়ে ভাইরাসটির প্রভাবে পাঁচজনের মৃত্যু হলো। এরা সবাই বিদেশফেরত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছিলেন।

রোগটি এখন আর ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সীমিত আকারে হলেও কম্যুনিটি সংক্রমণ হচ্ছে বলে আইইডিসিআর ধারণা করছে। গতকাল ৮২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলেও কারো শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি।

গতকাল বুধবার সকালে যিনি মারা গেছেন, তিনি গত ১৮ মার্চ কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছিলেন। তখন তিনি তার এলাকার একটি হাসপাতালে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

অবস্থার অবনতি হওয়ায় ২১ তারিখ থেকে তাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা দেয়া হয়। তার বয়স ছিলো ৬৫। তার ডায়াবেটিস ও হাইপার টেনশন ছিলো।

গতকাল করোনা সংক্রমিতদের মধ্যে আরও দুইজন সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছেন। এ নিয়ে মোট সাতজন সুস্থ হয়েছেন। এ পর্যন্ত দেশে ৩৯ জন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়েছে।

বর্তমানে আইসোলেশনে রয়েছেন ৪৭ জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৪৭ জন। বিশ্বের অনেক দেশেই করোনা কম্যুনিটি সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে দেশে করোনা সন্দেহে রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার পরীক্ষার কেন্দ্র বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজধানীর জনস্বাস্থ্য হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনার নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

আর ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসেস, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইইডিসিআরের ফিল্ড ল্যাবরেটরি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এ পরীক্ষা পদ্ধতি সমপ্রসারণ করা হয়েছে। সেখানে আজকের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে নমুনা পরীক্ষা শুরু হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাস শনাক্তের জন্য সরকার পরীক্ষাগার বৃদ্ধি করেছে।

এটা নিঃসন্দেহে ভালো একটি উদ্যোগ। এখন আমাদের যেকাজটা সবচেয়ে বেশি জরুরি সেটা হলো কোন অঞ্চল থেকে ফোন কল বেশি আসছে সেখানে অনুসন্ধান ও জরিপ চালিয়ে দেখতে হবে যে, রোগটা সমাজে ঠিক কতটা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে সেখানে লক ডাউন জারি করতে হবে।

এছাড়াও ভাইরাসটি কমিউনিটি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ভাইরাসটি সমাজে একবার ছড়িয়ে পড়লে আমাদের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। ব্যাপক প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সচেতন ভ্থমিকা পালন করা জরুরি। কিন্তু সেটা বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে না।

সরকার হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে ছুটি ঘোষণা করলেও সাধারণ মানুষ গ্রামে ছুটে গেলেন। এটা সুনাগরিকের বৈশিষ্ট হতে পারে না। সরকারেরও উচিত ছিলো আগে গণপরিবহণ বন্ধ করে ছুটি ঘোষণা করা।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, দেশে সীমিতভাবে কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে বলে আমরা মনে করছি।

কিন্তু কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন বলার আগে আমাকে বিস্তারিত তথ্যের বিশ্লেষণে বলতে হবে। লিমিটেড স্কেলে যে এলাকাটির কথা আমরা বলছি, সেখানে লোকাল ট্রান্সমিশন হয়ে থাকতে পারে ভেবে আমরা ওই এলাকাটিকে আমরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে সেটা প্রতিরোধ করার কার্যক্রম নিয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত এটা সারা বাংলাদেশব্যাপী ট্রান্সমিশন হয়েছে, এরকম কোন পরিস্থিতি এখনো হয়নি।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা প্রাথমিক পর্যায়ে আইইডিসিআরে করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হলেও এখন যেহেতু রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে, পরবর্তীতে সাসপেক্টেড রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে, সে কথা মাথায় রেখেই আমাদের পরীক্ষার পদ্ধতি আরেকটু সমপ্রসারণ করা হয়েছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আরও নতুন পরীক্ষাগার চালু করা হয়েছে।

বিশ্বের সর্বশেষ অবস্থা : করোনার প্রভাব বিশ্বের ১৯৫টি দেশ, অঞ্চল ও একটি আন্তর্জাতিক প্রমোদতরিতে আঘাত হেনেছে। এখন আর কোথাও করোনার ছোবল বাকি নেই। এ পর্যন্ত সারা বিশ্বের চার লাখ ৪ হাজার ৫৯৫ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

এরমধ্যে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৯ হাজার ৬০৩ জনের। এতে সুস্থ হয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৮৫৩জন। এখনও হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে তিন লাখ তিন হাজার ১৩৯ জন। চীনের উহান শহরে প্রথম আঘাত হানা এই ভাইরাসের প্রভাবে সেখানে ৮১ হাজার ২১৮ জন আক্রান্তক হোন।

এরমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৭৩ হাজার ৬৫০ জন আর মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার ২৮১ জন। এখন সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটনা ঘটেছে ইতালিতে সেখানে ৬৯ হাজার ১৭৬ জন আক্রান্ত হয়েছে বলে চিহ্নিত করা গেছে।

আর মৃত্যু হয়েছে ছয় হাজার ৮২০ জনের। সুস্থ হয়েছে মাত্র আট হাজার ৩২৬ জন। প্রতিবেশী দেশ স্পেনে ৪৭ হাজার ৬১০ জনের আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে।

এরমধ্যে সুস্থ হয়েছে মাত্র পাঁচ হাজার ৩৬৭ জন। আর প্রাণহানি ঘটেছে তিন হাজার ৪৩৪ জনের। জার্মানিতে এই মহামারির প্রভাবে ৩৪ হাজার ৯ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন।

মারা গেছে ১৭২ জন এবং সুস্থ হয়েছে তিন হাজার ৫৩২ জন। ইরানে ২৭ হাজার ৩১৭ জন আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৪৩ জনের।

আর সুস্থ হয়েছে ৯ হাজার ৬২৫ জন। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ৫৬২ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের এবং সুস্থ হয়েছে মাত্র ৪০ জন।

আমারসংবাদ/এআই