সোমবার ০৬ জুলাই ২০২০

২২ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

বশির হোসেন খান

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই ০১,২০২০, ০৯:৫২

জুলাই ০১,২০২০, ০৯:৫২

‘আমি বলি ১০ মিনিট সবাই বলে ১৩ ঘণ্টা’

আমি তো মনে করেছি ১০ মিনিট, সবাই বলে ১৩ ঘণ্টা আটকে ছিলাম! পানির নিচে থাকা অবস্থায় পানি খেয়েছিলাম। কিন্তু প্রস্রাব করার পর পেট ক্লিয়ার হয়ে গেছে।

এরপর উপরে উঠে আসি! গত সোমবার সকাল ৯টা ১৩ মিনিটে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যাওয়া মর্নিং বার্ড লঞ্চে আটকে ১৩ ঘণ্টা জীবিত ছিলো দাবি করা সুমন বেপারী সাক্ষাৎকালে এ কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, আমি তো ওইখানে মৃত্যুবরণ করতে পারতাম। কিন্তু আল্লাহ তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মোটামুটি জ্ঞান ছিলো। আল্লাহ জ্ঞান দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। পানিও খেয়েছি। প্রস্রাব করার পর পেট ক্লিয়ার হয়ে গেছে। আমি লঞ্চের ডান পাশে ছিলাম। ডুবুরিরা উঠিয়ে বলেছে, আপনি ভালো আছেন। ডুবে থাকা পুরো সময়ই প্রার্থনা করে কাটিয়েছেন বলে জানান সুমন।

এদিকে, পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া লঞ্চে আটকে থেকে ১৩ ঘণ্টা জীবিত থাকার বিষয়টি নিয়ে চলছে তুমুল সমালোচনা। সুমনের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার অসামঞ্জস্যতাও পরিলক্ষিত হয়। সুমন বলছেন, তার কাছে মনে হয়েছে মাত্র ১০ মিনিট ছিলেন।

তবে, নিজে দুর্ঘটনায় পতিত হওয়া লঞ্চে আটকে থাকলে স্বাভাবিকভাবে প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে দুর্বিষহ মনে হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি ১৩ ঘণ্টাকে মনে করেছেন ১০ মিনিট! আর তার শারীরিক অবস্থা নিয়েও সন্দেহ দানা বেঁধেছে সবার মাঝে।

কেননা, দীর্ঘ সময় পানির নিচে আটকে থেকে বেঁচে থাকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকাটা অস্বাভাবিক। হাসপাতালে দেখা গেছে, সুমনের চোখে মুখে নেই কোনো ক্লান্তি কিংবা অসুস্থতার ছাপ। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবলীলভাবেই।

সুমন দাবি করেন, সকাল থেকেই তার মনে হচ্ছিলো লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটবে। তাই বেঁচে থাকার জন্য বয়ার দিকে নজর ছিলো তার। সুমনের এই বক্তব্যও নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

সুমন বেপারী আরও বলেন, লঞ্চের ডানে ছিলাম, নিচতলা মেশিন রুমের ডানে। একসাইড তলাইতেছে ওই সাইডে দৌড় দিছি। সঙ্গে সঙ্গে ওই সাইড তলাইয়া গেছে। একটা রড ধইরা রাখছি ওইডা ছাড়ি নাই। যেখানে ছিলাম আমি নড়ি নাই, ওইখানেই ছিলাম। দোয়া দুরুদ পড়েছি। আমি ওখানে অজু করেছি।

লঞ্চে কতজন যাত্রী ছিলো এই প্রশ্নের উত্তরে সুমন বলেন, সর্বমোট ৯০ থেকে ৯৫ জনের বেশি যাত্রী হবে না। সুমন বেপারী বলেন, তিনি ফেরি করে ফল বিক্রি করেন। নদীতে একটি নৌকাতেই তার বসবাস। বর্তমানে মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা এখন বেশ ভালো।

জানা গেছে বুড়িগঙ্গা নদীর সদরঘাটের শ্যামবাজারে লঞ্চডুবির ঘটনায় ১৩ ঘণ্টা পর সোমবার রাত ১০টার দিকে সুমন বেপারী (৩২) নামে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। সুমন বেপারী মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ি থানার আব্দুল্লাপুর গ্রামের ফয়জুল বেপারীর ছেলে।

আট ভাইবোনের ম?ধ্য ফয়জুল সবার ছোট। তিনি সদরঘাটে ফেরি করে ফল বি?ক্রি করতেন। উদ্ধারের পরপরই তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হয়।

সেখানে তাকে কিছুক্ষণ অক্সিজেন দেয়ার পর আশঙ্কা কেটে গেছে। তারপর তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডের ইউনিট-৫ এর ২২ নম্বর বেডে সহযাগী অধ্যাপক দূর্বা হালদারের আন্ডারে ভ?র্তি করা হয়।

ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আমজাদ হোসেন বলেন, তিনি পা?নিতে দীর্ঘক্ষণ থাকার সিম্পটম ছিলো। অক্সিজেনসহ নিয়মানুযায়ী চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি।

পানির মধ্যে এত ঘণ্টা থাকার পরও কীভাবে জীবিত থাকে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার ডাক্তারি জীবনে এমন ঘটনা দেখিনি। এটা সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়ে রেখেছেন।

বাংলাদেশ সিভিল ডিফেন্স অ্যান্ড ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, উদ্ধার অভিযানে লিফট পদ্ধতিতে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারের সময় উনাকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা দেখতে পায় এবং জীবিত থাকার সম্ভাবনা থেকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়।

তিনি আরও বলেন, সম্ভবত লঞ্চের ইঞ্জিন রু?মের ভেতর কোনো এক জায়গায় ছিলেন, যেখানে অক্সিজেন ছিলো। ওই অক্সিজেনে তি?নি দীর্ঘক্ষণ বেচে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার সকালে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ রুটের মর্নিং বার্ড লঞ্চ ডু?বির ঘটনায় আটজন নারী, তিনজন শিশুসহ ৩৩ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

আমারসংবাদ/এআই