বৃহস্পতিবার ০৯ জুলাই ২০২০

২৫ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল্লাহ্ আল-মামুন

জানুয়ারি ১১,২০২০, ১২:২১

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

রাজপথে দাঁড়ানো কি ছাত্রদের কাজ

জনগণ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে দাঁড়াবে, শাষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গলা উঁচিয়ে কথা বলবে, আইন ও বিচার বিভাগের কাজ তরান্বিত করবার জন্য সদা তাগাদা দিবে, কখনো আবার সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়বে এটাই স্বাভাবিক। দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য ও সরকারকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করবার মনোভাব নিয়ে এগুলো করে তারা। সরকার, তার অধীনস্থ নানা প্রতিষ্ঠান ও আপামর নাগরিক সমাজ একই সূত্রে গাঁথা। একটিকে ছাড়া অপরটি বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে না। বড়জোর নিজ গণ্ডির মধ্যে সাফল্য ব্যর্থতার দোলাচালে আটকে থাকে। জনগণের যে অগ্রসরমান গোষ্ঠী আন্দোলন, সংগ্রামের সাথে সবসময় একীভূত থাকে- তারা মূলত ছাত্রসমাজ। ছাত্রসমাজের হাত ধরে অতীতে বড় বড় সাফল্য এসেছে। ‘৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। এসকল আন্দোলন, সংগ্রামে ছাত্রসমাজ অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছে। কখনো বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ইতিহাসকে রাঙিয়েছে। বর্ণিল করেছে। আবার কখনো দুঃখ -বিষাদ- হতাশার স্মৃতিকে মাটি চাপা দিয়ে স্বপ্নকে জিইয়ে রেখেছে। ইতিহাস ছাত্রসমাজের পক্ষে কথা বলে। সাফল্যের কথা বলে। অপরিমেয় প্রাণশক্তি, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আত্মত্যাগের হার না মানা গল্প শোনায়। আমরা অভিভূত হই। তাদের পথপানে উদগ্রীব চেয়ে থাকি। ভাবি রাষ্ট্রে কোনো অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, বিচ্যূতি, হঠকারিতামূলক অবস্থা দেখা দিলে আলোর মশাল হাতে জাতির কাণ্ডারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। আমাদেরকে আশু ভয়াবহ বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। হয়তো তাই-ই ! কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ আগের মতো নাজুক অবস্থায় আর নেই। ৫২ থেকে ৯০ এর দুঃসহ দিনগুলো অনেক আগেই পেরিয়েছি। বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা বিরাজমান। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সুচারুভাবে দেশ চালাচ্ছে। অতিতের বিষাদময় দিনগুলো কাটিয়ে তরতর করে সুখী ও সমৃদ্ধির দিকে দেশ এগুচ্ছে। পিছনে ফিরবার সময় নেই। ইতোমধ্যে আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। ২০২১ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে নাম লিখাবো। আমাদের প্রবৃদ্ধির হারও ঈর্ষণীয় রকমের। উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে সামাজিক, অর্থনীতিক ও রাজনীতিক সূচকগুলো ঊর্ধ্বগামী। জীবনযাত্রার মানও সমাহারে বাড়ছে। খাতা-কলমে, রাজনীতির মাঠে, টকশোর জমকালো গোল টেবিলে, আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন সূচকে আমরা ক্রমাগত এগুচ্ছি তো এগুচ্ছিই। বিরাম নেই। নিরবচ্ছিন্নভাবে সামনের দিকে আগুয়ান। এগুলো দেখে উপরওয়ালারা নিশ্চয়ই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে কোমল পানিতে ঠোঁট ভিজিয়ে ক্রমাগত তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সূচক আর বাস্তব অবস্থার মধ্যে যোজন যোজন ফারাক! স্বাধীনতার ৪৯তম বছরে এসেও মানুষের মনে বিন্দুমাত্র শান্তি নেই। সবসময় অস্থিরতা কাজ করে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। পেরেশানি করে। এখন প্রশ্ন হলো, এরুপ বিরুপ পরিস্থিতির পিছনে কারা বা দায়ী? কারা বা স্বদেশের সমস্ত সুখকর অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে? উত্তরটা মনে হয় কম বেশি সকলেরই জানা। বা বলতে গেলে এর প্রকৃত কারণসমূহ খুঁজে বের করা মোটেও কষ্টসাধ্য নয়। আসলে বাংলাদেশের প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা শোচনীয়। দুর্নীতি সর্বাঙ্গে ছেয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানসমূহ একেবারে বিকল হয়ে পড়েছে। নামসর্বস্ব চলছে। হর্তাকর্তারা আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নিজেদের আখের গোছানোতে মরিয়া। ফলাফল যা হবার তাই হচ্ছে। একের পর এক সমস্যা উদ্ভূত হচ্ছে। একটার সমাধান করতে না করতেই আরও হাজারটা সামনে আসছে। পরিস্থিতি ক্রমাগত ঘোলাটে হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমানে কোনো সমস্যার সমাধান চাইতে গেলে রাজপথে জড়ো হতে হয়, লাগাতার প্রতিবাদমূলক কর্মসূচি পালন করতে হয়।  উপরওয়ালাদের মনোযোগ আকর্ষণের কারণ হতে হয়; বিশেষতঃ প্রধানমন্ত্রীর। অন্যথায় সব অপরাধ স্তূপীকৃত হয়ে একসময় মাটির সাথে মিশে যায়। বিচারপ্রার্থীদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়। দেবালয়ে মুহুর্মুহু ক্রন্দন ধ্বনিতে ঈশ্বরের মহিমা জ্ঞাপন করা হয়। তার ওপর বিচারের সমস্ত দায়ভার চাপিয়ে জাগতিক বিচারকার্যের ইতি টানতে হয়। বিগত বছরের ঘটনাবলী তো তাই নির্দেশ করে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়ে নুসরাত হত্যার বিচার, আবরার হত্যার বিচার পেরিয়ে বর্তমানে কুর্মিটোলায় ধর্ষণের শিকার ঢাবি শিক্ষার্থীর ধর্ষণকারীর বিচার। ঘটনা পরম্পরায় একই রকম হালহকিকত দেখছি। প্রথমে মিডিয়ার মাধ্যমে ঘটনা দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর ন্যায় বিচারের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসছে, লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। সরকারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। একপর্যায়ে উপায়ন্তর না দেখে উপরওয়ালারা নড়েচড়ে বসেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়ার পর বর্ণিত কার্যক্রম শুরু করে। বাকিটা সময় তারা নীরব নিশ্চুপ থাকে। জিলাপির পেঁচের মতো কূটবুদ্ধি পাকিয়ে সারা বছরের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত থাকে। অন্ততপক্ষে এই নিরিখে একটা উদাহরণই যথেষ্ট। নারী সংগঠন নারীপক্ষ এক গবেষণার অংশ হিশেবে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৬টি জেলার ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছিলো। এসময় ৪,৩৭২ টি ধর্ষণের মামলা হয়েছিলো, সাজা হয়েছিলো মাত্র পাঁচ জনের। দশমিক শূন্য শূন্য এক শতাংশ। এর যথাযথ ফলাফল আমরা ২০১৯- এ এসে সুদ-আসলে হাতেনাতে পেয়েছি। গত বছর জানুয়ারি -ডিসেম্বর ১ হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অথচ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের সর্বস্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের উচিত ছিলো, দেশে আইন, সমাজ ও নীতি নৈতিকতা বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে যথাযথ বাছ-বিচার করে অপরাধীদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করা এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এদেশে ঘটছে ঠিক তার উল্টোটা।এক রকম অবস্থা ক্রমশ বাড়তে থাকলে দেশ যে রসাতলে যাবে তা কে না বলতে পারে? সবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, প্রজাতন্ত্রের অধিকর্তা হিসেবে দেশের প্রতিটা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিন তারা যেন তাদের ওপর অর্পিত দায়দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। দেশ ও জাতির গৌরবময় অবস্থানকে বিশ্ব দরবারে সমুন্নত রাখে। অন্যথায় স্বেচ্ছায় যেন পদ ছেড়ে দিয়ে যোগ্যদের জন্য যেনো উন্মুক্ত করে দেয়। আমরা চাই না বারংবার রাজপথে নেমে সারা বছর জুড়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে। শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আপনারা সহায়তা করুন। এর ব্যত্যয় ঘটলে ছাত্রসমাজ কিন্তু ঠোঁটোজগন্নাথের মতো ঘরে বসে থাকবে না, রাজপথে নেমে দাঁতভাঙা জবাব দিবে। অতিতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারলে সকলের বরং মঙ্গলই হবে। লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আমারসংবাদ/এমএআই