মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥নূরুল আমিন চৌধুরী

জানুয়ারি ১৫,২০২০, ১২:৫৪

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

মুজিববর্ষে সিনিয়র সিটিজেন প্রসঙ্গে

গত ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে ২০২০ মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক আয়োজিত কাউন্টডাউন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষণগণনার উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে ‘দৈনিক আমার সংবাদ’সহ দেশের সকল পত্র-পত্রিকায় সাড়ম্বর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে ‘মুজিববর্ষে নিশ্চিত হবে...’ শিরোনামে ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর লেখা একটা নিবন্ধের এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন- ‘মুজিববর্ষে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য কর্মসূচি নেয়া হবে। মুজিববর্ষে যারা যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন মুজিববর্ষের মধ্যেই সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে’। আবহমানকাল থেকে অবনমিত অবহেলাজনক অবজ্ঞাসূচক, হতাশাব্যঞ্জক ও ক্ষয়িষ্ণু ‘বৃদ্ধ’ শব্দটার পরিবর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ২০১৩ সালের অক্টোবরে ঢাকাস্থ ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রবীণদের একটা অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছিলেন, ‘দেশের ষাটোর্ধ বয়সি নাগরিকরা এখন থেকে ‘বৃদ্ধ’ নয়, রাষ্ট্রের ‘সনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে পরিচিত ও সম্বোধিত হবেন’। তিনি অসহায় সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়েকটি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তন্মধ্যে ছিল- তাদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। দেশের সকল হাসপাতালে বিনা খরচে বা কম খরচে অগ্রাধিকারভিত্তিক চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা। বিশেষ প্রয়োজনে কোথাও যাতায়াতে সকল যানবাহনে বিনা ভাড়ায় বা নিম্নতম সহনীয় ভাড়ার সুবিধা প্রাপ্তি। ষাটোর্ধ বয়সি নাগরিকদের প্রতি এরূপ সন্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ ও তাদের রাষ্ট্রের ‘সিনিয়র সিটিজেন’র মর্যাদায় ভূষিত করণ ও তাদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধার কথাগুলোর প্রতি সমর্থন ও এর জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জ্ঞাপনপূর্বক রাষ্ট্রপতির ঘোষণার যথাযথ বাস্তবায়নের আহ্বান সম্বলিত আমার লেখা একটা ছোট্ট নিবন্ধ দেশের কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। রাজধানী ঢাকায় কতিপয় মহৎ ব্যক্তির উদ্যোগে ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ’ নামে অনেক আগেই একটি কল্যাণমূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় একটি ‘জেরিয়াট্রিক হসপিটাল’সহ বহুতল ভবন বিশিষ্ট একটি প্রবীণ নিবাসও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার ধরন ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল নেতিবাচক পরিবর্তনের কারণে দেশের বেশির ভাগ প্রবীণ জনগোষ্ঠী তাদের স্ব্প্নাদরে লালিত সন্তান ও পরিবার থেকে কাঙ্ক্ষিত ন্যূনতম সেবা-যত্ন না পেয়ে অনেকেই দুর্ভাগ্যজনক অনাকাঙ্ক্ষিত অবজ্ঞা-অবহেলিত মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হন। সারা জীবন স্ত্রী-সন্তান, সংসারের জন্য অবিরাম হাড়ভাঙ্গা খাটাখাটুনির পর বয়সের ভারে ন্যুব্জ, কেউ কেউ জরা-ব্যাধিগ্রস্ত, কেউ কেউ আর্থিক অস্বচ্ছলতাজনিত অসহায়ত্ব, একাকিত্ব, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা-সেবা নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত জীবনের ভার বহন অনুপযোগিতার কারণে দুর্বিসহ জীবনের মধ্যে থেকে মৃত্যুর অপেক্ষায় ম্রিয়মান থাকেন। এদের অনেকেই কেবল স্ত্রী-সন্তান, সংসারের জন্যই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখাসহ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও বহুবিধ অবদান রেখেছিলেন একসময়ের কর্মজীবনে। তাই এদের কাছে সমাজ, দেশ ও সরকারের আবশ্যিক দায়বদ্ধতা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। আগারগাঁওস্থ প্রবীণ নিবাস ও একটিমাত্র জেরিয়েট্রিক হসপিটাল এরূপ ভুক্তভোগী অসহায় প্রবীণ তথা সিনিয়র সিটিজেনদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, যাতায়াত বা আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারছেনা। যদিও আবদুজ্জাহিদ মুকুলের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও বদান্যতায় গাজীপুরের হোতাপাড়ায় বিশাল এলাকাব্যাপী স্থাপিত ও পরিচালিত সার্বিক ব্যবস্থাপনা সমৃদ্ধ মনোরম নিরিবিলি পরিবেশের দৃষ্টিনন্দন বৃদ্ধাশ্রমসহ আরও কিছু প্রবীণ নিবাস এখানে ওখানে গড়ে উঠেছে, তাও প্রয়োজনের তুলনায় চাহিদা পূরণযোগ্য নয়। এমতাবস্থায় দেশের প্রথিতযশা দুজন সাবেক বিচারপতি আলী আসগর খান ও শিকদার মকবুল হক, পিজি হাসপাতালের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ডা. এবিএম আবদুল্লাহসহ (যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক) এবং আরও কতিপয় গুণীজনের সঙ্গে পরামর্শপূর্বক ‘সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামে অসহায় সিনিয়রদের সার্বিক সেবাদানের উদ্দেশে একটি সংগঠন গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ নিয়ে ২০১৯ সালে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ লাভের অনুমতির আর্জি জানিয়ে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে আবেদন করে, রাষ্ট্রপতির সহকারী সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেও ‘সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ গঠন করার মহৎ কর্মটি সাধন করার স্বপ্ন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎপ্রাপ্তি সাপেক্ষে দিকনির্দেশনা লাভের লক্ষ্যে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ব স্বীকৃত প্রভাবশালী নারী নেত্রীত্বের পুরোধা দেশ ও জনদরদি বর্তমান সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রাণান্ত উদ্যোগে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নার্থে ২০২০ সালে মহা আড়ম্বরে ও মহা উৎসাহব্যঞ্জক ধুমধামের সঙ্গে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, মানবতার মুক্তিদূত, বিশ্বনেতা, বাংলাদেশের স্বাধীনকার রূপকার, স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী তথা ‘মুজিববর্ষ’ পালন ও উদযাপনের বর্ষব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর নিবন্ধে উদ্ধৃত ‘মুজিববর্ষে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য কর্মসূচি নেয়া হবে’ ঘোষণাটা নিঃসন্দেহে বিশেষ ‘তাৎপর্যবহ’ বলে দেশের সকল অসহায় ‘সিনিয়র সিটিজেন’ নিশ্চিত উদ্বেলিত ও আবেগাপ্লুত হয়ে উঠার কথা। এই সূত্রে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশকৃত প্রস্তাবিত ‘সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র প্যাডে লেখা ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ডেসপ্যাচ শাখা কর্তক গ্রহণকৃত সিলমোহর প্রদত্ত আদেনপত্রটি উদ্ধৃত করা হলো। আশা করি এই লেখাটা ৭৬ বছর বয়সি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিনিয়র সিটিজেন, সর্বজনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ মহোদয়, ৭৪ বছর বয়সি বিশ্বনেত্রী, সিনিয়র সিটিজেন প্রধানমন্ত্রী স্বনামধন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও মুজিববর্ষ পালন প্রস্তুতি কমিটিসহ ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হবে এবং মুজিববর্ষে কীভাবে ‘সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য কর্মসূচি’ প্রণীত হবে সেটা ‘সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি গঠনের উদ্যোক্তারা জানতে পারবে এবং তাদের যথাযথ করণীয় নির্ধারণের সুযোগ পাবে’। কথায় বলে- ‘আশা’ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। বয়স যতই হোক, রোগ-শোকে জর্জরিত, শত আর্থিক অসঙ্গতি, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসার সমস্যাসহ শত বঞ্চনা-নিপীড়নের মধ্যে, এমনকি নিতান্ত মুমূর্ষুাবস্থায় থেকেও মানুষ মরতে চায়না। মানুষের সর্বোচ্চ আশার মধ্যে বেঁচে থাকার আকুতিপূর্ণ আশাটাই প্রধান। তাই তো ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার লেখা একটি কবিতার একটি পংক্তিতে, তার নিজের, বিশেষ করে মানুষের এই প্রধান আকুতিকে এভাবে প্রকাশ করে গেছেন- ‘মরিতে চাহিনা এ সুন্দর ভুবনে’। অনেকের জন্যই বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে বেঁচে থাকাটা খুবই কষ্টকর জেনেও আর কিছু সময়, আর কিছু দিন বেঁচে থাকার দূরাশাটা যেন ছাড়তেই পারে না। জীবনের মায়া, বেঁচে থাকার মায়া এমনই। তাই আমরা ‘সনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার সোইটি’র উদ্যোক্তারা ষাটোর্ধ বয়সি নাগরিক, যাদের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সিনিয়র নাগরিক অভিধায় অভিহিত করেছেন, তাদের মধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে অসহায় অবস্থায় থাকা দুর্ভোগে পতিত সহায়-সম্বল এমনকি আশ্রয়হীন অগণিত বয়স্ক মানুষ, তার পাশাপাশি দুস্থ এতিম-অনাথ পথশিশুদের কল্যাণে যথাসাধ্য অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গঠনমূলক ইতিবাচক সেবামূলক কিছু মানবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিজেদের উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমারা জানি, এরূপ সেবামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পর্যাপ্ত অর্থের প্রয়োজন। আর এরূপ সেবাদান কার্যক্রমে উৎসাহী-উদ্যোক্তাদের অনেকেরই সদিচ্ছা থাকলেও আর্থিক সঙ্গতি থাকে না। যাদের পর্যাপ্ত আর্থিক সঙ্গতি থাকে, তাদের অধিকাংশের মধ্যে এসব ব্যাপারে তেমন আবেগ-উৎসাহ থাকেনা। আবার প্রচণ্ড কর্মব্যস্তার মধ্যে থেকে এগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগও থাকেনা অনেকের। তাই, বয়স্কদের মধ্যে যারা অবসরপ্রাপ্ত, আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও শারীরিক মানসিক ও চিন্তা-চেতনার দিক থেকে, মোটামুটি সক্ষম ও উদার দয়ার্দ্র মানবিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন পরোপকারী সৃষ্টিশীল উদ্যমী মানুষ, তাদের মানবতাবাদী কল্যাণকর সেবামূলক যে কোনো মহৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত সাহসী সৎ উদ্যোগ সফল করতে অর্থের যোগানটা কষ্টসাধ্য বা দুঃসাধ্য হলেও একেবারে অসাধ্য নয়। প্রয়োজন কেবল সমমনা সৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন উৎসাহী উদ্যোক্তার এবং উৎসাহ প্রদানকারী সর্বসক্ষম ব্যক্তিবর্গের উদার মানবিক ও আন্তরিক সাহায্য ও সহযোগিতা। আমরা ‘সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র উদ্যোক্তারা যে মহান রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রের বয়স্ক তথা ষাটোর্ধ বয়সি মানুষদের সর্বপ্রথম ‘সিনিয়র সিটিজেন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎপূর্বক তার পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা অনুসারে কার্যক্রম শুরু করার প্রত্যাশা করছি। আশা করি, এমন একটা মহৎ কাজে সহায়ক হতে মহান আল্লাহ সংশ্লিষ্ট ও কাঙ্ক্ষিতদের দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক তাদের অন্তর ও চেতনার মধ্যে এ ব্যাপারে একটা ইতিবাচক সাড়া জাগাতে খাস রহমত নাজিল করবেন। লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট আমারসংবাদ/এমএআই