মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥শান্তা ফারজানা

জানুয়ারি ১৬,২০২০, ১১:২৮

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

নেই দাঁত তবুও ধর্ষক : কী করে পুলিশ...

“পুরুষ হূদয়-হীন, মানুষ করিতে নারী দিলো তারে আধেক হূদয় ঋণ...” পৃথিবীতে প্রতিটি পদক্ষেপেই নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। নারীরা মা, নারীরা বোন, নারীরা স্ত্রী, নারীরা কন্যা, নারীরা শিক্ষক, নারীরা চিকিৎসক, নারীরা ব্যবসায়ী, নারীরা মন্ত্রী। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারীরা অধিষ্ঠিত হচ্ছেন স্ব স্ব অবস্থানে। তথাপিও নারীরা নিরাপদ নয়। এ বিষয়টি খুবই দুঃখজনক যে স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও নারীরা ধর্ষিত হয়, সচেতন জনগণ বিচারের দাবি নিয়ে, ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে আন্দোলন করে এবং কোনো কোনো ধর্ষককে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতাধীন আনাও হয়। ধর্ষণ একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি। আজকাল পত্রিকার পাতায় কিংবা সোস্যাল মিডিয়াতে প্রচুর ধর্ষণের সংবাদ প্রায় দেখা যায়। ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই ধামাচাপা দেয়া হয়। ইতোপূর্বে একাধিক ধর্ষণের তেমন কোনো শাস্তিই হয়নি। আমরা তা জানতেও পারিনি। বিচ্ছিন্নভাবে দু’একটি ঘটনা মিডিয়াতে এলে আমরা কিছু সময়ের জন্য প্রতিবাদ করি। তারপর যার যার কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে যাই। আমি মনে করি, ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি হওয়ার মূল কারণগুলো হলো রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, আইনী ব্যবস্থার জটিলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রচার ও প্রসার, সুস্থ সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ না থাকা প্রভৃতি। আমরা যদি গত বছরের জরিপের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ২৩৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৭৭ জনকে। ধর্ষণের ঘটনায় আত্মহত্যা করে ১৯ জন। বছরটিতে ২৪৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। আর বছরটিতে ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় ৪ হাজার ৬২২ জন নারী ও শিশু। জরিপটিতে আরো বলা হয়েছে, গত বছর শ্লীলতাহানির শিকার হয় ৯১ জন। যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১৮৫ জন। ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। এবং একই সাথে কঠোর আইন প্রয়োগ করে ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পারিবারিকভাবে সন্তানের উপর খেয়াল রাখতে হবে যে, সে কোনো ধরণের অস্বাভাবিক জীবন যাপন করছে কিনা, কেমন বন্ধু বান্ধবের সাথে সে মিশছে। পর্ণ ছবি দেখানো নিষিদ্ধ করতে হবে। অশ্লীল পত্রপত্রিকা ও বইয়ের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলে বিবেচনা করতে পারার ক্ষমতা শিক্ষার্থীদের মনে প্রশমিত করতে হবে। ছোট বেলা থেকেই যদি সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে কারো মনে উৎসাহের রেখাপাত করা যায়, তবে অন্যায় থেকে অনেক দূূরে থাকার মন মানসিকতা তৈরি হবে। আইনের গতিশীল, সঠিক ও সুষ্ঠু প্রয়োগ থাকতে হবে। অপরাধী শাস্তি পায় না বলে আরো অপরাধ করার স্পর্ধা ও সুযোগ পেয়ে যায়। তাকে দেখে অন্যরাও অপরাধ করতে উৎসাহিত বোধ করে। আরো মানুষ অপরাধ করে। এইভাবে সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র ও দেশ কলুষিত হচ্ছে। এদেশেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণের সেঞ্চুরি হয়। তারপরও ধর্ষক বুক ফুলিয়ে রাস্তা ঘাটে হাঁটে। বেশিরভাগ ধর্ষককে বিভিন্ন দলগুলো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করছে। সেটাকে রোধ করতে হবে। সর্বোপরি অপরাধ যেই করুক, এ রকম বিকৃত মানসিকতা তথা এমন সব অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। আশা করা যায় কিছুটা হলেও সমাজ থেকে ধর্ষণ প্রবণতা কমবে। তা না হলে ভবিষ্যতেও ধর্ষণ প্রবণতা রোধ করা যাবে না। জেনেভা কনভেনশনে ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে অনেকেই ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে জাতিগত দমনের উদ্দেশ্যে এবং সেই ব্যবহার এখনো চলছে। যুদ্ধের ময়দানে ধর্ষণকে অন্যান্য মারণাস্ত্রের মত একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো। একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্তত দুই লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্রায় ২০ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। রুয়ান্ডায় এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ, কঙ্গোতে সাড়ে চার লাখ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলাকালে এই পরিসংখ্যান প্রায় একই রকম। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকান কিছু অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা চলমান থাকলেও আমাদের উপমহাদেশে শান্ত পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে। স্বাধীনতার সুবাদে আমাদের দেশে যুদ্ধভিত্তিক ধর্ষণ থামলেও আমাদের জাতীয় জীবনে আজো ধর্ষণ থামেনি। মানবাধিকার বিষয়ক একটি সংস্থার দেয়া তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩,৬৩৮ টি, যার ভেতরে গণধর্ষণ ছিলো ২,৫২৯ টি। ধর্ষকদের বিষাক্ত দৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি শিশু, প্রতিবন্ধী থেকে ষাটোর্ধ্ব মহিলা কেউই। এই সময়ের ভেতর ৬,৯২৭ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় ১,৪৬৭ জনকে। ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ১৫৪ জন। পরিসংখ্যানগুলো সত্যিই অনেক ভয়াবহ ও ব্যাদনা দায়ক। ধর্ষণের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি চিত্র, সেটি হচ্ছে পরিসংখ্যানে ধর্ষণের যে তথ্য-উপাত্ত দেয়া হয় সেটি কেবল পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগ অথবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এই সংখ্যার বাইরেও আছে বিশাল আরেকটি সংখ্যা, যেখানে নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করে না। বাংলাদেশের মত রক্ষণশীল দেশগুলোতে এই প্রেক্ষাপট কতখানি ভয়াবহ হতে পারে সেটি সহজেই অনুমেয়। ধর্ষিতারা লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতনকে গোপন করছেন, ধর্ষকরাও পার পেয়ে যায় নানা ফন্দি-ফিকিরে এই সংস্কৃতিই হয়তো ধর্ষণকারীদের ধর্ষণ করার সাহস যোগায়। উচ্চ শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এত উচ্চ শিক্ষা নিয়েও যৌন হয়রানি করে, ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু অসাধুরা ধর্মের জ্ঞান নিয়েও ধর্ষণে অংশ নেয়, নিম্নবিত্ত বাসের ড্রাইভার-হেলপারও ধর্ষণকামী হয়ে উঠে। ধর্ষণ করলে পার পাবার কোনো সুযোগ নেই এমন একটি সামাজিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কঠোর পরিণতির ভয়ে তাদের মন আর ধর্ষণকামী হয়ে উঠবে না। অন্য দেশের ধর্ষণের মহামারির সংবাদ শুনে আমরা তৃপ্তির ঢেকুর দেই, নিজের দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের পরিসংখ্যানগুলোর দিকেও একবার তাকিয়ে দেখা উচিত, আমরাও কিন্তু হাঁটছি ঘুণে ধরা একটি সমাজের দিকে, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা কমে আসছে দিনে দিনে। ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবির আগে এই দাবি করবো- আর যেন ধর্ষিত না হতে হয় কোনো বোনকে- কোনো নারীকে। বাংলাদেশ হোক একটা মেধাবান্ধব সমাজ। মেধাবান্ধব সমাজে যে গবেষণাটার প্রয়োজন সেটা এখানে করা হয় না। এখানে চলে বিভিন্ন ধরনের রাজনীতি, ইনক্লুডিং জেন্ডার রাজনীতি যেটা আজকাল শুরু হয়েছে। এখানে নারীবাদী হতে পারলে সুবিধা পাওয়া যায়। তাই সবাই নারীবাদী হতে চাচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ এপার্টমেন্টে যৌন নির্যাতন হচ্ছে। কারণ বাবা-মায়েরা কতটুকু খেয়াল রাখবে। আমাদের দেশে এখন যে অবস্থা চলছে, চকলেট খাইয়ে, মোবাইলের গেম দিয়ে যৌন নির্যাতন করা হয়। সব যৌন নির্যাতনই ধর্ষণ কিন্তু আমরা ধর্ষণ বলতে পাবলিক প্লেসে যেটা হয় সেটাকে নিয়ে মাথা ঘামাই। যেটা সমস্ত ধর্ষণের মাত্র ৫ ভাগ। বাকি ৯৫ ভাগ পরিবার কেন্দ্রিক-কাজের জায়গা, পরিবারের জায়গা। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও বিভিন্ন সময়ে ইয়াসমিন, বুশরা, শম্পা, তন্নী, মিতু, খাদিজা, নুসরাতসহ ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়ে হাহাকার করতে শুনেছি। যাদের ক্রদন- বেদনায় কলঙ্কিত বাংলাদেশের সার্বভৌম মানচিত্র। এই কলামটি লেখা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের নির্মম ঘটনায় ১৭ কোটি জনগণ আজ মর্মাহত। সেই সাথে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো করেই ধরা হলো সিরিয়াল রেপিস্ট ক্ষীণকায় মজনুকে। সত্যি যদি মজনু রেপিস্ট হয়ে থাকে তাহলে উপযুক্ত প্রমাণের মাধ্যমে দেশবাসীকে অবগত জানাতে হবে। আমি মনে করি, আমরা ৩০ লাখ শহীদের ত্যাগী মনোভাবী সন্তান। আর তাই, একদিন উচ্চ কণ্ঠে অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে আসবোই মশাল মিছিল হাতে। বিদ্রোহী কবির কণ্ঠে তাল মিলিয়ে বলবো, “বিশ্বে যা-কিছু এলো পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি, অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।” লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সাউন্ডবাংলা স্কুল এবং নির্বাহী পরিচালক, সিডব্লিউএফ আমারসংবাদ/এমএআই