মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥কাঙাল রাজ্জাক মিকা

জানুয়ারি ২১,২০২০, ১১:৫১

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

নারী নির্যাতন-হত্যা এ কেমন নৈরাজ্য!

মানুষের মধ্যে অপরাধ বোধ না থাকার কারণে একটি অপরাধ থেকে আরেকটি অপরাধের জন্ম হয়। যেভাবেই জন্ম হোক অপরাধ অপরাধই। প্রতিটি অপরাধই ঘৃণ্য। অপরাধে অভিযুক্ত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবার পরেও যদি এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে বা একই অপরাধ সংঘটিত হয় তবে বিষয়টি দেশ-জাতিকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তোলে। কারণ অপরাধ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য বেদনার, আতঙ্কের। আর দেশের জন্যে চরম কলঙ্কের। অপরাধের কারণে জনজীবনে অশান্তি নেমে আসে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অপরাধ দমনে সরকার পক্ষের কার্যকরী পদক্ষেপ থাকলেও এক শ্রেণীর মানুষ এটাকে পূঁজি করে জনমনে সরকারকে অযোগ্য, ব্যর্থ বলে দাঁড় করানোর অপপ্রয়াস চালায়। দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য এক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল ওঠে পড়ে লেগে যায়। যদিও এদেশের জনগণ এখন আগের মতো নেই— তারা এখন সচেতন। তারা নিজেরা নিজেদের ভালোমন্দ বুঝে, পাশাপাশি দেশের, দেশের সরকার পক্ষের, বিরোধীপক্ষের, আইন প্রশাসনের উন্নতি-অবনতির খোঁজ-খবর রাখেন। আলোচনা সমালোচনাও করেন। মোট কথা প্রযুক্তিগত প্রভাব এখন দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে সচেতন করে তুলেছে এ কথা সত্য। প্রশ্ন ওঠে, দেশের মানুষের মধ্যে যদি সচেতনতা বোধ জেগেই থাকে তবে প্রতিনিয়ত এত অঘটন, অপরাধের অবতারণা ঘটছে কেন ? সচেতন মানুষ কখনোই অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেনা। সচেতন জনগোষ্ঠীর দ্বারা কোনো অন্যায়ের জন্ম হতে পারে না। তবে দেশে বর্তমানে এতো অন্যায়, অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে কেন? দেশে ঘটমান নানাবিধকর অপরাধের মধ্যে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা অধিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের পক্ষকাল যেতে না যেতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৫৩ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছে এবং ২১৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে। নরপিশাচরা শুধু নারীর প্রতি সহিংসতা চালিয়ে বা ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি। ধর্ষণের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে নরপশুরা কয়েকজন ধর্ষিতাকে হত্যাও করেছে। এদের মধ্যে কয়েকটা রয়েছে গণধর্ষণ। তার মধ্যে রাজধানীর ভাটারায় ১২ বছরের কিশোরীকে বাসার সামনে থেকে ডেকে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করেছে নরপশুরা। পরে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনায় সারা দেশ কেঁপে ওঠে। সে ঘটনায় ধর্ষক মজনুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে মজনু জানিয়েছে, গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী রাজধানীর শেওড়া এলাকায় বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার জন্যে ক্যাম্পাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ওঠেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি ভুলে শেওড়ার অদূরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে নামেন। এরপর ফুটপাত ধরে হাঁটার সময় পেছন থেকে ধর্ষক মজনু তাকে তুলে নিয়ে গলফ ক্লাব সংলগ্ন ঝোপের ভেতর নিয়ে ধর্ষণ করে এবং তার ব্যাগ থেকে মোবাইল ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। তুমুল প্রতিবাদের মধ্যে র্যাব ধর্ষণের ঘটনায় মজনুকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার পরপরই ঢাকা কামরাঙ্গীর চরে ১৩ বছরের এক কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয়। ঘটনাটি মর্মান্তিক! প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ভণ্ড প্রেমিক ও সহযোগীরা মিলে এই নরকীয় গণধর্ষণ চালায়। গত ৯ জানুয়ারি এ ঘটনায় অভিযুক্ত ছয় জনের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ। চলতি বছরের এই পক্ষকালে সর্বশেষ ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে ঢাকা ধামরাইয়ে। ধর্ষিত মমতা আক্তারের বয়স ১৯ বছর। সে একটি সিরামিক কারখানায় কাজ করতেন। সোহেল এলাহী ফিরোজ নামের এক বখাটে বাসের মধ্যে তাকে ধর্ষণ করে এবং পরে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্যে হত্যা করে। এ ঘটনাতেও পুলিশ ধর্ষক সোহেল এলাহী ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাটি মর্মান্তিক ! তবে আশার কথা এই যে, দেশে এ বছর যে ক’টি ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনা ঘটেছে তাতে অভিযুক্ত প্রায় সকলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বিচারের জন্যে আদালতে সোপর্দ করেছে। আইন প্রশাসন সবসময়ই যোষণা দিচ্ছেন, কোনো ধর্ষকই ধরা ছোঁয়ার বাইরে যেতে পারবে না। পুলিশ তাদেরকে খুঁজে বের করে শাস্তির জন্যে আদালতে পাঠাবেই। আইন প্রশাসনের এরকম বক্তব্য জাতির জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের। বিভিন্ন ধর্ষণের ঘটনায় মানববন্ধন, মিছিল মিটিং এ প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। দেশবাসী থানায় ধর্ষণের মামলা দায়েরের পর দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য দাবিও জানিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন করে প্রকৃত দোষীদের সমুচিত শাস্তি দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। কিছু দিন পর হয়তো দুএকটি ধর্ষকের শাস্তির খবরও বেরিয়ে আসবে পত্র-পত্রিকায়। আবার কিছু কিছু ধর্ষক আইনের ফাঁক ফোকড়ে বেরিয়ে আসবে মামলা থেকে। তবে ব্যাপারটি এমন নয় যে, ধর্ষণের বিচার হচ্ছে না। অপরাধীরা অপরাধ করে আইন আদালত থেকে ছাড় পেয়েছে। যা দেখে মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়বে। এখন প্রশ্ন ওঠেছে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবার পরেও একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কেন ? নাকি যারা ধর্ষণের মতো অপরাধ করে তারা দেশের আইনশৃঙ্খলার তোয়াক্কা করে না, শাস্তির ভয় করে না। নাকি অপরাধীদের এটা মজ্জাগত অভ্যাস? বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ৫১.৬২ শতাংশই ধর্ষণ। প্রতি মাসে এ দেশে ৫৯৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। মামলার হিসাব মতে প্রতি মাসে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৪১টি। তবে প্রকৃত পরিসংখ্যানে ধর্ষণের সংখ্যা তারও বেশি। এর প্রধান কারণ, মান সম্মানের ভয়েও অনেক ধর্ষণের মামলা হয়না। আবার অনেক সময় ক্ষমতাধররা অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীদের চাপ সৃষ্টি করে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেয়। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে ৫১.৬২ শতাংশ ধর্ষণের মধ্যে সঠিক বিচার পায় মাত্র ১১.২৬ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনার। বাকী ৪০.৩৬ শতাংশ ধর্ষণের ঘটনা বিভিন্ন কারণে বিচারধীন থেকে যায় বছরের পর বছর কিংবা সুবিচার পায় না ভিকটিম। পরিসংখ্যান মতে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই তিন মাসে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনার মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৯৯টি। একই সময় গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১২৫টি। এ চিত্র থেকে বুঝা যায়, সমাজে এখনো নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। আমাদের সমাজে নারীকে এখনও মানুষ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। নারীকে ভোগের সামগ্রী মনে করা হচ্ছে। প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনার দ্রুতবিচার ব্যবস্থা না থাকায় এ দেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞগণ অভিমত ব্যক্ত করছেন। অনেকের মতে যারা রাস্তায় নারীকে টার্গেট করছে তাদের অনেকে নেশাগ্রস্ত। বিশেষ করে পরিবহনে যেসব নারী ইভটিজিং বা অন্যান্য যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে তাতে জড়িতদের অধিকাংশই বিকৃত মানসিকতার। নেশাগ্রস্ত ও বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তিদের মনে ভয় থাকে না। তারা অবলিলায় যেকোনো মন্দ কাজ ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশের আইন প্রশাসনকে এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় নেশা বা মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করা উচিত। এটা এখন সময়ের দাবি। অপরাধীকে চিহ্নিত করে সমুচিত বিচার করা যেমন আইন প্রশাসনের দায়িত্ব তেমনি দেশের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকার পক্ষের কর্তব্য। প্রতিটি জনগণই সরকারের কাছে জান মালের সঠিক নিরাপত্তা চায়। এটা প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার। এ অধিকার খর্ব করা মোটেও শুভকর নয়। দেশে প্রতিদিন অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী খুন বেড়েই চলছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন ওঠে দেশের নারীরা সরকারের কাছে কি নিরাপত্তা পাচ্ছেন ? পুরুষগণ তাদের অধিনস্ত নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় কতটা নিশ্চিত রয়েছেন? স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোনো মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আবার সে প্রাণ নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবে কি না— এ নিয়ে অন্যদের মনে যেমন সংশয় ছিলো বর্তমানে নারীদের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আবার সে সম্ভ্রম নিয়ে ঘরে ফিরতে পারবে কি না— এখন সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। একটি স্বাধীন দেশে এমন নৈরাজ্যকর অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। কারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার মতো দায়িত্ব আর দ্বিতীয়টি নেই সরকারের। নারী ধর্ষিত হবার পর থানায় মামলা হলে পুলিশ আসামি ধরবে, বিচারের জন্যে আদালতে সোপর্দ করবে। কোনোটার বিচার হবে আর কোনোটা আইনের ফাঁক ফোকরে হারিয়ে যাবে— এমন হলে দেশে নারী ধর্ষণ বন্ধ হবেনা। নারী ধর্ষণ বন্ধ করার জন্যে পূর্ব থেকে এর প্রতিকার ব্যবস্থা ঠিক করে রাখতে হবে। আর যদি কোনো নারীকে ধর্ষণের শিকার না হতে হয় তার জন্যে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইম জোনগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশী নজরদারী বহাল রাখতে হবে। নারী ধর্ষণ হতে পারে এমন স্পট চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হবে। দেশের প্রতিটি থানায় এ বিষয়ে পৃথক বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করে নিয়মিত সে টিমের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা, গুম ঠেকানোর এখনই উপযুক্ত সময়। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সবচেয়ে অধিক নারী ধর্ষণের দেশ আর বাঙালি হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ষক। লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট আমারসংবাদ/এসটিএমএ