মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥অরিত্র দাস

জানুয়ারি ২৪,২০২০, ০১:৩৬

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

অবৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতির বলি শিশুরা

সোজা হয়ে হাঁটতে পারার আগে আমাদের শিশুদের স্কুলের আঙ্গিনায় পাঠানো হয়। কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় মস্তবড় ভারি ব্যাগ। অ আ ক খ লিখতে না পারলে দেখানো হয় ভয়-ভীতি। ‘ম’ যে একটি ব্যঞ্জনবর্ণ সেটি না শিখিয়ে বলা হয়, মুখস্ত করো। অতঃপর মুখস্ত করার ক্ষমতা দিয়ে একজন শিশুর মেধা মূল্যায়ন করা হয়, বুদ্ধি-বিচক্ষণতা-সৃজনশীলতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না। যে যত বেশি মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শী, সে তত বেশি মেধাবী। আর এজন্য আমাদের শিশুরা বড় হয়ে আমলা হয়। বিশ্ববিখ্যাত ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, লেখক, দার্শনিক বা উদ্ভাবক হয় না। মা-বাবা গর্ব করে বলে, আমার সন্তান হাঁটতে শেখেনি; কিন্তু দেখো, এটুকু বয়সে কত সুন্দর ছড়া মুখস্থ বলতে পারে। এখানেই যেন অভিভাবকের সকল কৃতিত্ব। আর তখনই শিশুর মেধা অর্ধেক পচে যায়। মুখস্থবিদ্যা মেধার বাহক নয়, ধারকও নয়। ‘আত্মস্থ’ শব্দটার সাথে একজন শিক্ষার্থী পরিচিত হয় প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক স্তর পার করে যাওয়ার পর। আমার জীবনে আমি ‘আত্মস্থ’ শব্দটার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম কলেজে পড়া অবস্থায়। এক শিক্ষক পড়ানোর ফাঁকে এই দুর্লভ শব্দটা বলে ফেলেছিলেন। তখন জানতে পারলাম ‘আত্মস্থ’র স্থায়িত্ব বেশি, মুখস্থর কোনো স্থায়িত্ব নেই। শব্দটার প্রতি সেই থেকে একটা দুর্বলতা, একটা আফসোস এখনো কাজ করে। শব্দটার সাথে আগে কেন পরিচিত হলাম না। শব্দটার এত মহিমা, এত গুণ! অথচ শব্দটা এতকাল অব্দি অজ্ঞতার নিচে চাপা পড়ে ছিলো। কেউ ঘুণাক্ষরেও শব্দটার কথা বলেনি। তাই একপ্রকার বলতে গেলে, আক্ষেপের বশে সেই থেকে শব্দটা সঙ্গে করে চলেছি। সুযোগ পেলে কাউকে না কাউকে সহসা বলে দিই, মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করো। মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করো- এটা মূলনীতি হওয়া উচিত এদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর। যেমন সিঙ্গাপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো মৌলিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সমৃদ্ধি ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ‘থিংকিং স্কুলস, লার্নিং নেশন’ নামে একটি নীতি অনুসরণ করছে। যাতে বাচ্চারা চিন্তার মাধ্যমে মেধার চর্চা করতে পারে। অন্যদিকে এদেশে বাচ্চাদের বলা হয়, সারাদিন বই নিয়ে পড়ে থাকো, না পারলে মুখস্থ করো, না বুঝলেও মুখস্থ করো। এর ফলে এখানে অনেক শিশু গণিতের মতো বিষয়ও মুখস্থ করে। কেননা পরীক্ষা আসন্ন। পরীক্ষায় তো পাস করতে হবে। পেতে হবে জিপিএ-৫। অনেক চাপ মাথার ভিতর। আর তাই না বুঝে মুখস্থ করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীকে এতবেশি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় যে, সময় নিয়ে কোনো কিছু অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করার সুযোগ তার আর অবশিষ্ট থাকে না। ফলে জানার আগ্রহ, শেখার আগ্রহ, বোঝার আগ্রহ, সৃষ্টির আগ্রহ মরে যায়। তখন তার মধ্যে একটাই আতঙ্ক কাজ করে- পরীক্ষা। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে দেখেছি বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণির অর্ধেকের বেশি শিশু বাংলা রিডিং পড়তে পারে না। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শতকরা ৭৫ জন শিক্ষার্থী অংক করতে পারে না। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলার এবং ৬৮ শতাংশ গণিতের নির্ধারিত ধারণাগুলো অর্জন না করেই প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে। শিশুদের কথা ছেড়ে দিলাম, কিশোরদের কথা বলা যাক। আমার টিউশনির অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কলেজ পড়ুয়া সর্বাধিক শিক্ষার্থী ক্রিয়াপদ (ভার্ব) কাল (টেনস) বোঝে না। বাক্যগঠন করতে পারে না, ইংরেজিতে দু’লাইন লিখতে পারে না। তারা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে না পারে বাংলা, না পারে ইংলিশ। না পারার কারণ, তারা পরীক্ষার চাপের কথা মাথায় নিয়ে পড়ে। জানার আগ্রহ থেকে পড়ে না। জানার আগ্রহ থেকে পড়লে তারা পারতো, যেমন গল্প উপন্যাস আমরা জানার আগ্রহে, ভালোবেসে প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে পড়ি বলে। গল্পের কোথায় কী আছে, কে কোনো সংলাপ দিয়েছে তা সহজে ভুলি না। পরীক্ষা এবং মুখস্থ করা যেন হয়ে উঠেছে একে অপরের পরিপূরক। যা মেধাচর্চার জন্য ধ্বংসাত্মক। না বুঝে মুখস্থ করা এবং তথাকথিত ঘনঘন পরীক্ষায় বসার ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারেনি শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থা। মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করো- একথাটি কোনো বিদ্যালয়ের দেয়ালে লেখা আমার চোখে পড়েনি। তেমনি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে নয়, জানার উদ্দেশ্যে পড়ো- এই কথাটিও কোনো বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেখিনি। দেখবো কী করে? আমাদের বিদ্যালয়গুলো মানেই তো পরীক্ষালয়। অথচ বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেখেছি কেবল রাজনীতিক রাজনৈতিক বাণী। ‘শিক্ষা’ শব্দটির অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “শিক্ষা হলো তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না, বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’’ সেই বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক সিঁড়ি বা প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। হাতেখড়িও বলা চলে। যার অপর নাম মৌলিক শিক্ষা। মৌলিক শিক্ষা বলতে বোঝায় সর্বজনীন অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা, সকলের জন্য যা সমান আবশ্যিক। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত আবশ্যিক শিক্ষার কথা বলেছে ইউনেস্কো। সেই শিক্ষা ব্যবস্থায় জড়তা থাকবে কেন? জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্যায় চাপ থাকবে কেন? অসুস্থ প্রতিযোগিতা, আতঙ্ক, ভয় ও আত্মহননের প্রবণতা থাকবে কেন? বৈষম্য থাকবে কেন? বৈষম্য তৈরি করে পরীক্ষা। ভালো শিক্ষার্থী এবং খারাপ শিক্ষার্থীর ট্যাগ লাগিয়ে দেয় ঘনঘন পরীক্ষাপদ্ধতি। এই হতাশা একজন শিক্ষার্থীকে ভিতরে ভিতরে শেষ করে দেয়। আর এই ‘শেষ’-এর শুরু যদি হয় প্রাথমিক শিক্ষাজীবন থেকে তবে তো এখানেই সে পঙ্গু। বাকি পথ হাঁটবে কীভাবে! কোনো কোনো শিক্ষার্থীর এই হতাশা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী কাটিয়ে উঠতে পারে না। মৌলিক শিক্ষার করাঘাতে শিশুরা আত্মহত্যা পর্যন্ত করছে। এবছর সমাপনী এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেটের বিষাক্ত ফলাফলের ছোবলে কয়েকটি শিশু আত্মহত্যা করেছে। বুকে পাথর বেঁধে স্বীকার করতে হয়, হ্যাঁ শিশুরা আত্মহত্যা করেছে। এবং তা করেছে কেবল মৌলিক শিক্ষাগ্রহণ করতে গিয়ে। পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী জীবন সম্পর্কে সম্যক জানাবোঝার আগেই সে ডুব দিচ্ছে হতাশায়। এর চেয়ে দুঃখজনক ও অবিশ্বাস্য ঘটনা আর কী হতে পারে এ জগতে! আরিস্তোতল বলেছেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।’ কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের মন অসুস্থ করে তুলছে। কোমলমতি শিশুগুলোকে পরীক্ষা নামক নির্মমতার চাপে পিষ্ট হচ্ছে। শিশুদের তো এ বয়সে হতাশায় ডুবে যাওয়ার কথা ছিলো না; আত্মহত্যার পথ বেছে নেবার করার কথা ছিলো না। তবে কেন আত্মঘাতী হওয়ার পথ বেছে নিলো কয়েকটি শিশু? এই প্রশ্নটি শিক্ষাসংস্কারক তথা সরকারের প্রতি আমি রাখতে চাই। আমি চাই আমার এ প্রশ্নের উত্তর কোনো শিক্ষাসংস্কারক বা শিক্ষাবিদরা পত্রিকার পাতায় লেখার মাধ্যমে দেবেন। শিক্ষা অর্জনের পথগুলো হবে জলের মতো স্বচ্ছ এবং মসৃণ। জীবনের প্রথম জ্ঞান অর্জনে ভয় নয়, উৎসাহ জাগানোটাই যেন মুখ্য হয়। প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা। প্রতিযোগিতা জয়ী হতে সহায়তা করে বটে কিন্তু জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে না। কেননা প্রতিযোগিতা পরীক্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অপরদিকে জ্ঞানের শাখা প্রশাখাকে পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতার মধ্যে সারীবদ্ধ করে রাখা যায় না। গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, সৃষ্টিশীলতার পথ রুদ্ধ করা এবং প্রতিভা ক্ষয়ের অন্যতম কারণ এই হীন, অসুস্থ প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিহিংসা পরায়ণতাও তৈরি করে; প্রকৃতপক্ষে যথার্থ সদাশয় মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্যে করে না। বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি প্রাথমিক শিক্ষাকে মৌলিক শিক্ষা থেকে সরিয়ে নিয়ে করে ফেলেছে জিপিএ ফাইভ পাওয়ার একটা অন্তঃসারশূন্য প্রতিযোগিতা। জিপিএ৫- এর উন্মাদনা আমাদের শিশুদের শিক্ষাজীবনকে নিরানন্দময় তো করছেই, সাথে বিষিয়েও দিচ্ছে। জিপিএ ফাইভ ও ঘনঘন পরীক্ষার উদ্বেগে শিশুরা খেলোধুলা পর্যন্ত করতে পারছে না। বন্ধুদের সাথে মিশে শিশুসুলভ দুষ্টুমি টুকুও করতে পারছে না। পড়াশোনার বাইরের পৃথিবীটাকে তারা অবলোকন করতে পারছে না। ফলে তাদের শৈশব বলতে কিছু থাকছে না। কিন্তু হওয়ার কথা ছিলো উল্টো। শ্রেণিকক্ষে শিশুদের আতঙ্কে নয়, আনন্দে থাকা বাঞ্ছনীয়। জোর জবরদস্তি নয়, চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং শিশুদের দিতে হবে আনন্দঘন পরিবেশ। ওরা শিখবে খেলার ছলে। ক্লাস রুমে মুখ গোমড়া করে স্তব্ধ হয়ে বসে না থেকে বরং ক্লাসের অবসরে স্কুলের মাঠে দৌড়ে-ছুটে বেড়াবে। দাবা খেলবে। ফুটবল খেলবে। গোল্লাছুট খেলবে। তবলা বাজাবে। নাচবে গাইবে। যা মন চায় তা অকপটে তা জানাবে সবাইকে। প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত ব্যবস্থাটা এমনই হওয়া উচিত। যা আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দেখতে পাওয়া না গেলেও উন্নত দেশগুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। সমপ্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমণি বলেছেন, ‘পাবলিক পরীক্ষা ছাড়া সমাপনী পরীক্ষাগুলোতে পুরো গ্রেডিং সিস্টেম তুলে দিয়ে কীভাবে মূল্যায়ন করতে পারি, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।’ এ থেকে স্পষ্ট যে, হয়তো আগামীতে সমাপনী থাকবে না, তবে পরীক্ষা থাকবে। পরীক্ষার এই আনন্দহীন চক্র থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি নেই। তা হলে এখানে একটা প্রশ্ন দাঁড়ায়, যে শিক্ষাপদ্ধতির স্থায়িত্ব নেই, ভিত্তি নেই একসময় বাধ্য হয়ে তা তুলে দিতেই হয়। দুর্বল সৃজনশীল পদ্ধতিও একসময় তুলে দিতে হবে। তাহলে এমন শিক্ষানীতির প্রয়োগ করার দরকার ছিলো কি? মোট কথা, আমাদের দেশে শিক্ষা সম্পর্কিত জ্ঞান ও দূরদর্শিতা দুটোই অত্যন্ত কম। সংশ্লিষ্টরা তাদের প্রণীত শিক্ষাপদ্ধতির ভবিষ্যৎ ফলাফল কী হবে সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন বলেও মনে হয় না। এ-কারণে উপেক্ষিত হচ্ছে ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’। সেখানে বলা আছে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা ও নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা রাখা হবে। এবং এসএসসি পরীক্ষা তুলে নেওয়া হবে। সেখানে সমাপনী (পিইসি) এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার কথা উল্লেখ নেই। এর আগে স্বাধীন বাংলাদেশে আরো ছয়টি কমিশন বা কমিটির রিপোর্ট ঘোষিত হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত প্রথম শিক্ষাকমিশন (১৯৭২) প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ বাড়িয়ে আট বছর করার সুপারিশ (১৯৭৪) করে। পরবর্তীকালে প্রায় সবশিক্ষা কমিশনই প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ আট বছরে উন্নীত করার সুপারিশ বহাল রাখে। কিন্তু জাতীয় শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন হতে দেখছি না। সরকার যতগুলো শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করেছে তার সব যে খারাপ তা বলবো না। অনেককিছু অবশ্যই ভালো। সরকার ধীরে ধীরে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করছে। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু প্রথম ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের কাজটি শুরু করেন। পরবর্তীকালে এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে তার তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাকি বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ করার কাজ শুরু করেন। সেইসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি, শ্রেণিকক্ষে লৈঙ্গিক সমতা প্রতিষ্ঠা, বিনামূল্যে বই বিতরণ, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মতো সরকারি-বেসরকারি নানা দীপ্তিময় উদ্যোগ। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে স্কুলের ছাত্রীদের সাইকেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে এডুকেশন-৯ ফোরামভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক শক্তিশালী রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে এগুলো সংবিধানের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। যে সফলতাগুলো নিয়ে এতো্ক্ষণ কথা হচ্ছিল সেসব প্রাথমিক শিক্ষার শরীরী উন্নয়ন অর্থাৎ বাহ্য উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষার ভিতরকার গুণগত উন্নয়ন নয়। নয় শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন। প্রাথমিক শিক্ষার শরীরী উন্নয়ন হয়েছে, এখন প্রাথমিক শিক্ষার মানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর তা ঘটাতে হলে ঘনঘন পরীক্ষার যে চলৎ পদ্ধতিটি আছে, তা তুলে দিতে হবে। কারণ, শিশুশিক্ষা উন্নয়ন ও মেধার বিকাশে প্রধান অন্তরায় প্রত্যেক শ্রেণিতে একাধিক পরীক্ষাসহ পঞ্চম শ্রেণি এবং অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা। সার্টিফিকেট টুকু ছাড়া এই পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে না। বরং জীবনের সরল রেখাপথে হাঁটতে একজন শিশু-শিক্ষার্থীর সামনে শুরুতেই বাধার সৃষ্টি করে। তার কোমল স্বপ্নালু জীবনকে আঘাত করে। অতএব, আমরা সার্টিফিকেট চাই নাকি শিশুর মেধার ঊৎকর্ষ চাই- এটা একটা প্রশ্ন। আরো একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আমরা পাশের হার চাই, নাকি গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা চাই? এতো পরীক্ষা, এতো প্রতিযোগিতা ও মুখস্থবিদ্যা দিয়েও যখন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এদেশে একজন বিশ্ববিখ্যাত ডাক্তার, বিজ্ঞানী, দার্শনিক তৈরি করা গেলো না তখন শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে একটা বিপ্লব দরকার। পরীক্ষার চেয়ে জানার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা ঘুণপোকা যেমন কাঠের শরীরে বাসা বেঁধে কাঠটিকে আস্তে আস্তে শেষ করে দেয়, তেমনি হতাশা একজন শিক্ষার্থীকে তিলে তিলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয় অভিভাবকদের। শিক্ষা মানে শেখা। সে শেখায় যখন জোরজবরদস্তি, পাশ-ফেল, ভয়-আতঙ্ক ও হতাশার বীজ থেকে যায়, তখন শিক্ষায় আর শেখার প্রবণতা থাকে না। বস্তুত মুখস্থবিদ্যা, প্রতিযোগিতা, ঘনঘন পরীক্ষা, পাস-ফেলের প্রচলিত অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি-এসব নিছক কোনো শব্দ নয়, বরং মেধা ধ্বংসের বিপজ্জনক হাতিয়ার। লেখক : প্রবন্ধকার ও কলামিস্ট আমারসংবাদ/এসটিএমএ