বৃহস্পতিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৪ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥নূরুল আমিন চৌধুরী

জানুয়ারি ২৫,২০২০, ০১:২৪

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

একটুখানি ভালোবাসা-একটি ছোট্ট নীড়

মনের গহীন গভীরে শান্তিপূর্ণ মায়াময় শিহরণ জাগানো সুরে গাওয়া একটি গানের প্রথম কলি- ‘ছোট্ট একটা ভালোবাসা/ একটুখানি ভালোবাসা/এটাই শুধু চায়গো সবাই...’। ‘ভালোবাসা’ শব্দটার প্রকৃত মর্মার্থ নিয়ে লিখতে গেলে আর একটি বিখ্যাত গানের প্রথম কলির উদ্ধৃতি দিতে হয়। সেটা হলো- ‘যদি সাত সাগরের জল কালি হতো/পৃথিবীর সব গাছ লিখনি হতো/ তবু তোমার আমার প্রেমের কথা লিখে শেষ হতোনা...’। যদিও কোনো প্রেমিক বা প্রেমিকার গভীর ভালোবাসাজনিত মনের বা হূদয়ের উজাড় করা করুন গহীন আকুতিটাকে এভাবে মর্মস্পর্শী গানের ভাষা ও সুরে প্রকাশ করা হয়েছে, মূলত এটা মহান স্রস্টা হায়াত-মউতসহ জীবন ও জগতের মালিক রাব্বুল আলামিন আল্লাহতা’লার প্রতি প্রণত নিবেদন ও সার্বিক ও সর্বশ্রেষ্ঠ অপার্থিব প্রেমময় আকুতি প্রকাশেরই নামান্তর বা রূপান্তর। তবে পার্থিব বা জাগতিক জীবনে ইউসুফ-জুলেখা, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, চণ্ডীদাস আর রজকিনী- যুগে যুগে এরূপ প্রেমিক-প্রেমিকার রঙিন স্বপ্নবেষ্টিত কাঙ্ক্ষিত প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের পারস্পরিক চূড়ান্ত চাওয়া-পাওয়াকে কেন্দ্র করে এমন আবেগঘন আকুতি প্রকাশ প্রায়শঃই হতে দেখা যায়। কেবল মানুষই নয়, জীবনীশক্তি সস্পন্ন জগতের সকল প্রাণীকূল একটুখানি ‘ভালোবাসা’র কাঙাল। পৃথিবীর সৃস্টি থেকে, তথা মানবজাতির আবির্ভাবের প্রথম থেকেই ‘ভালোবাসা’ নামক এই একটিমাত্র ‘শব্দ’ ও ‘বিষয়’ নিয়ে যতো কাহিনী, পুঁথি-গাঁথা, গ্রন্থ-মহাগ্রন্থ, কাব্য-মহাকাব্য রচিত হয়েছে, অন্য কোনো বিষয় বা প্রসঙ্গ নিয়ে তার শতভাগের একভাগও হয়নি। অপার্থিব ‘ভালোবাসা’র বিশাল অর্থের তাৎপর্যের পাশাপাশি এর তুচ্ছ পার্থিব অর্থের দিক থেকে সকল মানুষের জাগতিক জীবনে ‘একটুখানি ভালোবাসা’ বলতে মানব-মানবীর কাঙ্ক্ষিত ‘ছোট্ট একটা সুখের নীড়’কেই বুঝায়। মানবজনমের আদিপর্বে বাবা আদম (আ.), মা হাওয়া (আ.)’র মিলনস্থল প্রস্তর ও বালুকাময় বিরান আরব্য মরুভূমির আরাফাত প্রান্তরে মহান আল্লাহর নির্দেশে ফেরেস্তা জিব্রাঈল (আ.) এর সহযোগিতায় এই জগৎভূমিতে সর্বপ্রথম ‘ছোট্ট একটা সুখের নীড়’ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেছিলেন। এ জগতে মানবকূলের ওটাই ছিলো প্রথম ‘প্রিয় নিবাস’। আদম-হাওয়ার সন্তানদের থেকে সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নানা রকমের বর্ণ, আকার আকৃতি ও ভাষা-সংস্কৃতির মানুষের বসতি গড়ে উঠার ধারাবাহিকতা সূচিত হয়। সৃষ্টিগতভাবে মানুষ সৌন্দর্য্যপ্রিয় ও সৌন্দর্য্য পিপাসু কিন্তু ত্বরা প্রবণ ও অপরাধ প্রবণ। মনুষ্যসহ ‘প্রাণ’ ও ‘জীবন’ ধারণকারী সকল প্রাণী ও জীবকূলকে লিঙ্গভেদে স্ত্রী-পুরুষ সত্বা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তন্মধ্যে বৃক্ষকূলের বংশ বৃদ্ধি হয় তরু-পল্লব, গুল্ম-লতা, বৃক্ষরাজির স্ত্রী-পুরুষ পুস্পরাজির পরাগায়ণের মাধ্যমে। আর জল-স্থল-অন্তরীক্ষে বসবাসকারি সকল জীব ও প্রাণীকূলসহ মনুষ্য জাতির বংশ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হচ্ছে স্ত্রী-পুরুষের দৈহিক সংযোগের মাধ্যমে। মনুষ্য ব্যতীত প্রাণীকূলের মধ্যে মায়া-মমতা, প্রেম-ভালোবাসাবাসির কিছু বাহ্যিক নমুনা দৃষ্টিগোচর হলেও পশু-পাখি তথা প্রাণীকূলের ভাষা বা ভাব বিনিময় প্রক্রিয়া কারো বিদিত নয় বলে সেটা মানববোধের অগম্য। তবে ভাষা, বোধ ও বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী বলে এবং যুথবদ্ধভাবে মানুষ পারিবারিক ও সামাজিক পদ্ধতিতে বসবাস করে বলে তারা পরস্পরের প্রতি ইশারা, দেহভঙ্গির মাধ্যম ছাড়াও যার যার মৌখিক ও মাতৃভাষায় কথোপকথনের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তা বলাবলির মধ্য দিয়ে মনের যাবতীয় ভাব প্রকাশ করে থাকে। এছাড়া ‘লেখনী শক্তি’ এমন একটা মাধ্যম ও কর্মপ্রক্রিয়া যেটা মহান আল্লাহতা’লা একমাত্র মনুষ্য জাতিকেই দিয়েছেন। মহান আল্লাহর মহান কারিগরি কুদরতে বড় অদ্ভূত প্রক্রিয়ায় মাতৃগর্ভে মানব শিশু উৎপন্ন হয় ও একটা নির্দিস্ট সময়ে মাতৃগর্ভ থেকে জন্মলাভ করে। সৃষ্টিগতভাবে প্রতিটি মানবশিশুর ভিতরকার লিঙ্গভেদ অনুযায়ী সুপ্ত যৌনানুভূতি জাগ্রত হতে থাকে। এই যৌনানুভূতিটা কিশোর বয়সেই প্রতিভাত হতে থাকে যার যার বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণানুভূতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এসময় থেকেই এ অনুভূতিটা প্রেমানুভূতিতে পরিণত হয় এবং প্রতিটি নারী-পুরুষ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তীব্র যৌনানুভূতিতে পাগলপারা হয়ে উঠে। এর মধ্যেই এই পাগরপারা হয়ে উঠাটা দু’ধরণের পর্যায়ে পর্যবসিত হয়। এধরণের আবেগ-আকাঙ্ক্ষাকেই বলা হয় ‘প্রেম’। যখনই এই প্রেমাকাঙ্ক্ষাকেটা যৌনতার উর্ধ্বে উঠে অপার্থিব ও খাঁটি ‘স্বর্গীয় চাহিদা’ বা ‘আকাঙ্ক্ষায়’ পরিণত হয়, কেবল তখনই এটাকে উপরে উল্লিখিত জগৎবিখ্যাত প্রেমিক-যুগলদের স্বর্গীয় ও অমর খাঁটি প্রেম বলে আখ্যায়িত করা যাবে। এরূপ প্রেমিকদের প্রেমকাহিনী নিয়েইতো অমর প্রেমগাঁথা ও প্রেমের গান রচিত ও গীত হয়ে এসেছে। মানুষদের খাঁটি প্রেমিক হতে উদ্ধুদ্ধ করে এসেছে। মূলত খাঁটি প্রেমহীন মানব জনমটাই বৃথা। তবে লাখো প্রেমকাহিনীই বেশিরভাগ সময়ে শেষ পর্যন্ত দুঃখজনক বিচ্ছেদ, প্রতারণা ও জীবনহানির মতো পরিণামেই সমাপ্তির দিকে ধাবিত হয়। তাও স্রেফ ধোঁকা ও স্বার্থপরতার কারণে। কিন্তু পিতা-মাতা-সন্তানের মধ্যকার মায়ামমতার প্রেমটাই হয়ে থাকে সর্বপ্রকার ধোঁকা ও স্বার্থপরতার উর্ধ্বে সবচেয়ে নিখুঁত, নিঃস্বার্থ ও নিখাদ। যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব, তাই যুথবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করাটাই মানুষের ধর্ম। আর যেহেতু পারিবারিক জীবনযাপনের মাধ্যমেই মানবজাতির উদ্ভব, বিকাশ ও বিস্তার, তারই ধারাবাহিকতায় দু’জন নর-নারীর মধ্যে প্রেমের বন্ধনের মধ্য দিয়ে বিবাহ বন্ধন। বিবাহ বন্ধনসূত্রে সন্তান উৎপাদন। সন্তানের লালন-পালন, ভরণ-পোষণ, বড়করণ, মানুষকরণ, লেখাপড়া শেখানো, জ্ঞান-বুদ্ধির বিকাশ ঘটানো, তাদের মধ্যে মানবিক ও সামাজিক দায়-দায়িত্ববোধ জাগ্রতকরণ, দুনিয়া-আখেরাতের ধারণা প্রদানের কাজগুলো ‘চ্যারিটি বিগিনস এট হোম’র মতো পিতা-মাতা কর্তৃক তাদের সুখের নীড় ‘ছোট্ট একটি ভালোবাসা’ থেকে একটু একটু ভালোবাসার মধ্য দিয়েইতো রূপায়িত হতে থাকে ও পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। একটা ছাগলের বা গরুর বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হবার পরই আমরা দেখতে পাই কীভাবে ছাগী বা গাভীটি তার বাচ্চাকে সযত্নে আদর করে বাচ্চাদেরকে জিহ্বা দ্বারা লেহন করে তাদের গায়ে লেগে থাকা আঠালো স্তরটা পরিষ্কার করে এবং জমিয়ে রাখা ওলানের কবোষ্ণ দুগ্ধ পান করতে দেয় এবং লেজ নেড়ে আনন্দ ও সন্তোষ প্রকাশ করে। এটাই হচ্ছে প্রকৃতির চিরাচরিত অমোঘ নিয়মানুগ বিধান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে যে, আমরা মানবকূলে জন্ম নেওয়া মানুষরা ক্রমাগতভাবে দিন দিন অমানুষে পরিণত হচ্ছি ‘একটুখানি ভালোবাসা’ আজ বড়ই দুস্প্রাপ্য। তাই ভালোবাসার একটুখানি সুখের নীড় বাঁধার স্বপ্নও আজ অধরার পর্যায়ে চলে গেছে। ভেজালের জমানায়, দেশে দেশে, আমাদের নিজ দেশে খাদ্যপণ্যসহ যাবতীয় নিত্যপণ্যে ভেজাল, জীবন রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল, সকল কাজে ও কথায় শুধু জাল আর ভেজাল। এই জাল আর ভেজালের বাজারে ‘প্রেমের ভেজালে’র মিশ্রণে কোন্টা খাঁটি প্রেম, কোন্টা নকল বা ধোঁকাবাজির প্রেম সেটা নির্ণয় করা অতি দুরূহ। তাই প্রতিনিয়ত নিস্পাপ ফুলকুঁড়ির মতো শিশু-কিশোরীসহ নিতান্ত অবলা প্রেমময়ী নারীরা যে কী হারে, কী অমানবিক, কী নির্মম ও কী অবর্ণনীয়ভাবে ভূয়া প্রেমের ফাঁদে পতিত হয়ে, ধর্ষণ, নির্যাতন ও করুণ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে, তা কেবল যে মর্মান্তিক তাই নয়, অতি অমানবিক, যা পশুত্বের ও অধম। এমন একটা সময়ে, এমন একটা দেশে, এমন একটা সমাজে আমরা বাস করছি, যে সমাজের একজন শীর্ষ আলেম বলেছেন- ‘শিক্ষকরা যদি গুণ্ডা-বদমাশ বা ধর্ষক হয়, সেখানে ব্যভিচার স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধিপাবে’। বক্তব্যটা নাকি সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এত তোলপাড় সৃষ্টি কেন হয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। বোধগম্য হতো যদি তোলপাড় সৃষ্টিকারিরা এটা বলতো যে, ‘শিক্ষক’ বলতে যদি মাদ্রাসা শিক্ষকদের বাদ দিয়ে কথাটা বলা হতো তাহলে এক কথা ছিলো। কিন্তু বক্তব্য প্রদানকারী ব্যক্তি ‘শিক্ষক’ শব্দটাকে ঢালাওভাবে সম্পৃক্ত করেছেন বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে এটা নিয়ে তোলপাড় হবে কেন ? স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মসজিদ, উপাসনালয়, অফিস-আদালত, ঘরে-বাইরে, যানবাহনে কেবল খুন-হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতনের খবর ছাড়া প্রতিদিনের সংবাদপত্র ও সকল প্রকার সংবাদ মাধ্যম যেন পূর্ণই হয়না। এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে লেখাপড়া করে মানুষ না হয়ে, নীতি-নৈতিকতাহীন অনেক বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, রাজনীতিক, এমপি-মন্ত্রী হয়ে কী হবে? আগেতো মানুষকে মানুষ হতে হবে। মানুষ যদি মানুষের মতো মানুষ না হয়ে জড়পদার্থের মতো প্রেম-ভালোবাসাহীন দায়িত্বজ্ঞান শূন্য ‘মুই কী হনুরে !’ প্রকৃতির অমানুষ হয়ে বড় হয়ে উঠে অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে উঠে, তেমন মানুষদের নিজেদের জীবনে শত প্রাচুর্যের মধ্যেও ‘ভালোবাসার সুখ-শান্তির নীড়’ রচনা করে তাতে ‘সুখপাখি’র মতো সুখে থাকার সুযোগ থাকেনা। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গায়িকা রুনা লায়লার কণ্ঠে গীত ‘সুখ তুমি কী আমার জানতে ইচ্ছে করে..’ গানের সুরে কেঁদে কেঁদেই জীবন কাটাতে হবে। তাই, ‘একটুখানি ভালোবাসা- এটাই শুধু চায়গো সবায়..’ গানটির কথা ও সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই- আমরা সবাই পরস্পরের মধ্যে একটুখানি ভালোবাসাবাসির প্রীতির বন্ধনে জড়িয়ে সুখে-শান্তিতে পরিবারে ও সমাজে বাস করতে চাই। দেশ উন্নত বিশ্বের কাতারে উন্নীত হতে চলেছে। এই উন্নতির মহাসড়কে চলার পথে সবাই যেন ভালোবাসার বন্ধনসহ এক কাতারে শামিল হয়ে চলতে পারি, সবাই যেন সাফল্যের ফলটা সমভাবে ভাগাভাগি করে ভোগ করতে পারি- সবার মধ্যে এই চেতনা ও মানসিকতাটা ধারণ করতে হবে। না হলে সফলতার সব ভোগ যদি একচেটিয়াভাবে স্বার্থপর মুষ্ঠিমেয় লোকদের জন্যেই নির্ধারিত হয়, তাহলে ‘সুখের নীড়’র স্বপ্নসাধ দুঃখের দুঃস্বপ্নই হয়ে থাকবে। আসুন সবাই মিলে বাংলাদেশটাকে সকলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে ‘সুখের শান্তিনীড়’ হিসেবে গড়ে তোলার দীপ্ত শপথে উদ্দীপ্ত হয়ে একযোগে নিঃস্বার্থভাবে উন্নয়নের পথে সহযাত্রী হয়ে এগিয়ে চলি। মুজিব জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষে এটাই হোক সকলের অঙ্গীকার। লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট আমারসংবাদ/এসটিএমএ