শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০

১৯ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ১১,২০২০, ০১:১১

মার্চ ১৩,২০২০, ০৫:১২

সভ্য সমাজের অন্ধকার ভবিষ্যৎ

সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করা বর্তমান সমাজ দ্রুত ধাবিত হচ্ছে আইয়্যামে জাহিলিয়ার মতো। সেই অন্ধকার যুগের মানুষ মানেই নিষ্ঠুর আর বর্বর। ঘরে কন্যাশিশুর আগমন মানেই আঁতুড়ঘরে তার মৃত্যু নিশ্চিত। 

জ্যান্ত পুঁতে ফেলার নারকীয় অপকর্মের মতো যুগেই প্রবেশ করছে বর্তমান সমাজ।

নরসিংদীর বাহারচরের বাবা-মা যা করেছেন ইলমার সঙ্গে, রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মা যা করেছে দুই শিশুকন্যার সঙ্গে, সুনামগঞ্জের শিশু তুহিনের সঙ্গে যা করেছে তার বাবা তাতে যে বর্বরতার চিত্র ফুটে উঠে সেই বর্বরতা অন্ধকার যুগের নৃশংসতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে উদ্বিগ্ন সমাজ। প্রশ্ন- এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা?

খিলগাঁওয়ের ঘটনায় আকতারুন্নেসা পপির বিরুদ্ধে স্বামী বিপ্লবের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, ভ্রান্ত ধারণা থেকেই পপি তার দুই কন্যাশিশুকে জবাই করে।

টাকা-পয়সা সব মুন্সীগঞ্জে স্বামীর পরিবারের পেছনে ব্যয় করে পপির এমন ধারণা থেকেই সংসারে নেমে আসে চরম অশান্তি আর তাতেই হতাশায় ভোগেন পপি। যে হতাশায় নিজের দুই কন্যাশিশুকেও খুন করতে দ্বিধা করেননি তিনি। টাকা-পয়সাই এ ঘটনার নেপথ্যের কারণ।

অন্যদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) দেয়া তথ্যমতে, মাত্র ৩০ লাখ টাকার লোভে শিশুকন্যা ইলমাকে খুন করার অনুমতি দেন নরসিংদীর বাহারচরের বাবা মোতালেব।

রাতের আঁধারে তার সামনেই দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ইলমার মাথায় মুগুর চালিয়ে, ইটের ছেঁচা দিয়ে হত্যা করা হয়। সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, নিষ্পাপ শিশু ইলমার মা-ও জানতেন এই খুনের কথা।

সিআইডির ভাষ্যানুযায়ী, নরসিংদীর বাহেরচরে শাহজাহান ভূঁইয়া ও সাবেক ইউপি সদস্য বাচ্চুর নেতৃত্বে দুটি দলের প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ ছিলো। শাহজাহান ভূঁইয়ার লোকজন প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে শিশুহত্যার পরিকল্পনা করেন। ঠিক হয়, তিনি ইলমার জান কবচের বিনিময়ে তার বাবা মোতালেবকে ৩০ লাখ টাকা দেবেন।

টাকার লোভে মোতালেব মেয়েকে হত্যার অনুমতি দেন। এ পর্যন্ত মোতালেব চার লাখ টাকাও নাকি পেয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি মাসুম মিয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। মাসুম ইলমার ফুফাতো ভাই। ষড়যন্ত্র মতো ইলমাকে যখন সাত-আটজন মিলে চরম নৃশংসভাবে হত্যা করে, সে সময় পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন বাবা।

সিলেটের সুনামগঞ্জের শিশু তুহিনের কপালেও জুটেছে এমন মৃত্যু। স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের জেরে নিজের সন্তানকেও ছুরি মেরে খুন করতে দ্বিধা করেননি তুহিনের বাবা বাছির। চাচার কোলে রেখেই তুহিনকে খুন করে বাছির। এ কী করে সম্ভব? সুস্থ মস্তিকের বোধশক্তিতে ধরে না।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে বলতে হয় ক্ষমতা আর টাকার লোভ বর্তমান সমাজের মানুষকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেলে মা-বাবার মতো পরম নির্ভরতার প্রতীকও এমন পাষণ্ড হতে পারে?

আদিকালের অন্ধকার যুগের মানুষরা জৈবিক চাহিদাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। নিজের চাওয়া-পাওয়ার কাছে অন্যরা ছিলো তুচ্ছ। মানবতা, সভ্যতা, সৌজন্যতা সবই ছিল ভূলুণ্ঠিত।

লড়াই আর লুটপাটের মনোবৃত্তি ছিলো ষোলো আনা। আর বর্তমান যুগ সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে এবং মহামনীষীদের অমৃতবাণী আর পদচিহ্নই এ যুগের মানুষের পথপ্রদর্শক। একটু শ্রম দিয়ে মেধা খাটালেই জোটে অনেক কিছু।

এরপরও লোভী আর বর্বর কেন— এমন প্রশ্ন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় দেখা যাচ্ছে অল্পে তুষ্ট নয় কেউই। চাহিদার কমতি নেই।

প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ বাড়ায় আরেকটু ভালো থাকতে গিয়েই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব দিনরাত ছাইচাপা উসকানি দিচ্ছে এ সমাজের মানুষকে।

এতে কাছের মানুষকে ভালোবেসে সহযোগিতা করার চেয়ে কনুই মেরে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতাই বাড়ছে। কমছে মায়ামমতা, সহানুভূতি। নরসিংদীর ইলমা খুন, রাজধানীর খিলগাঁওয়ে দুই শিশু খুন, সিলেটের তুহিন খুনের ঘটনাই নয়, এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে।

২০১৬ সালে রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে জেসমিন নামের এক মা অরণী ও আলভী নামে তার দুই শিশুসন্তানকে হত্যা করে। ১৯ দিনের নবজাতককে বালতির পানিতে চুবিয়ে বাবার হত্যাকাণ্ড ও ছেলেশিশুকে বিক্রি করে দেয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আপনজনের পাশবিকতায় সন্তানের সম্ভ্রমহানির খবরও সমাজের অজানা নয়।

শুধু তাই নয়, মা-বাবার পরই যে শিক্ষক শিশুদের জন্য আরেকটি নির্ভরতার স্থান, সেখানেও সমস্যার ঘনঘটা। প্রায়ই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নৈতিক স্খলনের খবরও সবার জানা।

এতে আদর্শের জায়গায় রীতিমতো ঘূণ ধরতে শুরু করেছে। সম্প্রতি ‘৫০ জনকে যৌন হয়রানি, ৪ প্রশিক্ষক প্রত্যাহার’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় পিটিআইয়ে ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থী চার প্রশিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। এ নিয়ে রীতিমতো তোলপাড়।

এক প্রশিক্ষক পর্যন্ত এ অভিযোগ তুলেছেন। শিক্ষক তৈরি হওয়ার পীঠস্থানের অবস্থাও যদি এ রকম হয়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী তা নিয়েও দেখা দিয়েছে। মা-বাবা আর শিক্ষকদের কাছ থেকেই যদি শিশুরা নির্ভরতার স্থান হারিয়ে ফেলে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অবস্থা কী হবে-তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

অধিকতর তদন্তে এসব ঘটনায় প্রমাণিত হবে আপন সন্তানের ঘাতক কোনো পিতা-মাতা নন— এমনটাই আশা সবার। তবে চরম সত্য এটা যে, শিশুরা নিষ্ঠুরভাবে খুন হচ্ছে। সেটা করছে বর্তমান সভ্য সমাজেরই মানুষ। তাহলে প্রশ্ন— এই সমাজের ভবিষ্যৎ কী?

আমারসংবাদ/এসটিএমএ