শনিবার ০৬ জুন ২০২০

২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥নজরুল ইসলাম মুকুল, কুষ্টিয়া

ডিসেম্বর ০৩,২০১৯, ১২:৫১

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

ধানের দামে ধসের আশঙ্কা

হঠাৎ করে বাজারে প্রচার হয় প্রশাসনের চাপে মিলাররা চালের দাম কেজিপ্রতি দুই টাকা কমিয়েছেন। কিন্তু বাজারে তার বাস্তবতা নেই বলে অভিযোগ ক্রেতা-ভোক্তাদের। চালের দাম এক টাকাও কমেনি— দাবি পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের। কৃষকদের অভিযোগ, ধানের বাজারে দর ধস নামাতেই এটি একটি নতুন ষড়যন্ত্র মিলারদের। প্রশাসনের চাপে নয়; চাল সরবরাহে মন্দার কারণে মিল চালু রাখার স্বার্থে চালের দাম কেজিপ্রতি দুই টাকা কমানো হয়েছে। পরস্পরবিরোধী ক্ষোভ নিরসনে সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন জরুরি— দাবি মেজর অটো ও হাস্কিং রাইস মিল মালিক সমিতির। কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়া এলাকার হাজি গোলাম মহসিন বলেন, দুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম চালের দাম মিলাররা কেজিতে দুই টাকা কমিয়েছে কিন্তু বাজারে তো দেখি যা ছিলো তাই আছে। এসবের মানে কি? দেখার কি কেউ নেই? কুষ্টিয়া পৌরবাজারের খুচরা চাল বিক্রেতা বাবুল আকতার বলেন, চালের দাম কমছে, আপনারা এসব সংবাদ কোথায় পান। আমরা মিলারদের কাছ থেকে যে দামে চাল ক্রয় করি, তাতে কেজিতে মাত্র এক টাকা লাভ করে বিক্রি করছি। মিলাররা যদি দাম কমিয়ে থাকে তাহলে সেখানে গিয়েই চাল কিনুন। খুচরা বাজারে মিনিকেট চালের দাম এক সপ্তাহ আগেও প্রতিকেজি ৪৯-৫০ টাকা ছিলো, এখনো তাই আছে। কুষ্টিয়া বড়বাজারের পাইকার ও আড়তদার আলী নেয়াজ বলেন, গত মাসের (নভেম্বর) প্রথম সপ্তায় মিলগেটে মিনিকেট চাল একলাফে ৪০-৪২ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৬ টাকা হয়ে যায়; এই দামের কোনো হেরফের এখনো হয়নি। মিলাররা সাংবাদিকদের কাছে চালের দাম কমানোর কথা বললে তো হবে না। আড়তে কম রেটে চাল এলেই আমরা বুঝবো চালের দাম কমেছে। সদর উপজেলার হররা গ্রামের কৃষক আলীম সেখ কাটা ধান মহিষের গাড়িতে বোঝাই করছিলেন। এসময় সাংবাদিককে কাছে যেতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা আবার কি মতলবে এখানে এসেছেন? আপনারা তো অটো মিল আলারে খবর ল্যাকেন, ধানের দাম, চালির দাম ইচ্চা মোতো বাদি দেয়। আপনারা সরকারকে বোলেন চাষির দিক ইকটু তাকাইক। না হলি আমরা মরি সাইরি যাচ্ছি। আর দুই-একদিনির ভিতরি চাষিরা পুরাদোমে ধান বেচপি, আবার শুনতিচি মিল আলারা চালির দাম কুমা দেচে, আমার মনে হচ্চে উরা এই কতা প্রচার করি ধানের দাম কুমা দিতি চাই। বাজারে চালির দাম তো একনও হাই। ধানের দাম যা ছিলো তাও কুমা ফ্যালার পাঁয়তারা করতেচে। এক মণ ধান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বেচতি হলি চাষিরা আর ধানই লাগানি বন্ধ করি অন্যকিছুত চইলি যাবি’। মিলগেটে চালের দাম কেজিতে দুই টাকা কমানো হয়েছে মিলারদের এই দাবির বিষয়ে কুষ্টিয়া খাজানগর চালের মোকামে দাদা রাইস মিলের মালিক ও মেজর অটো এবং হাস্কিং রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন বলেন, আমাদের মোকামে প্রতিদিন উৎপাদিত ১২ হাজার মে. টন চালের সরবরাহ অর্ডার না পাওয়ায় মিল চালু রাখার স্বার্থে আমরা বাধ্য হয়ে কেজিপ্রতি দুই টাকা কমিয়েছি। তবুও পাইকারদের কাছ থেকে তেমন সাড়া পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মিলই বন্ধ হয়ে যাবে। মিল গেটে চালের দাম কমালেও বাজারে খুচরা ও ভোক্তাপর্যায়ে এর কোনো প্রভাব পড়েনি— এ বিষয়ে তিনি বলেন, গত মাসের প্রথমদিকে মিলগেটে সব রকম চিকন (মিনিকেট) চালের দাম কেজিপ্রতি পাঁচ-ছয় টাকা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখে অধিকাংশ পাইকার ও আড়তাদাররা প্রয়োজনের অধিক চাল কিনে গুদাম ভরেছে। বেশি দামে কেনা ওইসব চাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা দাম কমালেও প্রকৃত অর্থে খুচরা বাজার বা ভোক্তাপর্যায়ে এর প্রভাব পড়েনি। আরও অন্তত সাত থেকে ১০ দিন পর খুচরা বাজারে দাম কমবে। তবে এখানে বাজার মনিটরিংয়ে দুর্বলতা আছে। ধান ও চালের দাম নিয়ন্ত্রণ মিলারদের হাতে— চাষিদের এমন অভিযোগ নাকচ করে এই নেতা বলেন, এসব নিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ না দিয়ে বরং সরকার সব পক্ষের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে একটা কঠোর নীতিমালা করুক। ধান উৎপাদনের খরচ, চাল উৎপাদনের খরচ, পরিবহন খরচ আমলে নিয়ে সরকারের খাদ্য বিভাগই সঠিক দাম নির্ধারণ এবং তার বাস্তবায়ন করুক। আমরা কখনই চাই না কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কারণ ওরাই আমাদের কাঁচামালের মূল উৎস। চালের দাম কেজিতে দুই টাকা কমেছে মিলারদের দাবির কোনো বাস্তবতা বা সত্যতা খুচরা ও পাইকারি বাজারে নেই নিশ্চিত করে কুষ্টিয়া জেলা বাজার কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, বাজার মনিটরিংয়ে দুর্বলতার অভিযোগ সঠিক নয়; আমরা প্রতিদিনই জাতীয় ভোক্তা অধিকার ও প্রশাসনের সমন্বয়ে অভিযান চালাচ্ছি। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, এখন নতুন ধান উঠছে, স্বাভাবিকভাবেই চালের দাম কিছুটা কমে আসবে। চালের দাম মিলাররা কমানোর প্রচার চালিয়ে ধানের দামে ধস নামানোর চেষ্টা হচ্ছে; কৃষকদের এই আশঙ্কা করার কারণ নেই। কৃষকরা যাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারেন তার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ জেলা প্রশাসন গ্রহণ করবে। এসটিএমএ