শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০

২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥কাজী ইহসান বিন দিদার ও নুর মোহাম্মদ মিঠু

ডিসেম্বর ১৩,২০১৯, ১২:৪৭

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

বাড়ছে পোড়া লাশ

  • চিকিৎসাধীন বেশির ভাগেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক
  • মন্ত্রী, ফায়ার সার্ভিস, বিশেষজ্ঞ দুষলেন মালিক এবং কর্তৃপক্ষকে
  • কারখানাটিতে আগেও লেগেছিল আগুন
  • গ্যাস থেকে আগুনের সূত্রপাত
  • পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি
তাজরীন গার্মেন্ট, নিমতলী, টাম্পাকো প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি, চকবাজারের চুড়িহাট্টা আর এবার কেরানীগঞ্জের হিজলতলা আবাসিক এলাকার প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কারখানার আগুন ট্র্যাজেডি যেন পিছু ছাড়ছেই না। এদিকে লম্বা হচ্ছে কেরানীগঞ্জ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ মৃতের তালিকা। গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে। এছাড়া, যারা চিকিৎসাধীন তাদের বেশির ভাগেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। মন্ত্রী ও ফায়ার সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মালিক এবং কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অন্যদিকে, ঘটনার পর থেকে কারখানার মালিক নজরুল ইসলাম পলাতক। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, মালিকের গাফিলতির কারণেই কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তাই মালিকপক্ষই ক্ষতিপূরণ দেবে। এই ক্ষতিপূরণ আদায়ে কাজ করবে সরকার। রাষ্ট্র দগ্ধদের চিকিৎসা দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দগ্ধদের সবার অবস্থাই খুব ক্রিটিক্যাল। বেশির ভাগেরই ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। ইতোমধ্যে ঢামেকের বার্ন ইউনিট থেকে ১১ জনকে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়েছে। দরকার হলে আরও রোগী সেখানে স্থানান্তর করা হবে। জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়কারী অধ্যাপক সামন্তলাল সেন সাংবাদিকদের বলেন, এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি কারোর অবস্থাই আশঙ্কামুক্ত নয়। সবার শ্বাসনালি পোড়া। চাকরি জীবনে এমন ভয়াবহ পোড়া রোগী আর দেখিনি। রোগীদের অবস্থা এতই খারাপ যে, তারা কোনো কথাই বলতে পারছেন না। দগ্ধ ব্যক্তিদের দুইজনের শরীরের শতভাগ পুড়ে গেছে। ৯০ শতাংশ পুড়েছে আরও দুইজনের। আর ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়েছে ১০ জনের। দগ্ধদের মধ্যে আটজনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফসাপোর্টে রাখা হয়েছে। দগ্ধদের হাসপাতালে দেখতে এসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এবং কেরানীগঞ্জের সাংসদ নসরুল হামিদ বলেন, কারখানাটির অনুমোদন ছিলো না। নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে থাকা কারখানাগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে আমি কয়েকবার স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলেছিলাম। কিন্তু, কোনো লাভ হয়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর আবুল হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা আবাসিক এলাকার প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কারখানাটিতে এর আগেও আগুন লেগেছিল। এটি আইন মেনে স্থাপন করা হয়নি। প্লাস্টিকের মতো দাহ্য পদার্থের এই কারখানাটির যেসব নিয়ম মেনে স্থাপন করার কথা। প্রাথমিক তদন্তে বোঝা যাচ্ছে কারখানা পরিচালনায় মালিকের গাফিলতি ছিলো। কারণ, যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত না করে কারখানা পরিচালনার অভিযোগ এনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে গত ৫ নভেম্বর মামলা করে। মামলার ফয়সালা হওয়ার আগেই ঝরে গেলো ১৩ জন মানুষের প্রাণ। শ্রমিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আবু নাসের খান আমার সংবাদকে বলেন, এ ধরনের গুদাম, কারখানা বা দোকানের বেশির ভাগের নিবন্ধন বা লাইসেন্সসহ কোনো কাগজপত্র নেই। এইসব ব্যবসায়ী এবং তাদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নিজেদের ব্যবসা চালাচ্ছে কোনো নিয়ম-নীতি না মেনেই। এমনকি শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও আগ্রহ নেই তাদের। অগ্নিকাণ্ড যেকোনো সময় ঘটতে পারে। সেজন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি ভবনে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। আগুনের সূত্রপাত যেভাবে কারখানাটিতে বিরিয়ানির প্লেট, প্যাকেট ও একবার ব্যবহার উপযোগী (ওয়ান টাইম ইউজ) গ্লাস তৈরি করা হতো। কারখানায় কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২০০। যে ইউনিটে আগুন লাগে, সেখানে কর্মরত ছিলেন ৮০ জন। এদের মধ্যে একজন ২২ বছরের জাকির হোসেন। বিগত চার বছর ধরে তিনি এই কারখানায় কাজ করছেন। তিনি চুনকুটিয়া এলাকার আবুল হোসেন মাতব্বরের ছেলে। অগ্নিকাণ্ডে জাকিরের মুখমণ্ডল, দুই হাত ও দুই পা পুড়ে গেছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার সময় আমি প্যাকেজিং সেকশনে কাজ করছিলাম। আমাদের এক ইঞ্জিনিয়ার গ্যাস রুমে সিলিন্ডার মেরামত করছিলেন। তখনই আগুন লাগে। ওই ইঞ্জিনিয়ার দগ্ধ হয়ে হঠাৎ বলে আগুন লেগেছে। তখন আমরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে পানি ও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। তবে এর আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আরেক শ্রমিক মেহেদী হাসান বলেন, গ্যাস রুম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি কেরানীগঞ্জের কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ কমিটি গঠন করা হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অ্যাম্বুলেন্স শাখার উপ-পরিচালক আবুল হোসেনকে প্রধান করে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অন্যদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মোল্লা জালাল উদ্দিনকে আহ্বায়ক এবং কলকারাখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (সেফটি) মো. কামরুল হাসানকে সদস্য সচিব করে পাঁচসদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ঢামেকে স্বজনদের ভিড় কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ নেয়ার জন্য বুধবার রাত থেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে বসে থাকতে দেখা যায় স্বজনদের। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। মর্গের সামনে অপেক্ষা করা নিহত একজন আলমের স্ত্রী রুমা বেগম বলেন, কারখানার কাছেই আমাদের বাসা। শরীরে আগুন লাগার পর দৌড়ে বাসায় আসেন আলম। পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন। তিনি ও স্বজনেরা পানি দিয়ে গায়ের আগুন নেভান। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আলম আজকে (গতকাল বৃহস্পতিবার) ভোরের দিকে মারা যান। আর তার বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক (৪৫) মারা যান দুপুরে। অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলে দগ্ধ হয়ে একজনের মৃত্যু হয়ে। বাকি নিহতরা হলেন- জাহাঙ্গীর, ইমরান, বাবুল, রায়হান, খালেক, সালাউদ্দিন, সুজন, জিনারুল ইসলাম, আলম, জাকির হোসেন ও ফয়সাল। এসটিএমএ