বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০

২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিসেম্বর ১৫,২০১৯, ১২:৪৩

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

বিজয়ের মাসে পরাজিত শক্তির ধৃষ্টতা!

দাম দিয়ে কেনা এই বাংলার সার্বভৌমত্বে বারবারই আঘাত হেনেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং এদের দোসররা। এরই একটা প্রমাণ মিললো স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ‘কাদের মোল্লাকে’ শহীদ বলে আখ্যা দেয়ার মাধ্যমে। তাও আবার বিজয়ের মাসে, ঠিক বিজয় দিবসের আগে। আর এই ধৃষ্টতা দেখিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম। দৈনিক সংগ্রামে কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ আখ্যায়িত করে সংবাদ প্রকাশ করা হয় গত বৃহস্পতিবার। যার মধ্য দিয়ে আবারো মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের না শোধরানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। আর এহেন কর্মকাণ্ডে সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ, অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ জনগণ ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন। তাদের মতে, যারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হয়েছে এবং তাদের কোনো ক্রমেই ‘শহীদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার কোনো সুযোগ নেই। এটা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এটা বিজয়ের মাসে পরাজিত শক্তির ধৃষ্টতা মাত্র। কেননা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে টানা ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তাই এ বিষয় নিয়ে কোনো ধরনের অসদাচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এদিকে, মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশের কারণে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল শনিবার বিকালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক গোলাম আজম মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পাঁচদিনের রিমান্ডের আবেদন করলে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ এ আদেশ দেন। প্রসঙ্গত, শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) রাতে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ আফজাল বাদি হয়ে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় মামলাটি করেন। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যিনি নিজেও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমার সংবাদকে বলেন, বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। কাদের মোল্লা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসি হয়েছে। তাকে কোনো ক্রমেই ‘শহীদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার কোনো সুযোগ নেই। এটা এই বিজয়ের মাসে পরাজিত শক্তির ধৃষ্টতা দেখানো ছাড়া আর কিছুই না। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এ বিষয়ে বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করায় দৈনিক সংগ্রামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। দৈনিক সংগ্রাম আব্দুল কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ লেখার মাধ্যমে ঘৃণ্য কাজ করেছে। একাত্তরে তারা যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল তা অব্যাহত রেখেছে। আর এমন প্রেক্ষাপটে আমার সংবাদকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান বলেন, এটা অবশ্যই গর্হিত এবং রাষ্ট্রবিরোধী সংবাদ। আমরা এই সংবাদ প্রত্যাখ্যান করি, এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এমন সংবাদের তীব্র বিরোধিতা করছি। দৈনিক সংগ্রামকে এর দায় নিতে হবে এবং জবাবদিহির মুখোমুখি করা হবে। এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান গতকাল সাংবাদিকদের এ ব্যপারে বলেন, এ ধরনের ধৃষ্টতাকে ঘৃণা করা এবং প্রতিবাদ জ্ঞাপনের কোনো ভাষা আমাদের জানা নেই। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যাতে এ ধরনের আস্ফাালন, এ ধরনের ধৃষ্টতা যেন আর কেউ কখনো দেখাতে সাহস না পায় সেক্ষেত্রে সবাইকে দৃঢ়প্রত্যয়ী হতে হবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের বলেন, শহীদের একটা সংজ্ঞা আছে। কাদের মোল্লার মৃত্যু এই সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে বলে মনে করি না। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে দণ্ডিত আবদুল কাদের মোল্লাকে শহীদ আখ্যা দিয়ে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকাটি ঠিক করেনি। আমি এর প্রতিবাদ করছি। বিজয় দিবসের আগে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে শহীদ আখ্যা দেয়া জঘন্য অপরাধ মন্তব্য করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন, দেশবিরোধী তৎপরতার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাদের বিচার করা উচিত। কারণ পচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিএনপির পৃষ্ঠপোষকতায় সরাসরি রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনর্বাসিত হয় জামায়াত। এই আচরণ জাতির বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে আরেকটা জঘন্য অপরাধের সমান। পাশাপাশি, সাবেক আইজিপি শহিদুল হক কাদের মোল্লাকে শহীদ আখ্যায়িত করাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ মন্তব্য করে আমার সংবাদকে বলেন, বাংলার সার্বভৌমত্বে বারবারই আঘাত হেনেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং এদের দোসররা। তারা যে এখনো দমে যায় নাই, এই আচরণই তার প্রমাণ। আমি এর বিচার চাই। বৃহস্পতিবার কাদের মোল্লাকে ‘শহীদ’ উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশের জেরে শুক্রবার বিকাল থেকে রাজধানীর হাতিরঝিলে দৈনিক সংগ্রামের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের’ ব্যানারে অসংখ্য মানুষ। সন্ধ্যার দিকে কার্যালয়ের ফটকে তালা ঝুলিয়ে সামনে অবস্থান নেয় বিক্ষুব্ধরা। এসময় তারা পত্রিকা পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায় এবং সম্পাদককে গ্রেপ্তারসহ পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধের দাবি জানায়। এ অবস্থায় সন্ধ্যা ৭টার দিকে সংগ্রামের কার্যালয় থেকে সম্পাদক আবুল আসাদকে হেফাজতে নেয় হাতিরঝিল থানা পুলিশ। এসময় পত্রিকাটির সম্পাদক আবুল আসাদকে তার রুমের বাইরে এনে টিভি সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। তখন তিনি ‘শহীদ’ শব্দটি ব্যবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চান। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রথম ফাঁসি কার্যকর করা হয় রাজাকার কাদের মোল্লার। কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জল্লাদ শাজাহান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল সেদিন ফাঁসি কার্যকর করে। এর আগে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে রাজাকার কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২। রায়ের পর সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা সেদিন বিকাল থেকে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে জড়ো হতে থাকে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শাহবাগ চত্বরে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। গণদাবির মুখে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) সংশোধন বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই সংশোধনের ফলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার সুযোগ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাণদণ্ড পায় একাত্তরের এই ঘাতক। এসটিএমএ