বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০

২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী

ডিসেম্বর ১৫,২০১৯, ১২:৫৪

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

বিমা মানেই ভোগান্তি

মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ও ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসেবে বিমার প্রচলন হলেও বাস্তবে দেশে ঘটছে তার উল্টোটা। বিমা কোম্পানিগুলোর অসততা ও প্রতারণার কবলে পড়ে দুঃসময়ের অবলম্বন এখন হয়ে উঠেছে গলার কাঁটা। বছরের পর বছর বিমা কোম্পানিতে প্রিমিয়াম জমা দিয়েও মেয়াদ শেষে তার সুফল মিলছে না। গ্রাহকদের পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও দাবি পরিশোধ করছে না অনেক বিমা কোম্পানি। এ কারণে বিমা যেন এখন ভোগান্তির অপর নাম হয়ে উঠেছে। বাধ্য হয়ে আইডিআরএ এর শরণাপন্ন হচ্ছে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। জমানো টাকা ফিরে পেতে প্রতিদিনই তারা আইডিআরএ অফিসে ভিড় করছেন। অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোকে টাকা পরিশোধের জন্য বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও তারা গ্রাহকদের বিমা দাবি পূরণ করছে না। ফলে দিনদিন বিমার প্রতি অনীহা তৈরি হচ্ছে গ্রাহকদের। আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই তাদের কাছে অসংখ্য অভিযোগ আসছে। এর মধ্যে অধিকাংশ অভিযোগই জীবন বিমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইডিআরএ এর একজন কর্মকর্তা জানান, পাঁচটি জীবন বিমা কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না করার অভিযোগ বেশি। মেয়াদ শেষ হলেও টাকা পরিশোধ না করায় ওই পাঁচটি জীবন বিমা কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায় ছয় হাজার অভিযোগ জমা আছে। সেগুলো হলো— গোল্ডেন লাইফ, বায়রা লাইফ, সানলাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ। তবে এর বাইরেও আরো হাজার হাজার ভুক্তভোগী রয়েছে, যারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আইডিআরএতে এসে অভিযোগ জানাতে পারছে না। একজন কর্মকর্তা জানান, শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলেই গ্রাহকদের অভিযোগ বেশি। কেননা, সেখানে অনেক সহজ-সরল মানুষ বিমা পলিসি করলেও সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিমা কোম্পানির এজেন্টরা গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রিমিয়ামের টাকা নিলেও তাদের হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করে বলেও অভিযোগ আছে। এটা শহরাঞ্চলে করতে পারে না। আইডিআরএ-এর তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার ৬০৯ গ্রাহককে পলিসির টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগ জমা হয়। এর মধ্যে প্রথম অবস্থানে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স। তাদের বিরুদ্ধে আইডিআরএ-এর কাছে দুই হাজার ৩৪৪টি অভিযোগ রয়েছে। এসব পলিসির বিপরীতে সুদ ছাড়া টাকার পরিমাণ তিন কোটি। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার মালিকানাধীন বায়রা লাইফের বিরুদ্ধে এক হাজার ২৯৪ জন গ্রাহকের অভিযোগ জমা পড়েছে। এক হাজার ২১০ জন গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স। হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে ৭৮৮টি পলিসির টাকা না দেয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে। এ ছাড়া সানফ্লাওয়ার লাইফের বিরুদ্ধে ১১৫টি অভিযোগ রয়েছে। আইডিআর-এর সামনে একাধিক ভুক্তভুগী জানান, অধিকাংশ বিমা কোম্পানির মালিকই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তাই তাদের বিরুদ্ধে কিছু করার নেই। বিমা দাবির টাকা চাইতে গিয়ে বেশ কয়েকজন হুমকি পেয়েছেন বলেও জানান। এক্ষেত্রে আইডিআরএতে অভিযোগ জানানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। তবে আইডিআরএ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. শেখ মহ. রেজাউল ইসলাম বলেন, কয়েকটি কোম্পানি গ্রাহকদের পলিসির টাকা দিচ্ছে না বলে অভিযোগ এসেছে। কোম্পানিগুলো টাকা না দিয়ে বিভিন্নভাবে গ্রাহককে হয়রানি করছে। বিষয়টি সুরাহা করার জন্য জোর চেষ্টা চলছে। কারণ মানুষ খুব কষ্ট করে টাকা জমা দিয়েছে। মেয়াদ শেষ হলেও কোম্পানিগুলো তাদের টাকা দিচ্ছে না। এটা হতে পারে না। তিনি জানান, ইতোমধ্যে আইডিআরএ অভিযুক্ত প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করে কঠোর বার্তা দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে বাধ্য হয়েই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিমা আইন অনুসারে পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিশ্রুত টাকা দিতে হয়। আর ৯০ দিনের বেশি হলে বাকি দিনগুলোর সুদসহ টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু কোম্পানিগুলো টাকা পরিশোধ না করে গ্রাহককে বছরের পর বছর হয়রানি করছে। এরা পলিসির টাকা আত্মসাৎ করছে। ফলে পুরো বিমা খাতেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে বিমা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন বলেন, বিমা দাবি পূরণে কালক্ষেপণের অভিযোগ অনেক কম। এখন সাধারণ বিমায় এমন অভিযোগ নেই বললেই চলে। তবে জীবন বিমার ক্ষেত্রে কিছু কিছু কোম্পানির নামে এমন অভিযোগ থাকতে পারে। মানুষ জীবন বিমায় হয়রানির শিকার হলে তার দায়টাও সাধারণ বিমা কোম্পানির ওপর চাপিয়ে দেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভালোভাবে না জেনে-বুঝেও অনেক গ্রাহক অভিযোগ করে বসে। তাই বিমা গ্রাহকের হয়রানি কমানো ও বিমা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলো ব্যবসা নেয়ার জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি কমিশন দিয়েছে। এতে কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে পুরো বিমা খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আমরা কয়েক বছর ধরে এ খাতে স্বচ্ছতা ফেরানোর চেষ্টা করছি। সময়মতো বিমা দাবি পরিশোধের কথা বলছি। কমিশন নিয়ে নৈরাজ্য ঠেকাতে আইডিআরএ-এর পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমরাও তাদের সঙ্গে একমত হয়েছি। আমরা যেকোনো মূল্যে বিমা খাতের নৈরাজ্য বন্ধ করে একটা সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই। এসটিএমএ