বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০

২৩ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥কাজী ইহসান বিন দিদার

জানুয়ারি ১৪,২০২০, ১০:৫৮

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

এনু-রুপনের সম্পদের পাহাড়, ধরাছোঁয়ার বাইরে সাঈদ

বিভিন্ন খাতের অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও অবৈধ অর্থের ছড়াছড়ি বন্ধ করতে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই নির্দেশের অ্যাকশন শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাসে। ওই মাসের ১৮ তারিখ রাতে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। এরপর ধানমন্ডি, কলাবাগানসহ উত্তরা, গুলশান, তেজগাঁওয়ের বেশকিছু ক্লাবে একই ধরনের অভিযান চালায় পুলিশ ও র্যাব। এসব অভিযানে ক্যাসিনো সামগ্রীসহ প্রচুর পরিমাণে মদ ও অবৈধ অর্থ উদ্ধার করা হয়। অভিযানগুলোতে যুবলীগের কয়েকজন নেতাসহ বেশকিছু ক্লাবের সংগঠককে ক্যাসিনোতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত আলোচিত দুই ভাই গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনামুল হক ও সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল সোমবার ভোরে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মতিঝিলসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জুয়ার ব্যবসা করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এনু ও রুপন। এরা বাসায় টাকা রাখার জায়গা না থাকায় স্বর্ণ কিনতেন। আর ঢাকায় দুই ভাইয়ের রয়েছে ২২টি জমি ও বাড়ি, সারা দেশে বিভিন্ন ব্যাংকে ৯১টি অ্যাকাউন্টে জমা আছে মোট ২২ কোটি টাকা। এছাড়া, আরও আছে ব্যক্তিগত পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়িও। সিআইডি জানায়, এই দুজনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ক্যাসিনো ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়। নেপালিদের মাধ্যমে তারা ক্যাসিনোর সরঞ্জাম বাংলাদেশে এনেছিল। অন্যদিকে, এনু-রুপনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ঢাকায় ক্যাসিনোকাণ্ডের মূলহোতা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯নং ওয়ার্ডের অপসারিত কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদ ওরফে ক্যাসিনো সাঈদ এখনো আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বয়ং সিআইডি কর্মকর্তারাও মুখ খুলতে রাজি হননি। যদিও ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনার অন্যতম মূলহোতা বলেও তাকে আখ্যা দিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অবৈধভাবে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা উপার্জনের অভিযোগে তার নামে দুদকে মামলা রয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও এবার সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন তিনি। এনু-রুপনকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও অর্থ জব্দের পর তাদের বিরুদ্ধে ৯টি মানিলন্ডারিং আইনে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। এর মধ্যে চারটি এজাহারে এই দুজনের নাম রয়েছে। মামলার তদন্ত করে আমরা তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করি এবং সকালে কেরানীগঞ্জে তাদের এক সহযোগীর বাড়ি থেকে এই দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডির তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যানুযায়ী দুজনের মোট ২২টি জমি ও বাড়ি রয়েছে, যার অধিকাংশই পুরান ঢাকায় অবস্থিত। এছাড়া, সারা দেশে বিভিন্ন ব্যাংকে এই দুই ভাইয়ের ৯১টি অ্যাকাউন্টে তাদের মোট ২২ কোটি টাকা জমা রয়েছে। এছাড়া, ব্যক্তিগত পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়িও রয়েছে তাদের। আর তাদের বাড়িতে অভিযানের সময় উদ্ধার হওয়া পাঁচ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ছিলো ব্ল্যাকমানি। তারা সেগুলো দেশের বাইরে পাচারের উদ্দেশ্যে বাসায় রেখেছিল। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, যখন তাদের বাড়িতে অভিযান চালানো হয় (সেপ্টেম্বর-২০১৯) তারা সেখান থেকে পালিয়ে কক্সবাজার চলে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো বোটে অবৈধভাবে মিয়ানমার হয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি জমানোর। তবে সেখানে যেতে ব্যর্থ হয়ে নেপালে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তারা। এজন্য তারা কেরানীগঞ্জে মোস্তফা নামের এক সহযোগীর বাড়িতে অবস্থান করছিল। সেখান থেকে বেনামি পাসপোর্ট তৈরি করে ভারত হয়ে নেপাল যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলো তাদের। তারা বেনামি পাসপোর্ট তৈরিসহ ভারত হয়ে নেপাল যাওয়ার জন্য মোট ৪০ লাখ টাকা সঙ্গে রেখেছিল। তাদের গ্রেপ্তারের সময় ওই ৪০ লাখ টাকা ও ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। আমরা জেনেছি এই দুজনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ক্যাসিনো ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়। নেপালিদের মাধ্যমে তারা ক্যাসিনোর সরঞ্জাম বাংলাদেশে এনেছিল। এনামুল ওয়ান্ডারার্স ক্যাসিনো ক্লাবের পরিচালক ছিলেন। এনু-রুপনের সম্পদের পাহাড় : ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের শুরুর দিকে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর এনু-রুপন এবং তাদের দুই সহযোগীর বাসা থেকে পাঁচ কোটির বেশি টাকা, আট কেজি স্বর্ণ ও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গ্লোরিয়ার ত্রাস এনু-রুপনের অগাধ সম্পদ। গত বছর শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে তড়িঘড়ি করে সরানো হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি নগদ টাকাই নয়, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এনু-রুপনের বাড়ি আর প্লটের সংখ্যা মেলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে সিআইডি। কারণ এখন পর্যন্ত এনু-রুপনের মালিকানাধীন ২২টি বহুতল বাড়ি ও একাধিক প্লটের সন্ধান মিলেছে। এগুলোর ঠিকানা হলো— ৪০ গুরুদাস সরদার লেনে ২০তলা নির্মাণাধীন বাড়ি, ১ নম্বর নারিন্দা লেনে চারতলা বাড়ি, ৬/২ গুরুদাস সরদার লেনে একটি নির্মাণাধীন বাড়ি, ৩৯ নম্বর শরৎগুপ্ত রোড (দাদা ভাই বাড়ি) ১৬ কাঠা জায়গা, ৬৯ শাহ সাহেব লেনে ১০তলা বাড়ি, ৭৩ নম্বর শাহ সাহেব লেনে আরেকটি বাড়ি, ১২৪/৫ ডিস্টিলারি রোড মুরগিটোলায় সাততলা বাড়ি, ৩৯ ডিস্টিলারি রোডে আরেকটি পুরনো বিল্ডিং। ওয়ারী এলাকার লালমোহন শাহ স্ট্রিটে চারটি বাড়ি আছে। এগুলো হলো— ১০৬ নম্বর হোল্ডিংয়ে ১০তলা বাড়ি (মমতাজ ভিলা), ১২২/এ ১২১ এবং ১০৩ নম্বর হোল্ডিংয়ে আরও দুটি বাড়ি, ৪৪/বি ভজহরি সাহা স্ট্রিটে চারতলা বাড়ি, ৭১/১ দক্ষিণ মৈসুন্দি এলাকায় আরেকটি বাড়ি, ধোলাইখাল হানিফ গার্মেন্টের সঙ্গে বাঁধন এন্টারপ্রাইজ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মুরগিটোলা মোড়ে এনু-রুপন স্টিল হাউস, কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া এবং মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে দুটি বিশাল বাংলোবাড়ি। এছাড়া, এনু ও রুপন ভূইয়ার ব্যাংক হিসাব-সংক্রান্ত দলিলপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, পুরনো ঢাকার কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় এনু ও রুপনের নামে একের পর এক হিসাব খোলা হয়। সবচেয়ে বেশি হিসাব খোলা হয় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে। এসব ব্যাংকের কাছে এনু-রুপন ভিআইপি গ্রাহক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ জমার পাশাপাশি এনু ও রুপনের নামে স্থায়ী আমানত হিসাবে বিপুল অঙ্কের আমানত বা এফডিআর করা হয়। সবচেয়ে বেশি এফডিআর আছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে। এই ব্যাংকের নয়াবাজার শাখায় এনামুল হক এনুর নামে আছে ১১টি এফডিআর। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ধোলাইখাল শাখায় রুপন ভূঁইয়ার দুটি এফডিআর-সংক্রান্ত দলিল হাতে পায় সিআইডি। এগুলোর নম্বর হলো— ১১৫৯৬৪৭১৬৭২১৫০৭ ও ১১৫৯৪১১০০৯৮৬৮৪৪। এ দুটি অ্যাকাউন্টে জমা আছে ৬৫ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯২ টাকা। ধরাছোঁয়ার বাইরে ক্যাসিনো সাঈদ : রাজধানীর ইয়ংমেন্স ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র ও বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্লাবের ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯নং ওয়ার্ডের অপসারিত কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক ওরফে সাঈদ ওরফে ক্যাসিনো সাঈদ হচ্ছেন ক্যাসিনো পরিচালনার অন্যতম মূলহোতা। এ তথ্য স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তার নামে দুদকে মামলাও রয়েছে। এত কিছুর পরও এবার সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন তিনি। ক্যাসিনো থেকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ থাকলেও কীভাবে নির্বাচন করছেন তিনি, কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না এমন প্রশ্ন ছিলো সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদের কাছে। কিন্তু তিনি বলেন, ‘ক্যাসিনোকাণ্ডে সিআইডি শুধু ৯টি মানিলন্ডারিং আইনে দায়ের করা মামলা দেখছে। সাঈদ কমিশনারের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং রিলেটেড কোনো মামলা আমাদের কাছে নেই। কিন্তু তদন্তের ফাইল খোলা আছে। মানিলন্ডারিংয়ের ৯টি মামলা ছাড়াও ১০টি মামলা রয়েছে। সেগুলো তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে যারা অভিযুক্ত তাদের ধরা হবে। তদন্তাকালীন সময় সুনির্দিষ্টভাবে এগুলো নিয়ে কথা বলা যাবে না। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ আত্মগোপনে চলে যান। তিনি বিদেশে থাকার সময়ই তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছিল, খেলার ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনার অন্যতম রূপকার সাঈদকে তারা খুঁজে পাচ্ছে না। এর তিন মাস পর গত ২৬ ডিসেম্বর তিনি আবারো ঢাকায় ফেরেন। এর আগেই তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সাঈদ অসৎ উদ্দেশে নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাসিনো ব্যবসাসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে চার কোটি ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার ২৬১ টাকা অর্জন করেছেন। তবে গণমাধ্যমে দুদকের এ মামলাকে ‘গাঁজাখুরি মামলা’ বলে মন্তব্য করেছেন সাঈদ। আর এখনো আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, বহাল তবিয়তে। আমারসংবাদ/এমএআই