বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০

২৩ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ

জানুয়ারি ১৪,২০২০, ১১:০৪

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

বাতাসে ছড়াচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক

পরিত্যক্ত টায়ার জ্বালিয়ে তেল উৎপাদনে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা মনে করেন, কিছু ব্যবসায়ী উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার না করার কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে সেটা ঠিক, তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এ শিল্প চালিয়ে নেয়া সম্ভব। এটি একটি নতুন সেক্টর। এ সেক্টর নিয়ে যদি সরকার গবেষণা করে খারাপ সাইডগুলো সংশোধন করে সামনে আগানো গেলে আগামীর বাংলাদেশকে নতুন কিছু উপহার দেবে এ শিল্প। পরিবেশবিদদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টায়ার পোড়ানোর ফলে বাতাসে ছড়াচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক। গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার পুড়িয়ে জ্বালানি তেল তৈরি করতে ঢাকার আশপাশে প্রায় অর্ধশতাধিক কারখানা রয়েছে। ফলে নগরীর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে কার্বন মনো অক্সাইড, নাইট্রোজেন ও মিথেনসহ ১৬ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাস। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, ২১টি কারখানা বাদে বাকি সব অবৈধ। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টায়ারের মতো বিষাক্ত বস্তু রিসাইক্লিং করার অনুমতি দেয়ার আগে যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন ছিলো। কারখানার চারপাশ কার্বনের রংয়ে ঢাকা। ঢাকার আমিনবাজারের চানপুরে অবস্থিত একটি পাইরোলাইসিস রিসাইক্লিং কারখানায় পরিত্যক্ত টায়ার পুড়িয়ে তৈরি হয় ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি তেল। কমেপ্রসারে প্রায় ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলিয়ে প্রতি ১০ টন টায়ার থেকে বের হয় ছয় টন তেল, দুই টন কার্বন এবং বাকিটা লোহার কাঁচামাল। মাটির উর্বতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর পরিত্যক্ত টায়ার। তাই রিসাইক্লিং করাটা আপাতত দৃষ্টিতে শুভ কাজ বটে কিন্তু বায়ুদূষণের প্রশ্নে তা কতটুকু পরিবেশ সম্মত? বাংলাদেশে এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা না থাকলেও থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিডার এক গবেষণা বলছে, টায়ার পাইরোলাইসিস কারখানা ১৬ ধরনের বায়বীয় রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। যার মধ্যে মিথেন ৩৩.২ শতাংশ, হাইড্রোজেন ১৫.৬, নাইট্রোজেন ১২.২ এবং কার্বন মনোঅক্সাইড চার শতাংশ। যা বাতাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহেদা বেগম আমার সংবাদকে বলেন, অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশের ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে তাদের অবশ্যই কারখানার ভেতরেই সব কার্যক্রম চালাতে হবে। কালো ধোঁয়াসহ কোনো ধরনের প্রভাব বাইরে না যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া কারখানা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অবৈধভাবে কারখানা চালানোর কোনো সুযোগ নেই। আমিন বাজারের স্থানীয় এক বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে কাছাকাছি ছয়টি পাইরোলাইসিস কারখানা রয়েছে। যাদের কাছে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তা স্বীকার করেন এক কারখানার কর্মকর্তা। কারখানাগুলোর চোখ ফাঁকি দিতে দিনের বেলা আগুন জ্বালায় না। অন্ধকারে ধোঁয়ার তীব্রতা পুরোটা ধরা না পড়লেও অনেকটাই স্পষ্ট হলো পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ অফিসের আলোয়। বিশেষ করে বর্তমানে শীতের দিন হওয়ায় রাতে কুয়াশার আঁধারে কাজ চলছে পুরোদমে। পাইরোলাইসিস রিসাইক্লিং অয়েল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন প্রোমা-এর তথ্যমতে, সারা দেশে এমন প্ল্যান্ট আছে ৫০টির উপরে। সাভার, কেরানীগঞ্জসহ ঢাকাতেই ৩০টি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ছাড়পত্র আছে অর্ধেকেরও কম কারখানার। পাইরোলাইসিস রিসাইক্লিং অয়েল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১০-১৫টি ছোট ছোট কারখানা বাদে বেশিরভাগ কারখানা স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশে টায়ার রিসাইক্লিং করা হয় উন্নত প্রযুক্তিতে। তবে পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার না করায় সমপ্রতি ২৭০টি কারখানা বন্ধ করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ কন্ট্রোল বোর্ড। এই খাতের ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিমাসে প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন পরিত্যক্ত টায়ার রিসাইক্লিং করে জোগান দেয়া হচ্ছে ২৫ লাখ লিটার জ্বালানি তেল। তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, দূষণ নিরোধক প্রযুক্তি নিশ্চিত করেই চালু রাখার কথা ভাবতে হবে এই খাত। এ বিষয়ে পরিবেশবিদ আলম সাইন আমার সংবাদকে বলেন, টায়ার জ্বালিয়ে তেল উৎপাদনের ফলে যে রাসায়নিক গ্যাস নির্গত হয় এতে ফুসফুসের সমস্যাসহ শ্বাসজনিত অনেক রোগের সৃষ্টি হয়। তবে যেহেতু এটি একটি সম্ভাবনাময় শিল্প তাই আমি মনে করি এটাকে বন্ধ না করে বিভাগীয় শহরের বাইরে দূরে কোথাও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে করা যেতে পারে। এ বিষয়ে পাইরোলাইসিস রিসাইক্লিংয়ের একজন নব উদ্যোক্তা মো. নাসিরুল ইসলাম নাসির বলেন, বাংলাদেশে কম দামের মেশিন ব্যবহার করে অনেক কোম্পানি রিসাইক্লিং করে। যে কারণে ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাস বের হয়ে তা বাতাসের সাথে মিলে পরিবেশের ক্ষতি করছে। তবে এটা চীন, মালয়েশিয়াসহ অনেক উন্নত দেশে এই ব্যবসা করা হয় পরিপূর্ণ পরিবেশের ক্ষতি না করে। আমি সে সমস্ত দেশে গিয়েছি এবং দেখেছি। তারা যে মেশিন ব্যবহার করে তাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাস বাইরে আসার সুযোগ নেই। গ্যাসটা ভেতরেই ব্যবহারের সুযোগ আছে। কালো ধোঁয়া বা ক্ষতিকারক কোনো পদার্থ বাইরে আসার সুযোগ নেই। সুতরাং আমরা যদি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি তাহলে এটা একটা নতুন শিল্প হতে পারে এবং এখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। টায়ার জ্বালিয়ে তেল উৎপাদন যেহেতু নতুন একটি প্রযুক্তি তাই এটাকে নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সবুজ আন্দোলনের চেয়ারম্যান বাপ্পি সরদার। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই এ প্রযুক্তি আছে। তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তা করছে। সুতরাং বাংলাদেশেও এটা করা হচ্ছে তবে পরিবেশের ক্ষতি করে। পরিবেশের কারা ক্ষতি করছে অনুন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের আগে চিহ্নিত করা উচিত। সমস্ত অবৈধ কারখানার তালিকা করে তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনা উচিত। তারা যেহেতু এখানে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছে সুতরাং তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে যেভাবে এ কাজ করতে পারে সে বিষয়ে ভাবতে হবে সরকারকে। নতুন এই শিল্পকে গবেষণা করে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া উচিত। সাথে সাথে এদের জন্য একটি জোন নির্ধারণ করা উচিত বিভাগীয় শহর থেকে একটু দূরে। এ কার্যক্রম যারা চালাতে চান তাদের ওই জোনে স্থানান্তর করতে হবে। এবং সেখানে পরিপূর্ণ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে। এ সমস্ত নির্দেশনা মেনে আগাতে পারলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাবে, তেমনি এই শিল্পখাতটিও আলোর মুখ দেখবে। আমারসংবাদ/এমএআই