মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম

জানুয়ারি ১৮,২০২০, ১২:৪৪

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

প্রচারণায় জমজমাট ভোট উৎসব

ভোটারদের স্বপ্নছোঁয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন আসন্ন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। গতকাল অষ্টম দিনের প্রচারণায় ও গণসংযোগে গিয়ে ঢাকাকে পরিবর্তন এবং দীর্ঘ প্লান নিয়ে সেবা নিশ্চিতে অঙ্গীকার করে আসছেন তারা। তরুণ প্রজন্মের প্রার্থীরা উন্নত, আন্তর্জাতিক নগর গঠনের কথা বলছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক অভিজ্ঞ প্রার্থীরা অবরুদ্ধ ঢাকাকে পুনরুদ্ধার করে প্রতিটি নাগরিকের চাহিদার আলোকে সেবা নিশ্চিতের আশাও দিচ্ছেন। প্রচারণার অর্ধসময়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ভোট প্রার্থনা করছেন প্রার্থীরা। তবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে শেষ প্রত্যাশা করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী রাজনৈকিত দল বিএনপি গণতন্ত্র উদ্ধার, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি নিয়ে ভোট আবেদন করছেন। নগর উন্নয়নে জীবন দিতে প্রস্তুত : ইশরাক আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে দেশকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা শুধু দেখাচ্ছে উন্নয়নের জোয়ার, অথচ বৃষ্টির জোয়ারে রাস্তাঘাট ভেসে যায়। তাই কোনো বাধা-বিপত্তি না মেনে আগামী ৩০ জানুয়ারি আপনারা আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন।আমি আপনাদের উন্নয়নের জন্য বীজন দিতে প্রস্তুত আছি।’ গতকাল রাজধানীর কদমতলী থানার ৬১ নং ওয়ার্ডের দনিয়া বর্ণমালা স্কুলের সামনে নিজ নির্বাচনি প্রচারণায় গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ভোটারদের উদ্দেশে ইশরাক বলেন, ‘আপনারা খালি একটু চিন্তা করে দেখেন, গত ১৩ বছরে এমন কোনো অপকর্ম নেই যে, সেটা এ সরকার করেনি। শেয়ার মার্কেট লুট, বাংলাদেশ ব্যাংক লুট, ব্যাংকের ভল্ট থেকে সোনা লুট, সরকারি ব্যাংক লুট, ধর্ষণ, হত্যা, গুম, খুন, ভোটের অধিকার হরণ, জনগণের কথা বলার অধিকার হরণ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল এই বাংলাদেশের জন্য? এরা এমনই উন্নয়ন করে যে, পদ্মা সেতুর একটা করে পিলার বসিয়ে হেডলাইন করে। এমন আজব উন্নয়ন আমরা দেখিনি। একটা করে স্প্যান বসায় আর উদ্বোধন করা হয়। এই ব্রিজ কবে খুলবে? কবে আমরা ব্যবহার করতে পারবো? সেটা আমরা জানি না। এক টাকার জিনিস ২০ টাকা হয়েছে। জনগণের টাকার অপচয় করা হয়েছে। আর তারা হাজার কোটি টাকা বিদেশে সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডায় পাচার করা হয়েছে। এরা ২০০ টাকার বালিশ সাত হাজার টাকায় কিনেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার বাবা শিখিয়েছে! কোনো মানব সন্তান অন্য মানুষের কাছে মাথানত করবে না। আল্লাহ তায়ালা বানিয়েছেন— উনাকে ভয় করবে, এছাড়া দুনিয়াতে কোনো মানুষকে ভয় করবে না। আমরা কারো জমিদারি মানবো না। জনগণকে সামনে নিয়ে জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে দেবো। আপনারা বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলরদের ভোট দেবেন। কারণ তারা আমাদের সঙ্গে সংগ্রামে যুক্ত।’ আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর সমালোচনা বিএনপির এই মেয়র প্রার্থী আরও বলেন, ‘গত ৯ বছর আওয়ামী লীগের অধীনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত হচ্ছে। আমি এই এলাকার দুর্দশার কথা জানতে পেরেছি, আমি নিজেও এই এলাকা ঘুরে দেখেছি, আপনাদের যে সমস্যাগুলো রয়েছে, আসার সময় দেখলাম বড় একটা নর্দমা। সেই নর্দমার মধ্যে দিয়ে ময়লা পচা আবর্জনাযুক্ত পানি বয়ে যাচ্ছে। তার ঠিক পাশেই ঘনবসতি। কাঁচা বাজার এবং অন্যান্য সামগ্রী দোকানপাট রয়েছে। এই যে দূষিত পরিবেশ বিরাজমান, এইটা পুরো ঢাকা শহরের চিত্র।’ ইশরাক বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে প্রথমে এই এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করবো। ঢাকা ওয়াসাকে সঙ্গে নিয়ে এলাকা আধুনিক ড্রেনেজ সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসবো। বিশুদ্ধ পানির সঞ্চালনের জন্য ওয়াসার সঙ্গে বসে আমরা সেই সঞ্চালন লাইন প্রতিস্থাপন করবো। ডেঙ্গুর বিষয়ে পুরো ঢাকার ওপর আমাদের একটা কার্যক্রম রয়েছে। এই এলাকা সেই একই কার্যক্রমের আওতায় আসবে। আমরা যথাসময়ে, যথা পরিমাণে, যথাযোগ্য মানের ওষুধ প্রয়োগ করে আমরা এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণের বিস্তার রোধ করবো।’ ঐতিহ্যের ঢাকাকে পুনরুদ্ধার করতে চাই : তাপস আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, ‘ঢাকা আমাদের ঐতিহ্য ও গর্বের ঢাকা। এই ঢাকাকে আমরা পুনরুদ্ধার করতে চাই। তাই আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমিই একমাত্র মেয়র প্রার্থী, যিনি ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকাকে উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচটি রূপরেখা দিয়েছি। আমি নির্বাচিত হলে সবগুলো রূপরেখা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।’ গতকাল রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় বঙ্গবাজার এলাকা থেকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করার আগে তিনি এসব কথা বলেন। তাপস বলেন, ‘এই ঐতিহ্যবাসী ঢাকার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং এর স্বকীয়তাকে আমরা পুনরুজ্জীবিত করবো। আমাদের পাঁচটি রূপরেখা হলো— ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা এবং উন্নত ঢাকা গড়বো।’ এসময় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির নেতাদের অভিযোগের প্রসঙ্গে তুলে তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মী ও জনগণের মাঝেও একটি উৎসবমুখর সুষ্ঠু পরিবেশ আছে। উনারা অভিযোগ নিয়ে ব্যস্ত, আমরা গণসংযোগ নিয়ে ব্যস্ত।’ দলীয় নেতাকর্মীদের এ সময় নির্বাচনি আচরণবিধি যাতে লঙ্ঘন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেন তিনি। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের এই মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে আমরা যে গণসংযোগ শুরু করেছি, তাতে আমরা ঢাকাবাসীর অনেক সাড়া পাচ্ছি। আমরা স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাচ্ছি। আমরা যে উন্নয়নের রূপরেখা দিয়েছি, ঢাকাবাসী তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছে বলে আমি মনে করি। আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নগরবাসী আমাকে নির্বাচিত করবে বলে আমি আশাবাদী।’ এ সময় তিনি ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে দলের কাউন্সিলর প্রার্থী মীর সমীর ও মহিলা কাউন্সিল রুনা হুমায়ুন পারভীনকে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে শেখ তাপস নেতাকর্মীদের নিয়ে পুরান ঢাকার সংশ্লিষ্ট এলাকার অলিগলিতে লিফলেট বিতরণ করে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে ভোট চান। ধানের শীর্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে : তাবিথ আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত মন্তব্য করে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেছেন, ‘সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মানুষের কাছে বিপুল সাড়া পাচ্ছি। আজ ধানের শীর্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই জোয়ার অব্যাহত থাকবে এবং ধানের শীষকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যাবে।’ গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর রাজিয়া সুলতানা রোডে গণসংযোগকালে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির এই মেয়র প্রার্থী আরও বলেন, ‘ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজসহ নাগরিক সুবিধা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী। আমরা সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে আধুনিক ঢাকা গড়ে তুলবো।’ নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) ব্যাপক সমালোচনা করে তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘সরস্বতী পূজার দিন ভোট দিয়ে নির্বাচন কমিশন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। আমরা আপিল বিভাগের দিকে তাকিয়ে আছি।’ এর আগে এদিন সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে অষ্টম দিনের মতো গণসংযোগ শুরু করেন তাবিথ আউয়াল। এসময় বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, উত্তরের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনসহ স্থানীয় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গণসংযোগে অংশ নেন। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবো : আতিকুল আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আমি নির্বাচিত হলে প্রতিটি কাউন্সিলর এবং এলাকার জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতি মাসে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে টাউনহল মিটিং করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।’ গতকাল নির্বাচনি প্রচারণার অষ্টম দিনের গণসংযোগের সময় বাউনিয়া এলাকায় এ ঘোষণা দেন তিনি। এ সময় আওয়ামী লীগের এই মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘আপনারা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে সিটি কর্পোরেশনের সকলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবো। এলাকার যত সমস্যা আছে, যেগুলোর সমাধান হয়নি, যেসব উন্নয়নকাজ বাকি আছে; সেগুলো সমাধান করা হবে। এ ছাড়াও কোন কাজগুলো আগে করতে হবে, অর্থাৎ সমস্যা চিহ্নিত এবং তার সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে টাউনহল মিটিংয়ে। যার মাধ্যমে জনগণের কাছে আমাদের সবার জবাবদিহিতা থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলে আমার কাউন্সিলর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হলে সিটি কর্পোরেশন ও আমাদের যা আছে তাই দিয়ে জনগণের সেবা করে যাব। যা আছে তাই দিয়েই সেবা করে যেতে হবে। জনগণের কাছে এটি আমাদের অঙ্গীকার।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, যেখানে ২০ ফুট রাস্তা আছে, সেটিকে অন্তত ৬০ ফুট করতে হবে। আপনারা এ এলাকায় স্যুয়ারেজ লাইনসহ প্রশস্ত রাস্তা চেয়েছেন। ইনশাআল্লাহ আমি দায়িত্ব নিলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে এখানে প্রশস্ত রাস্তা হবে। স্যুয়ারেজ লাইন থাকবে, বাতি থাকবে। কীভাবে হবে? কারণ বিগত ৯ মাস ধরে এ কাজ শুরু করেছি আমরা।’ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘নৌকার কোনো ব্যাক গিয়ার নেই, নৌকার আছে শুধু ফ্রন্ট গিয়ার। আর এই ফ্রন্ট গিয়ার মানে শুধু উন্নয়নের গিয়ার। ৯ মাস দায়িত্ব পালনকালে আমরা নানা সমস্যা চিহ্নিত করেছি, সেসব সমস্যা সমাধানে পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী ৩০ জানুয়ারি আপনারা যদি আমাকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন, তাহলে ফুটপাত, এলইডি লাইট, ড্রেনেজ, রাস্তাসহ আধুনিক পরিকল্পিত বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার কাজ আগামী ছয় মাসের মধ্যে শুরু করবো ইনশাআল্লাহ।’ নির্বাচনি গণসংযোগের অষ্টম দিনে আতিকুল ইসলামের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ আওয়ামী সম্ভাবনার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেতারা। এ দিন সকালে কালিবাড়ি (বালুঘাট) বাউনিয়া মোড় গণসংযোগ শুরু করেন আতিকুল ইসলাম। এরপর মানিকদি, মাটিকাটা, লালসরাই এলাকায় গণসংযোগ চালান। দুপুরের পর ভাষানটেক, বাইগারটেক, আলুব্দীটেক, বারনকোট, দামালকোট ও বিআরবি কলোনি এলাকায় নৌকার পক্ষে ভোট চাইবেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী। আমারসংবাদ/এমএআই