রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১১ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাহমুদুল হাসান

জানুয়ারি ২২,২০২০, ১২:৫৫

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বেড়েছে সেবা গ্রহীতা

  • পাঁচ দশকে সেবা গ্রহীতা বেড়েছে ৫৫ শতাংশ
  • সামাজিক সচেতনতা বেড়েছে
  • দুর্গম এলাকায় সেবা পৌঁছানো এখনো চ্যালেঞ্জ
  • চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে অধিদপ্তর
শরীয়তপুরের পদ্মাপাড়ের কৃষক আয়নাল মিয়া। চার দশক আগে বিয়ে করেছেন। স্ত্রী, চার মেয়ে এবং এক ছেলে নিয়ে তার পরিবার। একের পর এক কন্যাসন্তান তার পরিবার আলোকিত করলেও পরিবারের প্রদ্বীপ জ্বালাবে কে এই আশায় তিন কন্যার জন্মের পরও তিনি কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করেননি। আয়নাল মিয়ার অভাব-অনটনের ঘর। পাঁচ সন্তানের লেখাপড়ার শখ থাকলেও বেশি যায়নি। কারণ খেতের ফসল পদ্মার বানে অনেক সময় ধুয়ে নিয়ে যায়। তাই তাদের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। মেয়েদের সামান্য পড়িয়ে বিয়ে দিলেও তিন কন্যার পর জন্ম নেয়া একমাত্র পুত্র জানে আলমকে (ছদ্মনাম) এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করান। এরপর লেখাপড়ারা পাঠ চুকিয়ে বাবার সাথে সংসারের হাল ধরেন। ঢাকার নিউ সুপার মার্কেটে একটি ফ্যাশন হাউসে কাজ শুরু করেন। গত তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন। ঘরে ফুটফুটে কন্যারও জন্ম হয়েছে। ইতোমধ্যে জানে আলম তার স্ত্রীর সঙ্গে বোঝাপড়া করে পরিবার পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছেন। তার ভাষ্য, কন্যা আর পুত্র কি, সন্তান তো সন্তানই! তাই তিনি এসব নিয়ে চিন্তিত নন। এখন এই কন্যাকে গড়ে তুলতে চান ভালো মানুষ হিসেবে। পুত্রের আশায় তার পিতার মতো অপরিকল্পিতভাবে সন্তান নিতে চান না। চার দশকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে অন্তত এমন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামান্য শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা আর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিদপ্তরের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু তবুও পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। এই অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলে আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রায় যে দুই শতাংশের নিচে প্রজনন হার কমিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ সেটা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এছাড়াও এসব সূচকের উন্নয়নে সব শ্রেণিপেশার মানুষকে যুক্ত করারও পরামর্শ এসেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে দেশে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতার হার অন্তত ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৮ সালে পরিচালিত এক জরিপের তথ্যমতে, ১৯৭৫ সালে যেখানে পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার ছিলো ৭ দশমিক ৭ শতাংশের নিচে। সেই সংখ্যা ২০১৭ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক এক শতাংশের বেশিতে। গত ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত এক অর্থবছরে পরিবার পরিকল্পনায় সাফল্য এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় পৌনে সাত লাখ নারী-পুরুষ স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে এক লাখ ৩৩ হাজার ৩৫ জন নারী-পুরুষ স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। বাকি পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৪৩ জন নারী ও পুরুষ দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধিও লক্ষ্যে কাজ করছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য থেকে আরও জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে দেশে গড় প্রজনন হার ছিলো ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। সেই হার ২০১১ সালে নেমে এসেছে ২ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক এক গ্লোবাল সামিটে বাংলাদেশ ঘোষণা করে, চলতি বছরে (২০২০) দেশের প্রজনন হারকে দুই শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা হবে। সেই লক্ষ্যে কাজ করছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। ইতোমধ্যে দেশের নারী-পুরুষকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। গত বছর থেকে বিবাহ পূর্ব কাউন্সেলিং শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সভা-সেমিনার, পথনাট্য, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। দেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ভূমিকা রাখছে আমাদের অদম্য নারীরা। তাদের মধ্যে সচেতনতা গড়তে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে অধিদপ্তর। সেইসাথে ইতোমধ্যে নগরীর বস্তিরবাসীকে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (তথ্য, শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা) আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। দেশর মানুষের মধ্যেও সচেতনতাবোধ তৈরি হচ্ছে। এজন্য এখন পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাও বাড়তে শুরু করেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে প্রত্যেকের যায়গা থেকে কাজ করতে হবে। তাহলে একটি পরিকল্পিত দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমারসংবাদ/এসটিএমএ