মঙ্গলবার ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

৫ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাহমুদুল হাসান

জানুয়ারি ২৪,২০২০, ১২:৩৪

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

করোনা ভাইরাস আতঙ্ক

নতুন করোনা ভাইরাস আতঙ্ক এখন সর্বত্র। গেলো বছর ডেঙ্গু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিয়েছিল। নতুন বছরে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক এখন সবার মনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসের নাম দিয়েছে ২০১৯-এনসিওভি। এটি এক ধরনের করোনা ভাইরাস। ভাইরাসটির অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র সাতটি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। গেলো বছরের শেষ দিনে চীনের উহান প্রদেশের একটি সি ফুড মার্কেট থেকে এই রোগের উদ্ভব হয়। ধারণা করা হয়, ভাইরাসটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। এরপর থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। একে একে ভাইরাসটি চীনের তেরোটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে চীনের পাঁচশতাধিক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত সতেরো জনের। বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে ভাইরাসটি চীন ছাড়িয়ে এখন থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের ভয়াবহ রকমের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ করোনা ভাইরাস আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে দেশের কোনো নাগরিক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। শেষ পর্যন্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্তের এই ঘটনাকে মহামারিও ঘোষণা করা হতে পারে। সেই লক্ষ্যে গতকাল ও পরশু (বুধবার) বৈঠক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ভাইরাসটি নতুন হওয়ায় এখনো এর কোনো চিকিৎসা কিংবা প্রতিষেধক নেই বাজারে। তাই প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতাই এখন বড় হাতিয়ার। এদিকে নতুন ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে উৎপত্তিস্থল উহানে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও সেখানকার বাসিন্দাদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শহর না ছাড়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এখনো দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ঝুঁকিতে রয়েছে। সতর্কতা হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের বিমানবন্দরে চীন এবং আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের একটি কার্ড দেয়া হচ্ছে। কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে যান তাহলে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত রিএজেন্ট রয়েছে। এছাড়াও সব স্থলবন্দরগুলোকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ভাইরাসটি হয়তো মানুষের দেহকোষের ভেতরে ইতোমধ্যে ‘মিউটেট করছে’, অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং সংখ্যা বৃদ্ধি করছে। ফলে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আতঙ্কিত না হয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ভাইরাস বহনকারীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী আমার সংবাদকে বলেন, আতঙ্কিত হয়ে কোনো লাভ নেই। নিজেদের সতর্ক থাকতে হবে। আশপাশের সবাইকে সচেতন করতে হবে। যেহেতু নতুন করোনা ভাইরাসটি হাঁচি-কাশি থেকে ছড়িয়ে পড়ছে, তাই একে অন্যের সামনে হাঁচি দেয়া যাবে না। একটু পর পর হাত মুখ ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। কোনো জ্বরজ্বর কিংবা কাশি এলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, নতুন ভাইরাসটি নিয়ে এখনই ভীত হওয়ার কিছু নেই। তবে ঝুঁকি রয়েছে ঠিকই। দেশে এখন কমন কোল্ডের সময়, আর যদি কো-মরবিডিটি থাকে তাহলে যেকোনো ভাইরাসে, যেকোনো ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে সেটা জটিলতার দিকে যেতে পারে। মার্স এবং সার্স পরিবারের এই নতুন করোনা ভাইরাস সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি সবকিছু জানা যায়নি। ভাইরাসটি এখনো স্টেবল অবস্থায় আছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে মৃদু বলে আখ্যায়িত করেছে। তবে ভাইরাসের সক্ষমতা দ্রুত হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে মনিটর করছে, যে এর থেকে মারাত্মক পরিস্থিতি হতে পারে কিনা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, নতুন এই করোনা ভাইরাসের লক্ষণ হলো জ্বর, কফ, শ্বাসকষ্ট। এর থেকে নিউমোনিয়া, তারপর কিডনি ফেইলিউর হওয়ার ঘটনা ঘটছে। সতর্কতা হিসেবে বিমানবন্দর, স্থলবন্দরে স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে যান তাহলে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত রিএজেন্ট রয়েছে। এছাড়াও আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বর (০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫) উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সালে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। এটি মূলত ভাইরাসের বড় একটি গোত্র। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের যে প্রজাতির সংক্রমণ ঘটেছে, তা এর আগে দেখা যায়নি। এই ভাইরাসের সংক্রমণে সাধারণ সর্দি-ঠাণ্ডা থেকে শুরু করে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) পর্যন্ত হতে পারে। সার্স ভাইরাসের সঙ্গে বর্তমান ভাইরাসটির চরিত্রের ৮০ ভাগ মিল রয়েছে। তবে সার্সের মতো আগ্রাসী নয় এই ভাইরাস। এক দশক আগে সার্স নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল সেটিও ছিলো এক ধরনের করোনা ভাইরাস। এতে আক্রান্ত হয়েছিল আট হাজারের বেশি মানুষ। আর একটি ভাইরাসজনিত রোগ ছিলো মিডল ইস্টার্ন রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্স। ২০১২ সালে এতে মৃত্যু হয় ৮৫৮ জনের। এবার প্রতিদিন যে হারে এ রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এবং যেভাবে এর বিস্তার ঘটছে তাতে মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমারসংবাদ/এসটিএমএ