মঙ্গলবার ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

৫ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু

জানুয়ারি ২৪,২০২০, ১২:৩৭

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

শাশুড়িতেই বিচ্ছেদ আত্মহনন

মা—পরম পূজনীয়, শাশুড়ি- মাতৃস্থানীয়া। কিন্তু বর্তমান সময়ে কন্যা-জামাতার দাম্পত্য সুখের অন্যতম অন্তরায়ই শাশুড়ি। সুখী দাম্পত্যে শাশুড়ির প্রভাবে ঘটছে বিবাহ বিচ্ছেদ ও আত্মহননের মতো ঘটনাও। এক্ষেত্রে কেবল নারীরাই শাশুড়ির কূটকৌশলের শিকার তা নয়, বরং পুরুষরাও শাশুড়ির সিনেমাটিক কূটকৌশলের শিকার। যারা পারছেন সয়ে নিচ্ছেন আর যারা শাশুড়ির কূটকৌশলের কাছে হার মানছেন তারা শেষ পর্যন্ত আত্মহননের সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। এসব ঘটনার বেশিরভাগই এখনো সমাজের সামনে বা প্রকাশ্যে না আসায় দৃষ্টির আড়ালেই থাকছে। তবে হালে ধীরে হলেও সামনে আসতে শুরু করেছে। গতকাল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল কুদ্দুসের আত্মহনন ঘটনাও অনেকটাই শাশুড়িকে দায়ী করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শাশুড়ির কূটকৌশলের শিকার হয়েই মিথ্যা মামলারও শিকার হতে হচ্ছে অসংখ্য নিরাপরাধ পুরুষকে।যাদের দাম্পত্যজীবন স্বাভাবিকভাবে চললেও শাশুড়ির কূটকৌশলের প্রভাবেই আদালতেও বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতনসহ যৌতুকের মিথ্যা মামলা। এমনি এক মিথ্যা মামলার শিকার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সাইফুল ইসলাম (ছদ্মনাম) নামের একব্যক্তি। যিনি দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর ধরে সেই মিথ্যা মামলার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। যদিও স্ত্রীর সঙ্গে তার আদৌ কোনো সঙ্ঘাতই হয়নি। উভয় পরিবারের পছন্দেই বিয়ে হয়। মেয়েকে সাংসারিক সম্পর্কে ছেদ টানতে মিথ্যা মামলায় বাধ্য করে একমাত্র শাশুড়িই— এমনটাই দাবি তার। বিভিন্ন ঘটনা থেকে জানা যায়, কুচক্রী শাশুড়ির ষড়যন্ত্রের কারণেই অসংখ্য দাম্পত্য সম্পর্কে তৈরি হচ্ছে সমন্বয়হীনতা। বর্তমানে অনেক শাশুড়িকেই দেখা যায় মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর জামাতার সংসার পরিচালনায় নাকগলাতে অতিউৎসাহী হতে। তার অতি উৎসাহ বা অন্য কোনো কূট উদ্দেশ্য যখন প্রত্যাখ্যাত হয় তখনই শাশুড়ি তার আসল চেহারায় আবির্ভূত হয়। মেয়ে-জামাইয়ের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। স্বামী-সংসার বুঝে ওঠার আগেই মেয়ে মায়ের পরামর্শ ও নির্দেশ পালনে তৎপর হয়ে ওঠে। মায়ের প্ররোচনায় ভুল পদক্ষেপ নিয়ে সুখের সংসারে আগুন জ্বালাতে শুরু করে। সেসব ভুল সিদ্ধান্তের ভুক্তভোগী হন স্বামী ও তার পরিবার। সমাজের বিভিন্ন স্তরের শাশুড়িই মেয়ের দাম্পত্য জীবনে নিজের মতামত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এতে উল্টো নিজের মেয়ের প্রতিই স্বামীর পক্ষের লোকজনের বিরূপ ধারণার জন্ম হচ্ছে। পক্ষান্তরে মেয়েকে প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সুপরামর্শ দেয়ার বদলে কূটকৌশল ও স্বার্থপর হতে শেখানোর এহেন অপচেষ্টায় স্বামীর কাছ থেকেও নিজ মেয়েকে সরিয়ে দিচ্ছেন অনেটকাই দূরে। যা শেষ পর্যন্ত আত্মহনন কিংবা আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে মিথ্যা মামলারূপে। রাজধানীর মিরপুর পুলিশ লাইনের কনস্টেবল শাহ আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে স্ত্রীর পরিবার থেকে সেরকমটি ঘটানোর সুযোগ তিনি দেননি। নিজেও তাদের বিরুদ্ধে সেরকম কোনো অভিযোগ তোলেননি। বরং নিজেকেই অসহায় মনে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ত্রী ও শাশুড়িকে নিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেন পেশাগত কাজে ব্যবহূত বন্দুকের গুলিতে। কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাউদ্দিন মিয়া জানান, আব্দুল কুদ্দুস আজ (বৃহস্পতিবার) ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র নিয়ে ডিউটিতে যাওয়ার সময় সেই অস্ত্র দিয়েই পুলিশ লাইন মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন তার মৃত্যুর জন্য কেউই দায়ী নয়। আবার লেখার ভেতরে তার বউ-শাশুড়ির নামেও বিভিন্ন কথা লিখেছেন। বিষয়টি তদন্ত চলছে এবং এরই মধ্যে ময়নাতদন্তের জন্য তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গেও পাঠানো হয়েছে। নিহত আব্দুল কুদ্দুস ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করবো না। আমার ভেতরের যন্ত্রণাগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। প্রাণটা পালাই পালাই করছে... তবে সকল অবিবাহিতগণের প্রতি আমার আকুল আবেদন, আপনারা পাত্রী পছন্দ করার আগে পাত্রীর ‘মা’ ভালো কি-না সঠিকভাবে খবর নেবেন। কারণ পাত্রীর ‘মা’ ভালো না হলে, পাত্রী কখনোই ভালো হবে না। ফলে আপনার সংসারটা হবে দোজকের মতো। সুতরাং সকল সম্মানীত অভিভাবকগণের প্রতি আমার শেষ অনুরোধ বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেবেন।’ এদিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সাইফুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বলেন, ২০১৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর পারিবারিক পছন্দে বিয়ে হয় তার। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ হয়নি সেসময়। এরই মধ্যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার স্ত্রীকে চাপ দিয়ে তার বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌতুকের টাকার জন্য একবস্ত্রে সন্তানসহ মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। আদালত চত্বরে প্রথম হাজিরার দিন স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলে মামলার দেয়ার কারণ জানতে চাইলে- স্ত্রী তাকে জানান (শাশুড়ির উপস্থিতিতেই), পার্শ্ববর্তী গ্রামের মজিবুল হক নামের একব্যক্তির পরামর্শে তার মা তাকে দিয়ে জোরপূর্বক মামলাটি দায়ের করান। এরকম হাজারো ঘটনার নজির রয়েছে যাতে শাশুড়ির প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে এবং প্রেক্ষাপট যখন এমন- তখন বর্তমান সমাজে এরকম ঘটনায় নিজেকে অসহায় মনে করে কেউ কেউ পুলিশ কনস্টেবল কুদ্দুসের মতো আত্মাহুতির সিদ্ধান্তও নিয়ে নেন এবং এ সমস্যায় সমাধানের সুযোগ নেই বলেও মনে করেন অনেকেই। শাশুড়ির কারণে সংসারে অশান্তি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, পরিস্থিতি কতটা গুরুতর সেটা এত দূর থেকে আমাদের বোঝার কোনো উপায় নেই। তাই ব্যাপারটা আপনাকেই নির্ধারণ করতে হবে। এসব ঘটনায় নারীদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাশুড়ি কি আপনার গায়ে হাত তোলে? বা শারীরিকভাবে আঘাত করার চেষ্টা করে? কিংবা আপনাকে নানান কারণে মেরে ফেলার বা গায়ে হাত তোলার হুমকি দেয়? কিংবা গোপনে অন্য লোক দ্বারা আপনাকে নানান রকম ভয়ভীতি প্রদর্শন করে? এবং এসব কিছুতে কি আপনার স্বামী নির্বিকার? তাহলে অবিলম্বে সেই বাড়ি ত্যাগ করুন। যদি একান্তই ত্যাগ করতে না পারেন তাহলে গোপনে থানায় জিডি করিয়ে রাখুন। এবং সে বিষয়ে বিস্তারিত নিজের কাছের বন্ধুকে বা ভাইবোনকে জানিয়ে রাখুন। যদি পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ না হয়, তাহলে প্রথমেই নিজের স্বামী বা স্ত্রীর সাথে কথা বলুন। তবে বাড়িতে বসে নয়, বাইরে কোথাও। কথা শুরুর আগে তাকে ভালোমত জানান যে, আপনি তাকে কতটা ভালোবাসেন। এবং তারপর গুছিয়ে বুঝিয়ে বলুন যে তার মা যা করছে সেটা আসলেই ঠিক নয়, এবং এ অন্যায় আপনার পক্ষে মেনে নেয়া খুব কষ্টকর একটি বিষয় হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আপনাদের সম্পর্কের ক্রমশ অবনতি হবে। সর্বোপরি নারী ছাড়াও পুরুষদের বিষয়েও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন ‘আমার মা ঠিক, আমার মা কখনো ভুল করতে পারেন না’! এবং দাম্পত্য সমস্যার শুরু আসলে এই ভাবনা থেকেই। আপনার স্বামী বা স্ত্রীও কি তাই মনে করেন? বারবার বুঝিয়ে বলাতেও কি কাজ হচ্ছে না? তাহলে এবার পালা পরিবারের বড়দের দারস্থ হওয়ার। নিজের ও শ্বশুরবাড়ির সিনিয়র ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হন। যেমন নিজের মা-বাবা ও বড় ভাই-বোন, শ্বশুর, ভাসুর, ননাস। তাদের সবাইকে একত্রিত করুন এবং শাশুড়ি ও স্বামী-স্ত্রীর সামনেই বিষয়গুলো খুলে বলুন। কোনো প্রকার লুকোচুরি রাখবেন না। আপনি কী চান, কী অনুভব করছেন সবকিছু অকপটে বলুন। এতে একটা ঝামেলা হবে ঠিকই, কিন্তু বড়দের হস্তক্ষেপে একটা সমাধানও বের হয়ে আসবে। এসবের পরও সমাধান হয়নি? এবং আপনি চাইলেও ডিভোর্স দিতে পারছেন না, সন্তান বা অন্য কোনো কারণে? তাহলে নির্বিকার চিত্তে এড়িয়ে যাওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করুন। কাজটা ভীষণ কষ্টের, তবু যেহেতু আপনার অন্য কোনো উপায় নেই, তাই এটাই করতে হবে। শাশুড়ি যাই বলুন বা করুন না কেন, গায়ে মাখবেন না, তবে স্বামী বা স্ত্রীকে অবশ্যই বুঝিয়ে দেবেন যে- তার মায়ের কাজটা ঠিক নয়। সন্তানদেরও কুচক্রী শাশুড়ি থেকে দূরে রাখুন। আমারসংবাদ/এসটিএমএ