বুধবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৪ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম ও রফিকুল ইসলাম

জানুয়ারি ২৫,২০২০, ১২:৪৫

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা দাবি ইশতেহারে

  • মেয়রদের এককভাবে পলিথিন উৎপাদন-বিপণন বন্ধ করতে হবে: ইকবাল হাবিব (নগর-পরিকল্পনাবিদ)
  • রাজধানীর খেলার মাঠগুলো উপযোগী করে খুলে দিতে হবে: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান (পরিবেশবিদ)
  • সিটিকে দুর্নীতিমুক্ত ও ট্যাক্স রেভিনিউ বাড়াতে হবে: বদিউল আলম মজুমদার (সুজন সম্পাদক)
  • জলাবদ্ধতা-যানজটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধান দিতে হবে: (আব্দুর রশীদ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক)
সিটি নির্বাচনের ইশতেহারে অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনার কথা না জানালে সেই ইশতেহার পূরণ করা সম্ভব হবে না বলে দাবি নগর-পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, অঞ্চলভিত্তিক সমস্যানির্ভর এবং তা সমাজের উদ্ভাবনী সমাধানের ওপর ভিত্তি করেই ইশতেহার ঘোষণা করতে হবে। যার যার এলাকায় প্রয়োজনভিত্তিক যে সমস্যা তা নিরসনে কী করবে, সেগুলো অঙ্গীকার করতে হবে। এ অঙ্গীকারগুলোই মানুষের কাছে এক ধরনের আস্থা ও বিশ্বাসের স্থান তৈরি করতে পারে। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররা এককভাবে পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধ করতে পারে শুধু এই সকল ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এবং বিভিন্নভাবে তাদের আর্থিক জরিমানা করতে হবে। জনস্বার্থে মেয়ররা এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। তাই এটি এবারের ইশতেহারে উল্লেখ থাকার দাবি জানানো হচ্ছে। এর ফলে জনসম্পৃক্ততা বাড়বে বলেও মনে করছেন তারা। নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশা নিয়ন্ত্রণ, ঢাকা শহরকে সবুজায়ন করা, ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা, ঢাকাকে প্লাস্টিক ও পলিথিন মুক্ত করা এবং ঢাকা থেকে খেলার মাঠগুলোর জনগণের খেলার উপযোগী করে এই সকল মাঠগুলোকে সাধারণ মানুষ যাতে ঢুকতে পারে সে জন্য খুলে দিতে দেয়ার ব্যবস্থার কথাও জানান বিশ্লেষকরা। তবে সমালোচনাও করেছেন অনেকে, যারা এখনই বিল্ডিংয়ে গানের বিকট শব্দ তৈরি করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখায় কষ্ট দিচ্ছেন তাদের দেখেশোনে যাতে ভোট দেয়া হয়। অন্যদিকে, ইশতেহারে সিটি কর্পোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করা, ট্যাক্স রেভিনিউ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। [caption id="attachment_158213" align="alignnone" width="300"] ইকবাল হাবিব-নগর-পরিকল্পনাবিদ[/caption] বিশিষ্ট নগর-পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘মানুষের নগর গড়তে হলে সাতটি বিষয় রয়েছে। যেগুলোতে গুরুত্ব দেয়া উচিত। কিন্তু আমার মনে হয় না, ঢালাওভাবে স্বাপ্নিক ও দর্শনভিত্তিক দাবি-দাওয়ায় জনগণের কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। দাবি-দাওয়াগুলো এবং তাদের প্রতিশ্রতিগুলো আশা উচিত অঞ্চলভিত্তিক, সমস্যানির্ভর এবং তা সমাধের উদ্ভাবনী ধারণার ওপর ভিত্তি করে।’ আমাদের সমস্যা হচ্ছে আবর্জনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাবনার অভাবে। এই বর্জ্য ব্যবস্থা কঠিন এবং তরল বিষয়ে তারা কী করবেন সে রকম উদ্ভাবনী অঙ্গীকার থাকতে পারে। সিটি কর্পোরেশনের হাতে ট্রেড লাইসেন্স এবং হোল্ডিং ট্যাক্স। পরিবেশ অধিদপ্তর কী করছে, এটি আমার জানার দরকার নেই। সিটি কর্পোরেশন এককভাবে পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধ করতে পারে। শুধু এই সকল ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এবং বিভিন্নভাবে তাদের আর্থিক জরিমানা করতে হবে। এর ফলে জনসম্পৃক্ততা বাড়বে জনগণের অঙ্গীকার বাড়বে।’ এই নগর-পরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, ‘অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া, জনসম্পৃক্ততা এবং সময়নির্ভর পরিকল্পনা ছাড়া কোনো অঙ্গীকার করেন এবং বড় বড় গলায় বলেন, মানবিক ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, স্বপ্নের ঢাকা, ঐতিহ্যের ঢাকা, জলবদ্ধ মুক্ত ঢাকা, তাহলে বুঝতে হবে; আপনি এক ধরনের প্রতারণা করছেন। আপনার জানতে হবে, তাদের আইনে ১৪টি স্থায়ী কমিটি প্রতি দুই বছরের জন্য তৈরি করতে হয়। এই স্থায়ী কমিটিগুলোর অঙ্গীকার হচ্ছে, মেয়রের নেতৃত্বে জনগণের স্বার্থে ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা পরিপূরণে এবং জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে তারা সকল সংস্থায় আমাদের হয়ে দালালি করবে। আমাদের হয়ে ওকালতি করবে, নেতা হবেন, সঞ্চালক হবেন এবং সকল সংগঠনকে জনআকাঙ্ক্ষা-জনদুর্ভোগ মোটানোর প্রয়োজন লবিস্ট হিসেবে কাজ করবেন। অঞ্চলভিত্তিক যার যার এলাকায় প্রয়োজনের ভিত্তিতে সমস্যা নিরসনে কী করতে হবে সেগুলো অঙ্গীকার করতে হবে। যে অঙ্গীকার মানুষের কাছে এক ধরনের আস্থা ও বিশ্বাসের স্থান তৈরি করতে পারে। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রবচন, শান্তির ঢাকা, স্বপ্নের ঢাকা, সুন্দর ঢাকাকে বলছে এটা যারা এরকম পলিথিন মোড়ানো পোস্টার লাগিয়েছে, যার ফলে পুরো আকাশ দেখা যায় না। কে বলছে এ ধরনের কথা। যাদের বিল্ডিংয়ে গানের বিকট শব্দের কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা পড়তে পারে না। এ ধরনের প্রার্থীকে কেন আমরা ভোট দেবো। দিলেই বা লাভটা কী হবে। এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশের জনগণের কিছুই হবে না। কারণ জনগণ না পারছে বলতে, না পারছে সইতে। এ ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যথাযথ জনপ্রতিনিধিত্বশীল নেতা তৈরি করাই বড় কঠিন। তারপরও আশা-প্রত্যাশা এবং প্রতিশ্রুতিগুলো যেন বাস্তবতায় অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা লাঘবে তৈরি হয়, সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। [caption id="attachment_158216" align="alignnone" width="300"] বদিউল আলম মজুমদার-সুজন সম্পাদক[/caption] সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘যে কাজগুলো প্রার্থীরা বাস্তবায়ন করতে পারবে। তাদের ইশতেহারে সেই অঙ্গীকারগুলোই করা উচিত। আর যে কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে না, সেগুলো অঙ্গীকার না করাই ভালো।’ জলাবদ্ধতা, যানযট দূরকরণ— এগুলো তাদের এখতিয়ারের বাইরে। ঢাকা শহরের এই সকল সমস্যা সমাধানের জন্য যে সকল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার এখতিয়ার তাদের নেই। যেগুলোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেগুলোর ওপর তাদের ইশতেহার হওয়া উচিত। যেমন সিটি কর্পোরেশন দুর্নীতিমুক্ত করা, ট্যাক্স রেভিনিউ বাড়ানো, সিটি কর্পোরেশন থেকে যে সেবাগুলো প্রদান করা হয়, সেই সকল বিষয়েই ইশতেহার ঘোষণা করতে হবে। সিটির প্রতিটি স্থান থেকে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করাই তাদের দায়িত্ব।’ [caption id="attachment_158215" align="alignnone" width="300"] সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান-পরিবেশবিদ[/caption] বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আমার সংবাদ বলেছেন, ‘নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশা নিয়ন্ত্রণ, ঢাকা শহরকে সবুজায়ন করা, ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করা, ঢাকাকে প্লাস্টিক ও পলিথিন মুক্ত করা এবং ঢাকা থেকে খেলার মাঠগুলো জনগণের খেলার উপযোগী করা। এই সকল মাঠকে মনোরম করার দরকার নেই, শুধু সাধারণ মানুষ যাতে ঢুকতে পারে; সে জন্য খুলে দিতে হবে। আজ তারা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা বাস্তবায়নের জন্য তারা ইশতেহার দেবে বলে মনে হয় না।’ তিনি বলেন, ‘আনিসুল হককে আমরা দেখেছি, তিনি যা বলেছেন, তা বাস্তবায়ন করেছেন, তারা এখনো ইশতেহার দেয়নি, ইশতেহার দিলে বুঝবো, কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, ইশতেহার বেশি ফুলেল হয়ে গেলে বুঝতে হবে ও কিছুই করবে না।’ [caption id="attachment_158219" align="alignnone" width="300"] আব্দুর রশীদ-নিরাপত্তা বিশ্লেষক[/caption] নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘নগরবাসীর সুবিধার জন্য নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা, যাজজটসহ যে সকল সমস্যা রয়েছে, সেই সকল সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্যই ইশতেহার ঘোষণা করতে হবে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বহির্বিশ্বে দেশের অনেক সুনাম রয়েছে, তাই নগরের সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদক সমস্যা দূর করতে অঙ্গীকার করতে হবে। নইলে দেশের বাইরে সুমান নষ্ট হবে। ঢাকা শহরের প্রতিটি অঞ্চলের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সময়োপযোগী ইশতেহার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার থাকতে হবে। আমারসংবাদ/এসটিএমএ