মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম

জানুয়ারি ২৬,২০২০, ০২:২১

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

ঢাকায় বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) লাগামহীন মোটরসাইকেলের লাইসেন্স দেয়ায় রাজধানীতে বেড়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এতে ২০১৯ সালে সারা দেশে এক হাজার ৯৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীসহ নিহত হয়েছেন ৬৪৮ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। তবে বিআরটিএর দাবি, একটি দেশের শহরে ২০ থেকে ২৫ ভাগ সড়ক থাকে, সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র ২ থেকে ৩ ভাগ সড়কের জায়গা। সড়কের জায়গা সংকটের কারণে দুর্ঘটনা সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার মতো জনবহুল, যানজট ও দুর্ঘটনাপ্রবণ শহরে মোটরসাইকেলের মতো দুই চাকার বাহন কোনোভাবেই উপযুক্ত নয়। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) কার্যকরী উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে বিআরটিএ মোটরসাইকেল নিবন্ধন দেয়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি লাগাম ছাড়া। খোদ বিআরটিএর হিসাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে শুধু রাজধানীতে দৈনিক গড়ে ২৭২টি নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধন পেয়েছে। মোটরসাইকেল নিবন্ধন বৃদ্ধির কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকির পাশাপাশি রাস্তায় বিশৃঙ্খলাও বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করা সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে দুই হাজার ৬২৬টি। একইভাবে ২০১৬ ও ১৭ সালে দুর্ঘটনা ঘটেছে যথাক্রমে দুই হাজার ৩১৬ ও তিন হাজার ৩৪৯টি। আর ২০১৮ সালে তিন হাজার ৬৭২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬ সালে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিলো সাত লাখ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ২২ লাখ। মোটরসাইকেল চালকদের একটা বড় অংশ কিশোর। তাদের বেপরোয়া চালাচলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। বিআরটিএর পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯৫৪টির বেশি। লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৭০৩ জন। সেই অনুসারে ১৪ লাখ ২৬ হাজার ২৫১ জন চালকের লাইসেন্স নেই। এরমধ্যে শুধু ঢাকাতেই চলাচল করছে প্রায় ছয় লাখ মোটরসাইকেল। গড়ে এ সময়ে ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন ২৭৩টি করে নতুন মোটরসাইকেল নেমেছে। নিসচার দাবি, লাইসেন্স ছাড়াই প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধভাবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে এসব অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকরা। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন আমার সংবাদকে বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটনসহ অন্যান্য মেট্রোপলিটন শহরে মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট পরিধানের সুঅভ্যাস গড়ে উঠেছে। কিন্তু জেলা ও গ্রাম-গঞ্জে হেলমেট না পরার প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকদের মোটরসাইকেল চালনায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে। তারপরও প্রশাসনের সামনে দিয়ে লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল ও অপ্রাপ্ত বয়সের কিশোররা মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। এছাড়াও দুয়ের অধিক আরোহী নেয়া, বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো ও চলন্ত অবস্থায় মোবাইলে কথা বলাই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এভাবে চলতে থাকলে কোনোভাবেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমানো যাবে না। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, মোটরসাইকেল বাহনটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাহন। চার চাকার সঙ্গে তুলনা করলে এটি ৩০ গুণ ঝুঁকিপূর্ণ।আর এজন্যই উন্নত বিশ্বে মোটরসাইকেলকে কখনো পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মোটরসাইকেলর বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতার কারণে বর্তমানে কেউ আর হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন না। ট্রাফিক আইনও মেনে চলছেন। এর মধ্যেও যখন কেউ ট্রাফিক আইন ভাঙার চেষ্টা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। বিআরটিএর এ কর্মকর্তা মোটরসাইকেল আরোহীরা ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন বা মানতে বাধ্য হচ্ছেন উল্লেখ করলেও সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বেশির ভাগ পয়েন্টেই আরোহীরা ট্রাফিক সিগন্যাল না মেনে ফাঁকফোকর দিয়ে চলছেন। এখনো ফুটপাত দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। চালকসহ পেছনে থাকা আরোহীদেরও হেলমেট পরতে দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় মোটরসাইকেলে বিভিন্ন কোম্পানি অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা শুরু করার পরই মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে ঢাকায় উবার, পাঠাও, ওভাই, স্যাম, চলো, ইজিয়ার, আমার বাইক, সহজ রাইডার্স, বাহন, আমার রাইড, ঢাকা রাইডার্স ঢাকা মটোসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারের সুবিধা দিচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সড়কে আমরা সব অবৈধ যান ও চালকদের বিষয়ে সচেতন। ট্রাফিক আইন অমান্য করলে কাউকে ছাড় দেয়া হয় না। মোটরসাইকেল এক সময় অনিয়ন্ত্রিত ছিলো, এখন সব চালক হেলমেট পরছেন, কাগজপত্রও ঠিক রাখছেন। তারপরও কোথাও ব্যত্যয় ঘটলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) এস এম মাহফুজুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ঢাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যাপারটি নীতিনির্ধারণীদের ওপর নির্ভর করছে। মোটসাইকেলের জন্য ঢাকায় আলাদা লেন করতে পারলে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে আসবে। একটি শহরে ২৫ শতাংশ জায়গা সড়কের জন্য নির্ধারিত থাকে কিন্তু সেখানে দুই-তিন শতাংশ জায়গা সড়কের জন্য রয়েছে। সেখানে সড়কের জায়গা বৃদ্ধি না করে যদি গাড়িকে নিরুসাৎহিত করি তাহলে জনগণের ভোগান্তি বাড়বে। ঢাকায় যাতায়াতে সহজ ট্রান্সপোর্ট থাকলে মানুষ মোটরসাইকেল চালাতে উৎসাহী হতো না। আমারসংবাদ/এসটিএমএ