সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

রাসেল মাহমুদ

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৩,২০২০, ০১:২১

মার্চ ০৩,২০২০, ০১:২১

বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষা কোচিং ও গাইডনির্ভরতা কমবে

দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের ‘টার্গেট’ করে গত কয়েক দশক ধরে কোচিং ও গাইডবই বিক্রির রমরমা বাণিজ্য চলে আসছে।

শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভাগীয় শহর এবং নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশপাশে শুরুতে এ ধরনের কোচিং ও গাইড বিক্রির প্রচলন শুরু হয়।

বর্তমানে জেলাপর্যায় ছাড়াও উপজেলা শহরে বিভিন্ন ধরনের ভর্তি-কোচিং গড়ে উঠেছে। একই সাথে চলছে ভর্তি-গাইড বিক্রি।

তবে এবার ভর্তিপরীক্ষার নামে কোচিং ও গাইড-বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তিপরীক্ষা হবে।

এতে ভর্তিচ্ছুদের কোচিং ও গাইডনির্ভরতা কমবে। ফলে এ ধরনের ব্যবসা বন্ধ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টারা। তবে ব্যবসায়ীরা নতুন কৌশলে ব্যবসা করবে বলেও ধারণা করছেন কেউ কেউ।

জানা গেছে, ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অর্থ, সময় আর ভোগান্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে চলা ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষা নিতে সম্মত হয়েছে।

গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিপরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কোচিং ও গাইডবই বাণিজ্যে প্রভাব পড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তিপরীক্ষা নেয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের খরচ এবং সময় সাশ্রয় করা। এক্ষেত্রে ভর্তি আবেদন ও যাতায়াতের বাইরে খরচের বড় একটি অংশ চলে যায় কোচিংয়ের পেছনে।

বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ভর্তিপরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে কোচিংয়ে ভর্তি হয়। কেউ কেউ একাধিক কোচিংয়েও ভর্তি হন। শিক্ষার্থীদের চাহিদা থাকায় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা আলাদা কোচিংও গড়ে উঠেছে। তবে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তিপরীক্ষা নেয়ার ফলে এ ধরনের বিশেষায়িত কোচিং, গাইডবই ও সাপ্লিমেন্ট বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে।

বিষয়টি নিয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, এ ধরনের কোচিংগুলো স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। কেননা নতুন পদ্ধতিতে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পরীক্ষা হবে।

এরপরও রাজধানীকেন্দ্রিক পরিচালিত কোচিংগুলো হয়তো তাদের ব্যবসা চালিয়ে নেবে। তবে আমি মনে করি, সরকার একটু কঠোর হলে সব ধরনের কোচিং-বাণিজ্যই বন্ধ করা সম্ভব।

দেশের কৃষিভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা মূলত মেডিকেল কোচিংয়ে ভর্তিপরীক্ষার জন্য কোচিং করে থাকেন।

তবে বাকৃবির ভর্তিপরীক্ষার দেড় থেকে দুমাস আগে ময়মনসিংহে ১০ থেকে ১৫টি কোচিং সেন্টার শুধু বাকৃবিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য কোচিংয়ের ব্যবস্থা করে।

এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে— সোনালিকা, নেটওয়ার্ক, অ্যাডমিশন প্লাস, এগ্রি ভার্সিটি প্লাস। গত বছর থেকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তিপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় বাজারে এ সংক্রান্ত গাইড ও সাপ্লিমেন্ট দেখা গেছে।

একইভাবে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ভর্তিপরীক্ষা কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকটি কোচিং কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে রেডিয়াম ও কম্পাস।

এছাড়া শিউর সাস্ট, সাস্ট কিউ, সাসটেক ও সাস্ট সিক্সারসহ বেশ কটি গাইডবই বিক্রি হয় শাবিপ্রবি ভর্তিপরীক্ষার জন্য। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বেশ কয়েক বছর ধরেই সাকসেস নামের একটি কোচিং সেন্টার চালু রয়েছে।

এই প্রতিষ্ঠানটির কুষ্টিয়া শহর এবং ক্যাম্পাস এলাকা ছাড়াও ঝিনাইদহ শহরে শাখা ছিলো। বর্তমানে ক্যাম্পাস পার্শ্ববর্তী একটি শাখায় কার্যক্রম চলছে। কোচিং সেন্টারটির নামে গাইডও রয়েছে।

অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্যও রয়েছে নানা ধরনের কোচিং ও গাইড। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ভর্তিপরীক্ষাকে কেন্দ্র করে তিনটি কোচিং রয়েছে।

এগুলো হলো— ভারটেক্স, কর্নিয়া ও স্কুল বেল। নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত কোচিং সেন্টার ভারটেক্স। কোচিংয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসা তিন ইউনিটের জন্য তিনটি গাইডও বের করে ভারটেক্স।

তবে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কোচিং ও গাইডবই কার্যক্রম বন্ধ করবে ভারটেক্স। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের গত কয়েক বছরের প্রশ্নপত্রের সংকলন করে বিশেষ প্রশ্নব্যাংক বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে ভারটেক্স পরিচালকের।

কোচিং সেন্টারটির পরিচালক জানান, গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষার নেয়ায় শিক্ষার্থীদের ঝোঁক থাকবে রাজধানীকেন্দ্রিক কোচিংগুলোর দিকে। এতে বিশেষ করে ছাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কারণ পরিবার সবসময় ছাত্রীদের স্থানীয় কোচিংগুলোতে পড়াতে চায়। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যও রয়েছে কোচিংয়ের ব্যবস্থা।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন এক শিক্ষার্থী দিনাজুপরে লজিক নামের একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করে। কোচিংয়ের নামে একটি গাইডবইও বাজারে ছেড়েছেন তিনি। এর বাইরে আরও কয়েকটি গাইডবইও বাজারে পাওয়া যায়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষায়িত কোচিং সেন্টার অ্যাডভাইস। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই কোচিং সেন্টারে পড়েছেন অনেকেই।

এছাড়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য রয়েছে গাইড ও সাপ্লিমেন্ট বাণিজ্য। এরমধ্যে ময়নামতি ও অ্যাডভাইস গাইড বেশি বিক্রি হয়।

এছাড়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের জন্য রাজধানীর নীলক্ষেতে বিভিন্ন নামী-বেনামী প্রতিষ্ঠানের গাইড ও সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হয়।

এদিকে, নতুন পদ্ধতির ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় রয়েছে বড় কোচিংগুলোও। এইচএসসি পরীক্ষার বাকি মাত্র দেড় মাস। পরীক্ষার পরপরই ক্লাস শুরু করবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংগুলো। অনেক কোচিং আবার এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেও শিক্ষার্থী ভর্তি করান।

যদিও এখন পর্যন্ত আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রশ্নের ধরন বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এজন্য গাইডবই, লেকচার শিট প্রণয়ন নিয়ে বেশ দ্বিধায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি কোচিংয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, দুয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষা নেবে। শিক্ষার্থীদের চাহিদার বড় জায়গায় থাকবে গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষা। যদিও এখন পর্যন্ত ভর্তিপরীক্ষার ধরন ও প্রশ্নপত্র বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আসেনি।

তাই সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমাদের পরিকল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছে। হাতে বেশি সময়ও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের জন্য কোচিং করতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা হবে না। তবে নতুন পদ্ধতির পরীক্ষায় কোচিংয়ের জন্য খুব বেশি সময় পাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কোচিং সেন্টারের সাথে দীর্ঘদিন জড়িত রয়েছেন এমন একজন জানিয়েছেন, গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষার রূপরেখার আলোকে আমরা কোচিংয়ের বিষয়টি ভাববো।

এ বছর হয়তো বেশি সময় পাবো না, তবে সামনের বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি সহায়তায় আমরা সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারবো।কোচিং পরিচালনাকে বাণিজ্য বলতে নারাজ কোচিং সেন্টারগুলো।

তারা বলছে, কোচিং সব সময় সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। ভর্তিপরীক্ষায় অংশ নিতে আমরা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ মেধাবীরা এখানে ক্লাস নেয়। বাণিজ্য নয় বরং শিক্ষা বিস্তারে আমরা কাজ করছি।

গুচ্ছ ভর্তির বিষয়ে এর আগে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, গুচ্ছ ভর্তিপরীক্ষা নেয়ার লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের খরচ ও হয়রানি কমিয়ে আনা।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ