সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

রফিকুল ইসলাম

মার্চ ০৩,২০২০, ০১:৪৯

মার্চ ০৩,২০২০, ০১:৪৯

বলয়ের রাজনীতিতে অস্থির তৃণমূল আ.লীগ

আস্থা সাবেক সাংসদেই

  • ভাই লীগ. এমপি লীগে ঠাসা তৃণমূল
  • সুবিধাবঞ্চিত ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা
  • সক্রিয় হচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্যরা
  • অভিমান নিয়েও কাছে ভিড়ছেন কর্মীরা

দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর পাত্তাই পাননি স্থানীয় রাজনীতিতে। রাগে-ক্ষোভে নির্বাচনি এলাকা ছেড়ে ছিলেন কেউ কেউ। সাংসদ থাকা অবস্থায় কর্মীদের অবমূল্যায়ন করায় তারাও সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছিলেন সাবেক সাংসদদের।

কিন্তু ওইসব আসনের বর্তমান এমপিদের বলয়ভিত্তিক রাজনীতির কারণে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভুগছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ত্যাগী, পরিশ্রমী ও পদবঞ্চিত নেতারা। তৈরি হয়েছে এমপি লীগ, ভাই লীগ।

দলীয় সাংসদদের এমন অবস্থানে বদলাতে শুরু করেছে স্থানীয় রাজনীতির চিত্র। নানা অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে দূরে সরে গেলেও সাবেক সাংসদদের কাছে ভিড়তে শুরু করেছেন তৃণমূলের ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতারা।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে প্রকাশ্য অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কোন্দলে জড়িত থাকায় গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হন সাবেক সাংসদ আবুল কালাম আজাদ।

সে সময় তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলেন তার নিজ বলয়ের নেতাকর্মীরা। রাজনীতির মাঠে তার সাথে দূরত্বও তৈরি করেন তারা। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক চিত্র ভিন্ন।

দীর্ঘ এক বছর অভিমানে দূরে সরে থাকলেও তার কাছে ভিড়তে শুরু করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীরা। মূলত ওই আসনের বর্তমান সাংসদ শহীদুল ইসলাম বকুলের বিরুদ্ধে আরও ভয়ঙ্কর অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজ বলয় ভারী করতে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সাথে যুক্ত হয়ে রাজনীতি করছেন।

বাগাতিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার রহমান আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের আসনের বর্তমান এমপির সাথে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী নেই। তিনি শুধু বিএনপি-জামায়াতপন্থি নেতাদের নিয়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

তিনি আরও বলেন, যার বাবা বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন তাকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়া ঠিক হয়নি। এটা আমাদের জন্য লজ্জার।

সিরাজগঞ্জ-৩ (তাড়াশ-রায়গঞ্জ) আসনের সাবেক সাংসদ গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বলয়ের রাজনীতি এবং দলীয় পদপদবিতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বসানোর অভিযোগে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হন তিনি। সাবেক এই সাংসদ মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর পাত্তাই পাননি স্থানীয় রাজনীতিতে।

তাকে বাদ দিয়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সাবেক সাংসদ হলেও রয়েছেন পেছনের সারিতে।

কিন্তু গত পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনের পর থেকে তিনটি বলয়ে চলছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতি। তাই পাল্টাতে শুরু করেছে সাবেক সাংসদের রাজনীতির চিত্র। ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতাদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছেন তিনি।

সাবেক সাংসদ গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন আমার সংবাদকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে দলকে শক্তিশালী করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছি। দলের জন্য দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছি। কিন্তু আজ দলীয় কোনো অনুষ্ঠানে আমাকে রাখা হয় না। এটা খুব দুঃখজনক।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান কোনো রাজনীতি নেই। ত্যাগী ও পরিশ্রমীদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদীরা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। দীর্ঘদিন ধরেই দুই গ্রুপে দ্বন্দ্ব চলছে মৌলভীবাজার-৩ আসনের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে।

দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হন সাবেক সাংসদ সৈয়দা সায়রা মহসিন। সেখানে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন নেছার আহমদ। সায়রা মহসিন দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন স্থানীয় রাজনীতিতে।

বিভিন্ন সময় তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অভিমান থাকলেও কাছে ভিড়তে শুরু করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীরা। শুধু এসব সাংসদীয় আসন নয়, গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব সংসদ সদস্য দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছিলেন তাদের সবাইর বিরুদ্ধেই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ছিলো।

তারা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়েছেন পুরো নির্বাচনি এলাকায়। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। সাবেক এই সাংসদদের এমন কর্মকাণ্ডে কপাল পুড়ে তাদের।

সাবেক এমপিদের বিরুদ্ধে ওঠা ওই অভিযোগ এখন বর্তমান অনেক এমপির বিরুদ্ধেও। ফলে দীর্ঘদিন অভিমান করে দূরে থাকলেও সাবেক এমপিদের ওপর আস্থা রাখছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

সূত্রমতে, পুরো নির্বাচনি এলাকার ত্রাণকর্তা স্থানীয় সাংসদ। দল কিংবা সরকার একক আধিপত্য দেখান তারা। শুধু সাংসদ নয়, সাংসদপন্থি নেতা ও পরিবারের সদস্যরাও দেখান ক্ষমতার দাপট। নিজ নিজ বলয় ভারী করতে বিএনপি-জামায়াতের লোকদের সংগঠনের শীর্ষ পদে বসিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘এমপি লীগ’, ‘ভাই লীগ’।

স্থানীয় সাংসদদের এমন কার্যক্রমে দলীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন তৃণমূলপর্যায়ের ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত জাতীয় নির্বাচনে বেশকিছু স্থানীয় সাংসদকে দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করলেও বর্তমান সাংসদদের মাঝেও সে প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

এদিকে অনেক আগে থেকেই দল ও সরকারকে আলাদা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সভানেত্রীর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত হন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হকসহ বেশকিছু কেন্দ্রীয় নেতা।

আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতারা দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হলেও সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে। দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির ব্যস্ততার মাঝেও প্রোগ্রাম করছেন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায়। আবার মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে কেউ কেউ ছেড়ে ছিলেন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকা।

দীর্ঘদিন স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে দেখাও করেননি। তবে সব অভিমান ভুলে তারাও এখন স্থানীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক আমার সংবাদকে বলেন, প্রায় প্রতিদিন আমার নির্বাচনি এলাকার নেতাকর্মীদের সাথে কথা হয়। বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে খোঁজখবর নেই। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে আমার নিবিড় সম্পর্ক আছে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ