সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

সোহেল মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৩,২০২০, ০১:৫৩

মার্চ ০৩,২০২০, ০১:৫৩

চট্টগ্রাম কারাগারে চারগুণ বন্দি

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাবন্দির ধারণক্ষমতা এক হাজার ৮৫৩ জন হলেও বন্দি রয়েছেন সাত হাজারের অধিক। যা ধারণক্ষমতার চারগুণ বেশি।

জেলকোড অনুযায়ী প্রতি বন্দির জন্য ৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬ ফুট প্রস্থের জায়গা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও একজন বন্দির স্থলে থাকতে হচ্ছে চার থেকে পাঁচজনকে।

জায়গার সংকটে অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। সকালের খাবার দুপুরে আর দুপুরের খাবার পাচ্ছেন বিকেলে। গাদাগাদি থাকতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কারা অভ্যন্তরে ১০০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন। যার ফলে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না বন্দিরা।

আগামী ২৯ মার্চ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। চট্টগ্রামের বিভক্ত রাজনীতি ঐক্যবদ্ধ না হলে ভয়াবহ সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। আর এই নির্বাচনি সহিংসতায় কারাগারে বন্দির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

কারাগারে বর্তমানে বন্দিরা রয়েছেন দুর্বিষহ অবস্থায়। বন্দি বৃদ্ধি পেলে কারাগারের বন্দিদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারা সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর ১৬টি থানা এবং জেলার বিভিন্ন মামলার আসামি ও সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের রাখা হয় এই কারাগারে। বর্তমানে কারাগারে বন্দি আছেন সাত হাজার ৪৩২ জন। এর মধ্যে রয়েছেন ৩১৪ জন নারী ও সাত হাজার ১১৮ জন পুরুষ।

তাছাড়া প্রতিদিনই বিভিন্ন মামলার আসামি আসছে এই কারাগারে। বন্দিদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন ৮৬২ জন, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত রয়েছেন ৫৭ জন।

এর মধ্যে নারী বন্দি রয়েছেন দুই জন। হুজি, জেএমবি, নব্য জেএমবি, আল্লাহর দল, হিযবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম, হামজা ব্রিগেডসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী ও অর্ধশতাধিক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ১০-১৫ জন দুর্ধর্ষ জঙ্গি। চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে (১ মার্চ) কয়েকজন কারাবন্দির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারাগারে বন্দিরা পদে পদে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

অতিরিক্ত বন্দির কারণে খাওয়া-থাকায় খুব কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। একজন বন্দির স্থলে থাকতে হচ্ছে চার থেকে পাঁচজনকে। জায়গার সংকটে অনেকেই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। সকালের খাবার দুপুরে আর দুপুরের খাবার দিচ্ছে বিকেলে।

তাছাড়া যে খাবার দেয়া হয় তার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। অনেক সচ্ছল বন্দি এ খাবার খেতে না পেরে ক্যান্টিন থেকে বেশি দামে কিনে খাচ্ছেন। কারা ক্যান্টিনে বাইরের চেয়ে প্রত্যেক জিনিসপত্রের দাম দুই থেকে তিনগুণ বেশি।

এর বাইরে কিছু প্রভাবশালী বন্দির দাপটে তটস্থ থাকেন কারাগারের নিরীহ বন্দিরা। সে সঙ্গে কারাগারের ভেতর আছে বন্দিবাণিজ্য এবং বাইরে আছে সাক্ষাৎবাণিজ্য। অতিরিক্ত বন্দির চাপে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কারা অভ্যন্তরে ১০০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন।

যার ফলে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবাও পাচ্ছেন না বন্দিরা। অনেককেই চমেক হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সঠিকভাবে খাবার না পাওয়ায় বন্দিরা ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কারারক্ষীদের ফোন দিয়ে স্বজনদের কাছে ফোন করে বিকাশের মাধ্যমে টাকা নেয় বন্দিরা।

এ প্রসঙ্গে সিনিয়র জেল সুপার মো. কামাল হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, কোনো একসময় এই কারাগারে ১০ হাজার ৯৮৩ জন বন্দি ছিলো।

তারপরও সুশৃঙ্খলভাবে বন্দিদের রাখতে সক্ষম হয়েছি। বর্তমানে বন্দি রয়েছে সাত হাজার ৪৩২ জন, বন্দিদের রাখতে কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে না। কঠোর নজরদারিতে থাকে প্রতিটি বন্দি। বিশেষ করে জঙ্গি, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, দাগি অপরাধীদের চোখে চোখে রাখা হয়।

নির্বাচনি সহিংসতায় বন্দি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা সে বিষয়ে আপনাদের দিক থেকে বন্দিদের রাখার জন্য কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১০ হাজার ৯৮৩ বন্দি সুশৃঙ্খলভাবে রাখতে সক্ষম হয়েছি তার চেয়ে বেশি হলেও সুশৃঙ্খলভাবে রাখতে পারবো বলে আশাবাদী।

তিনি বলেন, কারাগারে যে পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে তারমধ্যে শতকরা ৮০-৯০ শতাংশ হয়েছে গত এগারো বছরে।
সরকার নতুন নতুন ভবন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করা হলে সমস্যা থাকবে না।

বন্দিদের বিনোদনের জন্য টেলিভিশন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে। কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। সবাইকে ভালোভাবে রাখার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

এখানে বন্দিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাদের তৈরি করা পণ্য বিক্রি করে অর্ধেক মুনাফা তাদের দেয়া হয়। তাদের আনন্দে রাখার সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তিন স্লিপ পদ্ধতি চালু রয়েছে।

স্লিপের একটি অংশ বন্দির কাছে, একটি অংশ স্বজনদের কাছে এবং আরেকটি অংশ কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে। কোনো ধরনের ফি ছাড়াই সাক্ষাৎ করা যায় বলে জানান তিনি।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ