সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

মাহমুদুল হাসান

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৪,২০২০, ১২:৫৪

মার্চ ০৪,২০২০, ১২:৫৪

ভারতেও ৫ করোনা রোগী শনাক্ত

বাংলাদেশে বাড়ছে আতঙ্ক

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) বিশ্বজুড়ে এক নয়া আতঙ্ক! ইতোমধ্যে অন্তত ষাটের অধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে বেড়েছে দেশে দেশে যোগাযোগ। ফলে ঝুঁকিও বেড়েছে কয়েকগুণ।

এসব দিক বিবেচনা করে সংক্রমিত হয়নি এমন দেশগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করছে।

দেশে এখনো কোনো করোনা ভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়নি। এদিক থেকে দেশ এখনো নিরাপদ রয়েছে। তবে ভীতি বেড়েছে সম্প্রতি ভারতেও করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার ফলে। ভারতীয় একটি ইংরেজি গণমাধ্যমের তথ্যমতে সেখানে নতুন করে দুইজন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

এর আগে আরো তিনজন করোনা আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হলেও তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ইতোমধ্যে উহান থেকে ভারতে পৌঁছে তেইশ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে ঐ ফ্লাইটের অন্য ভারতীয় যাত্রীরাও কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।

এমন আতঙ্কগ্রস্ত পরিস্থিতিতে জানা গেছে, দেশে নতুন করে পাঁচজনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফিরেছেন।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, আপতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশও নিরাপদ নয়। তাই নিজেদের দুর্বলতাগুলো শুধরে নিয়ে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় একটি ঐক্যবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

নয়তো করোনা ভাইরাস একবার দেশে প্রবেশ করলে এর হাত থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। সংকট তৈরি হবার আগেই তাই নিজেদের পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুত করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, করোনা কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও করণীয় পরিকল্পনা নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে।

সেখানে বিভিন্ন কর্মপন্থা ঠিক করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের করোনা মোকাবিকলায় প্রস্তুত করতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালকে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরাও এ প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছে।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন হোটেলে আসা অতিথিদের সম্পর্কে তথ্য দিতে হোটেলগুলোকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তবে স্পষ্ট করে এও বলা হয়েছে— যারা আসছেন, তারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এমন নয়, সুতরাং আমরা যেন তাদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ না করি, যাতে তারা হেনস্তার শিকার হন।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে এখন দুইজন প্রবাসী বাংলাদেশি ভর্তি আছেন। তারমধ্যে আইসিইউতে থাকা একজনের অবস্থা আগের চেয়ে একটু উন্নতি হয়েছে। এর আগে আরও তিনজন বাংলাদেশি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

আরব আমিরাত ছাড়া অন্য কোনো দেশে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি আক্রান্ত হননি। অপর দিকে উহান থেকে আসা ২৩ বাংলাদেশি দিল্লি শহর থেকে ৪০ মাইল দূরে অন্য ভারতীয়দের কোয়ারেন্টিনে আছেন।

সেইসাথে এখন পর্যন্ত দেশের সন্দেহজনক ৯৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে কারো শরীরে এই রোগের জীবাণু পাওয়া যায়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, প্রতিবেশীদের (ভারত) মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। এটা তো উদ্বেগের বিষয়। তবে তার আগে দেখতে হবে আমাদের স্বাস্থ্য খাত কতটা প্রস্তুত।

শুনেছি বিমানবন্দরের থার্মাল স্ক্যানারের একটা ছাড়া সব নষ্ট। এমন প্রস্তুতি যদি আমাদের করোনা মোকাবিলায় থাকে তাহলে বড় দুর্গতি রয়েছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। সেই হিসেবে তো কিছুটা ঝুঁকি রয়েছেই।

তবে ভারতে করোনা শনাক্ত হওয়ায় আতঙ্কিত হবার মতো কিছু নয়। আমরা এখনো নিরাপদ আছি। আমাদের দেশে কোনো করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়নি। তবে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় ভারতে যারা করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছেন তারা কিন্তু দেশে একে অন্যের দ্বারা ছড়ায়নি। তারা দেশের বাইরে থেকে আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরেছে। তাই ভারতের চেয়ে আমাদের প্রবাসীদের বিষয় বেশি ভাবতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, শুধু ভারতের পরিস্থিতি নয়, সামগ্রিকভাবে বিশ্বজুড়ে এখন করোনা ছড়িয়ে পড়ছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার একবারে ঝুঁকিমুক্ত সে কথা বলার উপায় নেই। তবে আমরা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রস্তুত।

মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে করোনা ভাইরাস নিয়ে। সবার পরামর্শের আলোকে এখন তিনটা কমিটি করা হয়েছে। রাজধানীতে এ কমিটি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় কাজ করবে।

জেলায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধায়নে তিন স্তরের এ কমিটি কাজ করবে। দেশের চিকিৎসকদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ঝুঁকি মোকাবিলায় নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে প্রচারণা চালাচ্ছি।

সেই সাথে কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে পড়ে তার চিকিৎসার জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতাল, সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোকে করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিয়মিত স্ক্যানিং করে মানুষ দেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে।

কারো শরীরে কোনো অস্বাভাবিক তাপমাত্রা দেখা দিলে তাকে সাথে সাথে কোয়ারেন্টাইনে রাখার নির্দেশনা দেয়া আছে।

এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে একটি করোনা মোকাবিলায় গাইড লাইনও তৈরি করা হয়েছে। স্ক্যানার মেশিন নষ্ট হলেও সারা দেশের সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দরে হ্যান্ড স্ক্যানার মেশিন দিয়ে স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। আরও পাঁচটি নতুন স্ক্যানার মেশিন শিগগিইর আনা হবে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, দেশে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আমাদের কাছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফোন আসে।

সেখান থেকে পাঁচজনকে অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। যখনই আমরা রোগী সন্দেহ করি বা যখনই আমাদের কাছে ফোন কল আসে, তার মধ্যে উপসর্গ আছে, আমরা বিলম্ব না করে তাকে আগে হাসপাতালে পাঠাই। নমুনা সংগ্রহ করে, পরীক্ষা করে, তারপর তাদের ছাড়ি।

আমারসংবাদ/এমএআই