সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৪,২০২০, ০১:৫২

মার্চ ০৪,২০২০, ০১:৫২

রমজানের আগে সক্রিয় সিন্ডিকেট

দাম বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের

প্রতি বছর রমজানের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াতে সক্রিয় হয়ে উঠে সিন্ডিকেট। এবারো তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না।

রমজান সামনে রেখে ইতোমধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে চিনিসহ বিভিন্ন পণ্যের সিন্ডিকেট গ্রুপ। রমজান আসার আগেই ঢাকাসহ সারা দেশে নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেটের দখলে চলে যাচ্ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রোজা সামনে রেখে বিভিন্ন সিন্ডিকেট গ্রুপ ও আড়তদাররা চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ করতে শুরু করেছে।

এতে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এতে চিনিসহ বেশকিছু পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। রমজানের আগে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গ্রুপ সক্রিয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দাবি বাজার বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ ভোক্তাদের।

খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। কোথাও আবার ৬৫ টাকা কেজি দরেও চিনি বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির তথ্যানুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিনির দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ। বছরের হিসাবে প্রতি কেজি চিনিতে দাম বেড়েছে ২৮ শতাংশের বেশি।

সূত্র জানায়, বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই সারা দেশের বাজারে ডাল, ছোলা ও চিনির দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডালের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ, ছোলার দাম প্রায় ১৪ শতাংশ ও চিনির দাম ৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন রমজানের আগে দাম বাড়বে না। তবে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি।

রমজান উপলক্ষে বিপুল পরিমাণে মজুদ রয়েছে এবং দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই বলে সরকারকে আশ্বস্ত করেছিল ব্যবসায়ীরা।

তবে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর থেকেই লাগামহীনভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে চলছে এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াতে পারে এমন পূর্বাভাস দিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রমজান মাস ঘিরে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সক্রিয় হবে এমন আগাম সতর্কবার্তা দেয়ার পরও বেপরোয়া অসাধু চক্রটি।

সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, চিনি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের গুদামজাত পরিস্থিতি ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে তদারকি না করলে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরি করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উৎপাদন কমিয়ে সংকট সৃষ্টি এবং অনৈতিক মুনাফা লাভের চেষ্টা করবেন।

বাস্তবেও এখন তা ঘটতে দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে পাঁচ টাকা পর্যন্ত।

ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আজিজুর রহমান বলেন, ‘সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা সব সময়ই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তারা জানে যে, যতই মুনাফা করুক সরকার তাদের কিছুই করতে পারবে না। তাই তারা অতি মুনাফা করে থাকে।’

তিনি বলেন, পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও আমরা এমন দেখেছি। এত যে দাম বাড়ানো হলো, কারা সিন্ডিকেট করলো, কে অতি মুনাফা করলো, কাউকেই তো ধরা হলো না। অপরাধ করলে, শাস্তি না হলে তো এমন অবস্থা চলতেই থাকবে।

তিনি আরও বলেন, যারা বলছে যে তাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুদ আছে, সরকারের উচিত তা সরেজমিন দেখা। প্রত্যেকের গুদামে হানা দেয়া। তারা সত্য বলছে কি না যাচাই করা উচিত।

পরে দেখা যাবে, বলবে মজুদ নেই। ততক্ষণে হাতিয়ে নেবে বিপুল অঙ্কের টাকা। সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর উচিত এখনই এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা ওত পেতে থাকে, সুযোগ পেলেই বাজার অস্থির করে তুলছে। তারা রমজান মাসকে ঘিরে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, এর আগেও ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে মুনাফা লুটেছে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ দুরূহ হয়ে পড়তে পারে। ট্যারিফ কমিশন সূত্র জানায়, দেশের রিফাইনারিগুলোর চিনি উৎপাদনক্ষমতা সাড়ে ২৮ লাখ টন।

আর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের (বিএসএফআইসি) উৎপাদনক্ষমতা দুই লাখ ১৪ হাজার টন। সব মিলিয়ে চিনির উৎপাদন প্রায় ৩১ লাখ টন।

বিপরীতে বাংলাদেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা সাড়ে ১৭ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদনক্ষমতার ৬০ শতাংশ ব্যবহার করলেই চিনির চাহিদা পূরণ সম্ভব।

সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিনি উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএসএফআইসি জানায়, তাদের কাছে উৎপাদিত চিনির মজুদ আছে ৫৩ হাজার টন। মৌসুম শেষে আরও ৯০ হাজার টন চিনি মজুদ হবে।

এর বাইরে সংস্থাটি এক লাখ টন চিনি আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। এসব চিনি সময়মতো চলে আসবে।

বৈঠকে বিএসএফআইসির প্রতিনিধি জানান, আসন্ন রমজানে চিনির চাহিদা তিন লাখ টন। গেলো জানুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি রিফাইনারিগুলো ১০ লাখ ৭৯ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করেছে।

তাই সার্বিক বিবেচনায় রমজানে চিনি সংকটের কোনো কারণই নেই। বৈঠকে দেশের অন্যতম শীর্ষ চিনি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের প্রতিনিধি জানান, তাদের কাছে এক লাখ ২০ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি রয়েছে।

আরও ৯১ হাজার টন বন্দরে রয়েছে খালাসের অপেক্ষায়। মেঘনা গ্রুপের প্রতিনিধি জানান, তাদের কাছেও এক লাখ টন অপরিশোধিত চিনি আছে।

আরও আড়াই লাখ টন চিনি খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে বন্দরে। সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেশি। আমদানিতেও উচ্চ কর। সব সমন্বয় করতে দাম কিছুটা বেড়েছে। রোজার কারণে নয়, বিশ্ববাজারে দাম বাড়তির কারণে দাম কিছুটা বেড়েছে।

বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো বলেন, রমজান মাস ঘিরে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রতিটি মিলে পর্যাপ্ত চাপ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেশি থাকায় দেশীয় বাজারেও প্রভাব পড়ছে। আমদানির ক্ষেত্রেও রয়েছে উচ্চ কর। এতে কম দামে চিনি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

আমারসংবাদ/এমএআই