সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

আবদুর রহিম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৫,২০২০, ১২:৪২

মার্চ ০৫,২০২০, ১২:৪৪

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী

মেহমানের টেবিলে রাজনৈতিক হিসাব

  •  জামায়াত স্টাইলে ভারতবিরোধী বক্তব্যে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বিএনপি

মহানায়কের জন্মশতবার্ষিকীতে ঢাকায় আসছেন বিশ্বনেতারা। সফরে বিশেষ মেহমান থাকছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাসের পর সর্বপ্রথম তিনি বড় অতিথি হয়ে আসছেন।

সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও। মেহমানের টেবিলে আসতে পারে রাজনীতির বড় হিসাব। বাংলাদেশের হিন্দু সমপ্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ থাকতে পারে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ১০-১৫ জন হিন্দু নেতার সঙ্গে হতে পারে মোদির বিশেষ আলাপন।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মমতার সঙ্গে তিস্তা নিয়ে হতে পারে একান্ত বৈঠক। বিজয়ের এই শুভক্ষণে আশ্বাসের সবুজ সংকেত বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছে এমনই গুঞ্জন বিশেষ মহলে।

তবে এই সফর ও ইতিহাসের সাক্ষীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বড় লাভবানের সম্ভাবনা থাকলেও একসময়ে বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেয়া বিএনপি বড় আকারে রাজনৈতিকভাবে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে যাচ্ছে।

মোদির সফর ঘিরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের জামায়াত স্টাইলে ভারতবিরোধী বক্তব্যের কারণে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সব মিলিয়ে মোদির এই সফর রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হবে এমনই ভাষ্য সংশ্লিষ্ট মহলের।

জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রধান অতিথি করে কয়েক মাস আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বাংলাদেশের তরফ থেকে। মোদিও আসবেন বলে আশ্বাস দেন। এর পরই মোদির সফরের সার্বিক বিষয় চূড়ান্ত করতে দুদিন আগে বাংলাদেশ সফরে আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা।

সব কিছু ঠিক থাকলে ১৬ মার্চ ঢাকায় আসবেন তিনি। ১৭ মার্চ মুজিববর্ষ উদ্বোধন করবেন। তিন দিন তিনি ঢাকায় অবস্থান করবেন। তার এই সফরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়া হবে বলে সমপ্রতি জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র অংশীদার ভারত। তার এই সফর ঘিরে থাকবে বিশেষ আকর্ষণ।

এছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীসহ আরো বিশ্ব নেতারাও থাকবেন। মোদির এই সফরে বাংলাদেশের রাজনীতির হিসাবটা বড় আকারে থাকবে।

বিশেষ করে হিন্দু সমপ্রদায়ের সঙ্গে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আলাপন, তিস্তাসহ একাধিক ইস্যুতে মমতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বৈঠক।

কারাগারে থাকা খালেদা জিয়া ইস্যুতে কোনো আলাপ হচ্ছে না— এ বিষয়টি আগ থেকেই ইঙ্গিতের পর বিএনপির বিষয়টিও রাজনীতিপাড়ায় বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে।

কেননা, এর আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভারতের বিরোধিতা করে এখন প্রায় দলটি বিলীনের পথে। ফাঁসি হয়ে হয়েছে শীর্ষ নেতাদের।

এখন ফের জামায়াত স্টাইলে ভারতবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ দলটির অবস্থাও যে খারাপ হতে পারে এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে রাজনৈতিকমহল।

এ দিকে মোদির সফর ঘিরে বাংলাদেশের হিন্দু নেতাদের মধ্যে নয়া আশা জেগেছে। বাংলাদেশের হিন্দু নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করতে চান। সমপ্রতি বাংলাদেশে আসেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এক নেতা।

এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু সমপ্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা হয় তার। বেশ কয়েকটি জেলার হিন্দু নেতারা ঢাকা এসে বৈঠক করেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ওই নেতাকে বাংলাদেশের হিন্দু সমপ্রদায়ের নেতারা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। বাংলাদেশের হিন্দুরা যাতে সুরক্ষা পায়, তার জন্য মোদি যাতে বাংলাদেশের প্রধানন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষভাবে কথা বলেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশে এসেছিলেন বনগাঁর বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর। তার কাছে বাংলাদেশের নেতারা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আবদার করেন, আর তিনিও আশ্বাস দেন। তাই আগামী ১৭ মার্চ মোদির বাংলাদেশ সফরকারী দলে থাকছেন শান্তনু ঠাকুরও।

এ বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত আমার সংবাদকে বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে হিন্দু সমপ্রদায়ের কোনো পূর্বনির্ধারিত বৈঠকের বিষয় রয়েছে কি-না, এখনো পর্যন্ত আমরা জানি না। তবে তিনি ঢাকায় এলেই ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আসেন।

এর আগেও যখন ২০১৫ সালের ৭ জুন এসেছিলেন তখন তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আরতি দিয়ে পূজা-অর্চনা করেছেন। তখন আমিও ছিলাম। এবারো তিনি মন্দিরে আসবেন এমনটাই জানি।

তবে তিনি যখন আসেন তখন শুধু ১০-১৫ জনকে থাকতে দেয়া হয়। তখন হয়তো আমিও থাকতে পারি। ওই সময়ে এই ১০-১৫ জনের সঙ্গে হয়তো একটু কথা বিনিময় হতে পারে। আলাপ হতে পারে।

তবে নাগরিকত্ব আইনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তার বিষয়টি ছাড়াও এ সফরের সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বিএনপির গুরুত্বহীন হওয়ার বিষয়টি বড় আকারে নজরে আসছে।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এবং ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে বিএনপির তিন নেতার সঙ্গে গত মঙ্গলবার সকাল ১০টায় প্যানপ্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ে বৈঠক হওয়ার কথা ছিলো।

কিন্তু পূর্বনির্ধারিত বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে বিএনপিকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়, তাদের সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে না।

তবে বৈঠকের ২৪ ঘণ্টা আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মোদি সাহেব আসছেন পাশের দেশ থেকে। ভালো কথা, কিন্তু আমাদের সমস্যার সমাধান কতটুকু করছেন?

তিনি বলেন, ‘যখন দিল্লিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে নিকৃষ্টতম সামপ্রদায়িক দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ আছে, এই দাঙ্গার সঙ্গে আপনার দল অভিযুক্ত, সেই সময় আপনার বাংলাদেশে আসাটা কতটুকু শোভনীয় হচ্ছে সে বিষয়ে চিন্তা করা দরকার।’

বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন ভরতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় পা রাখার আগে বিএনপির মহাসচিবের দেয়া ওই বক্তব্যের কারণে ভারতের সঙ্গে বৈঠকটি বাতিল হয়।

ওই বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু মহাসচিবের ভারত বিরোধী বক্তব্যের কারণে তা ভেস্তে যায়।

এর আগে ২০১৩ সালের ৫ মার্চ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেছিলেন খালেদা জিয়া। জামায়াতের হরতালের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করায় তখন থেকেই বিএনপির-ভারত সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।

যদিও প্রণব মুখার্জির বৈঠক বাতিল করার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজে গিয়ে হোটেল সোনারগাঁওয়ে দেখা করে এসেছেন। তখন আগামী নেতৃত্বের জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে কে হবেন ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী এটি জানতে চেয়েছিলো ভারত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বিএনপি প্রতিনিধি দলের বৈঠকের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না।

তিনি বলেন, বৈঠক বাতিলের ব্যাপারেও আমি কিছু জানি না। সুতরাং এ ব্যাপারে আই হ্যাভ নো কমেন্ট।’

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু এখন দেশে-বিদেশে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অভিসংবাদিত নেতৃত্ব, সেটাই পরিষ্কার।

তারা এই মুজিববর্ষকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদির আগমনের বিরোধিতার নামে আজকে মুজিববর্ষকে ঘিরে সারা দেশে, এমনকি সারা বিশ্বে যে জাগরণের ঢেউ আমরা লক্ষ করছি, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য আমাদের সংগ্রাম সাফল্য উন্নয়ন অর্জন, সব কিছুকে ঘিরে নতুন আলোক সম্পাদিত হয়েছে, এটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না। এটা অনেকের গাত্রদাহের কারণ।’

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘কারা এই বিরোধিতা করছে? এরাই তারা, যারা ভারতে গিয়ে পানির কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল।

যারা ভারতে গিয়ে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে যখন ঢাকায় প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন— আমি তো এ কথা ভুলেই গেছি।

আমরা আমাদের স্বার্থের কথা ভুলি না। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে আমরা আমাদের স্বার্থকে ভুলে যায়নি। আমাদের ক্ষমতার উৎস দেশের জনগণ।

ভারত আমাদের দুঃসময়ের বন্ধু ভারত আমাদের উন্নয়নের সহযোগী ভারতের সঙ্গে আমাদের এটা হচ্ছে বন্ধুত্ব। তারা (বিএনপি) ক্ষমতার জন্য দাসত্ব করতেও প্রস্তুত।

এটার বড় প্রমাণ নরেন্দ্র মোদি যখন নির্বাচিত হলেন, তখন ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের অফিস খোলার আগেই বিএনপির প্রতিনিধিরা ফুলের মালা আর মিষ্টি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। এখন তাদের লজ্জা করে না নরেন্দ্র মোদির বিরোধিতা করতে?’

আমারসংবাদ/এমএআই