সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

মাহমুদুল হাসান

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৬,২০২০, ১২:৩০

মার্চ ০৬,২০২০, ১২:৩০

করোনাভাইরাস: স্থবির গতিময় পৃথিবী

প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মানব সভ্যতাকে আরও গতিময় করেছে। মানুষ এখন রোবটি দুনিয়ার ব্যবহার ও প্রসার নিয়ে ভাবছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ধারণা এখন চারদিকে শোনা যাচ্ছে।

ঠিক এমন সময় আবির্ভূত হলো নয়া এক ভাইরাসের সংক্রমণ। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে। দুনিয়াজুড়ে এখন করোনা আতঙ্ক। ভিত নড়েচড়ে বসেছে সবার।

সাফল্য আর অগ্রগতির ভাবনাটা পাল্টে এখন মুক্তির পথ খুঁজছে মোড়লরা। ইতোমধ্যে ৭৭টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)। দুই মাসের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দেশগুলোতে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বসবাস।

প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য সর্বত্র করোনার ছোবল। চীনের সামুদ্রিক খাবারের বাজারে উৎপত্তি দাবি করা এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত ৯৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আর মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার দুইশরও বেশি।

এর মধ্যে শুধু চীনে মৃত্যু হয়েছে অন্তত তিন হাজার। এখন চীনের পরে করোনায় মৃত্যু বেড়েছে ইতালিতে। সেখানে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে আশিজনেরও বেশি মানুষের। ইতালি থেকে অন্যদেশগুলোতেও করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন জানিয়েছেন, ভারতে ২৯ করোনা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। যাদের মধ্যে ১৬ জন ইতালিয়ান পর্যটক। পর্তুগালে করোনা শনাক্ত হয়েছে এমন একজনও ইতালি থেকে পর্তুগালে গিয়েছেন। বাংলাদেশের সাথেও ইতালির নিয়মিত ভালো যোগাযোগ রয়েছে।

সেখানে কী পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছে এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানা গেছে, ইতালিতে প্রায় তিন লাখের বেশি বাংলাদেশি ইতালির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছেন।

তবে এদের বেশিরভাগই রোম ও মিলান সিটিতে কর্মরত। করোনার প্রকোপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ভীতি বাড়তে শুরু করেছে। দেশে যেন করোনা ছড়িয়ে না পড়ে তাই দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালি থেকে বাংলাদেশে প্রবেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা বাতিল করেছে সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মোকাবিলায় ভীতি দূর করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কাজ করতে হবে। চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ বাংলাদেশ ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে।

তবে তারা আশ্বস্ত করেছেন করোনায় মাত্র এক শতাংশের মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে হাঁচি-কাশি ও হাত ধোয়া শিষ্টাচার মেনে চললে করোনা প্রতিরোধ অনেকাংশেই সম্ভব হবে।

এদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে যখন দেশ, তখন সরকারের স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে।

তবে এ কথায় সাধারণ মানুষ আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ গেলো বছর ডেঙ্গুতে লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হলেও তখন সরকার মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু তবুও ভয়াবহতা রোধ করা সম্ভব হয়নি।

এমন অভিজ্ঞতা থেকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তা জানাতে চেয়েছে হাইকোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।

এসময় আদালত জানতে চেয়েছেন করোনা ভাইরাস পরীক্ষায় স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরে কী ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কী ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত ও আক্রান্তদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার কী ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে এসব বিষয়ে আগামী সোমবারের মধ্যে জানাতে হবে।

দেশের সর্বশেষ অবস্থা : কেবল দুটি আচরণগত চর্চাতেই করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করা যায়। সেগুলো হচ্ছে কাশি শিষ্টাচার এবং সাবানপানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া।

আমরা সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছি বলে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা।

তিনি বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত পূর্বের চব্বিশ ঘণ্টায় ১৫৬টি কল এসেছে জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী তিনি বলেন, এর মধ্যে ১০৪টি কল কোভিড-১৯ সংক্রান্ত। এসময় ১০৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং তাদের কারো মধ্যে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

ডা. ফ্লোরা বলেন, যেসব দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে তাদের জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রযোজ্য হতে পারে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্ত কোনো রোগী পাওয়া যায়নি।

তাই এই মুহূর্তে যেসব কুয়েতপ্রবাসী বাংলাদেশে অবস্থান করছেন তাদের জন্য করোনামুক্ত মেডিকেল সার্টিফিকেট গ্রহণের বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুরে করোনা আক্রান্ত পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে তিনজন সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছে। বাকি দুজনের মধ্যে একজন যেকোনো সময় বাড়ি ফিরবে। আর প্রথমে সংক্রমিত হওয়া একজন এখনো আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন।

চীনের পরিস্থিতি : গেলো বছর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের একটি সামুদ্রিক প্রাণীর বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এখন পর্যন্ত সেখানে ৮০ হাজার ৪২২ জন সংক্রমিত হয়েছেন। মারা গেছেন দুই হাজার ৯৮৪ জন। চীনের বাইরে ৭৬টি দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৬৮৬ জন।

চীন- জাপান সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে চীনের প্রেসিডেন্টকে জাপানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো কিন্তু দুই দেশ করোনা মোকাবিলায় গুরুত্ব দেয়ায় গতকাল সে সফরটি বাতিল করা হয়েছে।

ভারতের পরিস্থিতি : বাংলাদেশ প্রতিমুহূর্তে উচ্চ ঝুঁকির দেশে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ পর্যন্ত ২৯ জন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তিতে শনাক্ত করা হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন জানিয়েছেন, ভারতে শনাক্ত হওয়া ২৯ জনের মধ্যে ১৬ জন ইতালীয় পর্যটক।

এছাড়া দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সার্বিকভাবে করোনা মোকাবিলায় তত্ত্বাবধায়ন করছেন। এবারের হোলি উৎসবে মোদিসহ বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা অংশ নেবেন না।

সেই সাথে এই মন্ত্রী ভারতের নাগরিকদের প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ যাত্রায় নিরুৎসাহিত করেছেন। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে যখন বিশ্ব নাজেহাল।

ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য গবেষণায় মত্ত, ঠিক তখন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে করোনা মোকাবিলায় গোবর ও গোমুত্র পানের উৎসবের ডাক দিয়েছেন হিন্দু মহাসভার সভাপতি চক্রপাণি মহারাজ।

তিনি বলেন, আমিষভোজীদের শাস্তি দিতে ও ক্ষুদ্র প্রাণীদের রক্ষা করতেই পৃথিবীতে এই ভাইরাসের আগমন। আমরা যেমন চায়ের আসর বসাই, তেমনই গোমূত্র পার্টির আয়োজন করছি।

সেখানে করোনা ভাইরাস কী এবং কীভাবে গোমূত্র এবং গোবরজাত দ্রব্য ব্যবহারে এই ভাইরাসমুক্ত থাকা যায়, সেসব নিয়ে সচেতনতার প্রচার করা হবে।

তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠানে গোমূত্র বিলির জন্য আলাদা কাউন্টার থাকবে। এখান থেকে লোকজন পানের জন্য গোমূত্র সংগ্রহ করতে পারবেন।

পাশাপাশি গোবরের কেক এবং গোবরের তৈরি ধুপকাঠি পাওয়া যাবে। এসব জিনিসপত্র ব্যবহার করলে সঙ্গে সঙ্গে করোনা ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যাবে।

ইরানের সর্বশেষ অবস্থা : ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কিয়ানুশ জাহানপুর জানিয়েছেন, সেখানে করোনা ভাইরাসে এ পর্যন্ত দুই হাজার ৯২২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৫৫২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

সেই সাথে দুঃখজনকভাবে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ইরানের করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান ইরাজ হারিরচি এই ভাইরাসের সংক্রমণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ সংকটপূর্ণ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিলে দেশটি তা ফিরিয়ে দেন।

প্রধানমন্ত্রী হাসান রুহানী বলেন, ইরানি জাতি ভালো করেই জানে এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিথ্যাচার। তারা ইরানিদের চিকিৎসা ও খাদ্য সামগ্রীতে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখে আবার সহায়তার প্রস্তাব সত্যি উপহাস ছাড়া কিছু নয়।

ইতালির সর্বশেষ অবস্থা : চীনের পর মৃত্যুর দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ইতালিতে ঘটেছে। সেখানে গত বুধবার পর্যন্ত ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ৫০০ জনেরও বেশি।

ইতোমধ্যে ইতালিতে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছেন। তিনি এখন আইসোলেশনে রয়েছেন। তার বিষয়ে সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছে দূতাবাস।

আমারসংবাদ/এমএআই