সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

ফারুক আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৬,২০২০, ১২:৩৮

মার্চ ০৬,২০২০, ১২:৩৮

বিমানকে জ্বালানি দিয়ে বিপাকে বিপিসি

  • বকেয়া দুই হাজার ১৩৩ কোটি টাকা
  • বিপিসির চিঠিতেও সাড়া দেয় না বিমান

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে নাজুক অবস্থায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বিমান বিগত ১০ বছরের মধ্যে ৬ বছরে ১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা লোকসান ও চার বছরে ৭৭৭ কোটি টাকা লাভ করে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১৮ কোটি টাকা লাভ দেখালেও জ্বালানি বাবদ বকেয়া ২ হাজার ১৩৩ কোটির মধ্যে একটি টাকাও পরিশোধ করেনি। বকেয়া টাকা পেতে বছরের পর বছর বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠালেও জবাব পাচ্ছে না বিপিসি।

সর্বশেষ চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি বিমান পরিবহন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিমানের কাছে বিপিসির পাওনা আদায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের কার্যপত্রে দেখা গেছে বিপিসি ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জেট ফুয়েল বাবদ এই টাকা পাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, যেকোনো বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় জ্বালানি অর্থাৎ জেট ফুয়েলের পেছনে।

এরপরও অন্তত ১০-১৫ শতাংশ খরচ হয় বিভিন্ন কর এবং ফি’র পেছনে, যেটি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আদায় করে। এ বিপুল অঙ্কের টাকা অপরিশোধিত রেখে প্রতিষ্ঠান
লাভ কীভাবে দেখালো?

এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোকাব্বির হোসাইন আমার সংবাদকে বলেন, বিমানের জ্বালানি তেলের বকেয়া অর্থ ২০১০ থেকে ২০১৭ সালের।

গত বছরগুলোয় বিপিসির কাছ থেকে জ্বালানি তেল নেয়ার পর কিছু টাকা পরিশোধ করেছে আর কিছু টাকা বকেয়া রেখেছে। এভাবে বছরের পর বছর টাকা বকেয়া রাখায় বর্তমানে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা হয়েছে। বকেয়া টাকা পরিশোধে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যা প্রক্রিয়াধীন।

তিনি বলেন, এখন বিমান অগ্রিম অর্থ দিয়ে বিপিসির কাছ থেকে তেল নিচ্ছে। বকেয়া দুই হাজার ১৩৩ কোটি টাকার সবটাই তেলের দাম নয়। এই টাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চার্জ এবং সুদ রয়েছে। বিমানের রুটিন আয় দিয়ে এই অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কীভাবে এ অর্থ পরিশোধ করা যায় তা নির্দিষ্ট হলে বলা যাবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, বিমানের কাছ থেকে বকেয়া অর্থ পেতে কয়েকবার চিঠি দিয়েছি।

প্রতিষ্ঠানটি হয়তো ভাবছে এ বকেয়া অর্থ মনে হয় ফেরত দেয়া লাগবে না। বকেয়া পরিশোধ না করেই লাভ দেখানো হয়েছে, যা চোখে ধুলা দেয়ার মতো। দীর্ঘদিন যাবৎ বকেয়া অর্থের ওপর সুদ-আসল মিলে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা হয়েছে।

বিপিসি সূত্র বলছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে বকেয়া পরিশোধ করলে বিপিসির কাজের গতি দ্বিগুণ হয়ে যেত। কিন্তু এভাবে জ্বালানি তেল নিয়ে যদি বছরের পর বছর টাকা বকেয়া রাখলে এক সময় বিপিসি মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ ইতোমধ্যে সংস্থাটি নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

বিমান যেসব অর্থবছরে লাভ দেখিয়েছে সেইসব অর্থবছরেও তেলের দাম বাকি রেখেছে। লাভ-ক্ষতির যে হিসাব দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় তাতে দেখা যায়— ২০১৬-১৭ সালে ৪৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ সালে ২৩৫ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০১৪-১৫ সালে ২৭৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা লাভ করেছে বিমান।

কিন্তু লাভ করার পরও বকেয়া পরিশোধ করেনি। জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক নিরীক্ষা প্রয়োজন। বছর শেষে আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব নির্ধারণ করা হলেই এসব সমস্যা আর থাকবে না।

কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতির কারণে এটি করা হয় না। যে কারণে এক প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্যটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার যেহেতু প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোম্পানি করে দিয়েছে। কোম্পানিগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোর না হলে কোনো না কোনো সময় লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এতে সরকারের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

প্রসঙ্গ, ১৯৯১-৯২ থেকে ২০০৩-০৪ অর্থবছর পর্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিলো বিমান। এরপর থেকে টানা লোকসানে পড়ে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুবছরই লাভ করে বিমান। এরপর ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর লোকসান দেয়। তারপর তিন অর্থবছর লাভ করে।

এরপর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসে ফের লোকসান দেয় বিমান। তবে বিপিসির বকেয়া পরিশোধ না করেই ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২১৮ কোটি টাকা লাভ দেখায়।

আমারসংবাদ/এমএআই