সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৮,২০২০, ১২:৩৭

মার্চ ০৮,২০২০, ১২:৩৭

লবণে আয়োডিনের নামে হরিলুটের পাঁয়তারা

  • লবণ উৎপাদন দেখতে বিদেশ যাবেন ৪০ কর্মকর্তা!
  • মান পরীক্ষায় কেমিক্যাল কেনা হবে দুই কোটি টাকার
  • ৯০ খাতের অস্বাভাবিক ব্যয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি

লবণে আয়োডিনের ঘাটতি মেটাতে ১৯৮৯ সাল থেকে তিন দফায় শুরু হয়ে তিনটি প্রকল্প ২০১৮ সালে শেষ হয়েছে। তাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। তারপরও কাঙ্ক্ষিতপর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। আবারো প্রকল্প নেয়া হয়েছে ১২৭ কোটি টাকার।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়েছে। তারপরও দুই কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে সার্ভে, মূল্যায়ন ও শিক্ষার জন্য ধরা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, বিদেশে শিক্ষা সফরেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাবেন বিসিকের ৪০ জন কর্মকর্তা। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই কোটি টাকা।

এছাড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা আমলে না নিয়ে লবণে আয়োডিনের মান পরীক্ষা, টেস্টিং এবং ল্যাবের কেমিক্যাল কেনা হবে দুই কোটি টাকার। মনিটরিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলের জন্যও চার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এভাবে ৯০টি অঙ্গে বিভিন্ন ব্যয় প্রাক্কলন করেছে বিসিক। যা এখতিয়ার বহির্ভূত, অযৌক্তিক এবং অসামঞ্জস্য।

অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা যাচাই করতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় এসব ধরে পড়ে। সভায় উপস্থিত ছিলেন বিসিকের চেয়ারম্যানসহ পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে বিসিক চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, বাইরে করতে অনেক টাকা লাগে। তাই টাকা বাচানোর জন্য নিজস্ব লোক দিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। এতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে গেছে। তা সংশোধন করতে হবে।

পিইসি সভায় তা বলা হয়েছে। অন্য প্রকল্পে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা আছে। তাই এখানেও লবণচাষিদের ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন এতে আপত্তি করায় তা বাদ দেয়া হবে।

ল্যাবের কেমিক্যাল কেনার ব্যাপারে পিইসির আপত্তির ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাদের আটটি ল্যাব রয়েছে। কেউ যাতে প্রশ্ন করতে না পারে তাই পরীক্ষার জন্য কেমিক্যাল কেনা হবে।

সূত্র জানায়, আয়োডিন মানব শরীর গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও বিভিন্ন কারণে এদেশের মাটিতে সঠিক পরিমাণে থাকে না।

তাই আয়োডিনের ঘাটতি পূরণে সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ তৈরি কার্যক্রমের মাধ্যমে আয়োডিন ঘাটতি পূরণ প্রকল্পটিতে ১৯৮৯ সালে ৪৭ কোটি টাকার, ২০০০ সালে ৬২ কোটি টাকার এবং ২০১১ সালে ৭৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

তারপরও ১৯৯৬ সালে ভোক্তাপর্যায়ে পর্যাপ্ত আয়োডিন মিশ্রিত লবণ ব্যবহারের হার ৫৪ শতাংশ থাকলেও ২০১৫ সালে এর হার ৫১ শতাংশে নেমে গেছে।

তাই এই হার বাড়ানোর জন্য চতুর্থপর্যায়ে সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ তৈরির মাধ্যমে আয়োডিন ঘাটতি পূরণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক।

প্রকল্পটি তৈরি করতে শিল্পসচিব আবদুল হালিমের সভাপতিত্বে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচ বছরের মধ্যে বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৭ কোটি টাকা।

আট বিভাগের সব জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

তা অনুমোদনের জন্য ডিসেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে যাচাই করতে গতকাল বুধবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বলা হয়, প্রকল্পটি তৈরি করা হলেও তাতে অনেক অসঙ্গতিপূর্ণ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে সভায়।

লবণে আয়োডিন মিশ্রণ একটি রুটিন কাজ হলেও দীর্ঘ ২৯ বছরেও টেকসই ভিত্তি তৈরি না করে আবারো চতুর্থপর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ কতোটা বাস্তবসম্মত তার ব্যাখ্যা চেয়েছে।

শুধু তাই নয়, ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যৌক্তিক নয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বলে পরিকল্পনা কমিশন মনে করে।

আয়োডিনের প্রকল্পে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য এক কোটি টাকারও বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। লবণে আয়োডিনের মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার বিষয়টি বিএসটিআইর।

বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর এবং ক্যাব বাজার মনিটরিং করার জন্য কোর্ট পরিচালনা করায় এ প্রকল্পে প্রয়োজন নেই। আইনি ব্যয়ও ৩০ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, লবণে আয়োডিনের মান পরীক্ষার জন্য লবণও কেনা হবে। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। টেস্টিংয়ের জন্য ৪৪ লাখ টাকা, লবণ পরীক্ষার জন্য ল্যাবের কেমিক্যালও কেনা হবে।

এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭ লাখ টাকা। মনিটরিং এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোলেরর জন্যও তিন কোটি ৯৭ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। এই ব্যয় বহুমাত্রিক। কারণ লবণে আয়োডিনের মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার বিষয়টি বিএসটিআইয়ের।

ডিপিপিতে লবণ চাষিদের জন্য ঋণ দেয়ারও সংস্থান রাখা হয়েছে। তাতে ব্যয় করা হবে ১০ কোটি টাকা। যা বিসিকের কাজ নয়, প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৪০ জনের বিদেশ ট্যুরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাতে ব্যয় হবে দুই কোটি টাকা। কনসালটেন্সি নিয়োগে ছয় লাখ এবং সার্ভেতে ব্যয় করা হবে এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। ১৭টি ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্সের জন্যও এক কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

এর দরকার আছে কি না সে ব্যপারেও প্রশ্ন তোলা হয় সভায়। শুধু তাই নয়, ৫৬৪টি অ্যাডভোকেসি এবং ওরিয়েন্টশনের জন্য প্রায় সাত কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে এই প্রকল্পটি করা হলেও দেশের কোন কোন অঞ্চলে আয়োডিন লবণের ব্যবহার কম সেটির কোনো ডাটাবেজ বা তালিকা দেয়া হয়নি। ২০১৫ সালের পরে কোনো জরিপ হয়নি। কাজেই কিভাবে এসব অঞ্চল চিহ্নিত করা হবে তা পরিষ্কার নয়।

আবার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশে এ প্রকল্প তৈরি করা হলেও তাদের সুপারিশে ল্যাবের যন্ত্রপাতি কেনা বা আধুনিকায়নের কোনো সুপারিশ করা না হলে এ খাতে কোটি টাকারও বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। যা বাদ দেয়া দরকার।

এভাবে ৯০টি খাতে বিভিন্নভাবে ব্যয় নির্ধারণ করেছে বিসিক। যা পিইসি সভায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ও অসামঞ্জস্য মনে করে এসব সংশোধন করতে বলা হয়েছে।

তা করা হলেই অর্থাৎ সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে অনুমোদনের জন্য একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ