শনিবার ০৬ জুন ২০২০

২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

মাহমুদুল হাসান

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৮,২০২০, ০১:৩৩

মার্চ ০৮,২০২০, ০১:৩৩

করোনা ভাইরাস মোকাবিলা প্রস্তুতি নিয়ে সবার উৎকণ্ঠা

ইশতিয়াক আহমেদ (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি আর্থিকপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত। রাজধানীর ধানমন্ডিতে সপরিবারে বাস করেন। ছুটির দিনে (গতকাল) রাজধানীর নিউ মার্কেটে পরিবার নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছেন।

সঙ্গে থাকা স্ত্রী ও কন্যাসহ তিনি মাস্ক পরে মার্কেটে এসেছেন। তিনজন মাস্ক পরে একসঙ্গে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে পছন্দের জিনিস খুঁজছেন। কৌতুহলি মনের আকাঙ্ক্ষা থেকে কথা হয় তার সঙ্গে।

কথার প্রসঙ্গে তিনি মাস্ক পরার কারণ নিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, বাংলাদেশে যে করোনা ছড়িয়ে পড়েনি কিংবা পড়বে না; কীভাবে বিশ্বাস করি। তাই ঘর থেকে বের হলে এখন সবসময় মাস্ক পরে বের হই। নিজের নিরাপত্তা তো নিজেরই নিশ্চিত করতে হবে।

কারো কথায়ই তো এখন আস্থা রাখা যায় না। গেলো বছর স্ত্রী শারমিন সুলতানার (ছদ্মনাম) ডেঙ্গুজ্বর হয়েছিলো। তখনো সরকারের তরফ থেকে বলা হয়ছিলো— দেশে ডেঙ্গু মহামারি হয়নি।

কিন্তু হাসপাতালে দেখেছি তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রতিদিন পত্রিকায় পড়েছি ডেঙ্গুতে শত শত মানুষ মরেছে। কিন্তু সরকার তো তাদের অধিকাংশের মৃত্যু ডেঙ্গুতে হয়েছে— এ তথ্য অস্বীকার করেছে। তাই এবার করোনা দেশে সংক্রমিত হয়নি— এমন তথ্যে তিনি বিশ্বাস রাখতে পারছেন না।

নিউ মার্কেট সংলগ্ন চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের নিচে গল্প করছিলেন এমন কয়েকজন তরুণের সাথে কথা হয়। তাদের মধ্যে একজন ঢাকা কলেজের স্নাতক শেষ বর্ষের ছাত্র ইমরান নাজির। বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলায় কতটা সক্ষম এমন প্রশ্নের জবাবে এ যুবক উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, যেখানে প্রতিষেধক থাকার পরও ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি। সেখানে ওষুধই আবিষ্কার হয়নি নতুন এ ভাইরাস মোকাবিলায় প্রস্তুত বলা হাস্যকর ছাড়া আর কি! চীনের মতো উন্নত দেশই তো হিমশিম খাচ্ছে করোনা মোকাবিলায়।

এদিকে সংবাদ শুনি বিমানবন্দরের থার্মাল স্ক্যানার নষ্ট। স্থলবন্দরে নিয়ম মেনে করা হয় না স্ক্রিনিং! অধিকসংখ্যক লোক আক্রান্ত হলে কোয়ারেন্টাইনের নেই কোনো ব্যবস্থা।

তারপরও কীভাবে বলি বাংলাদেশ সক্ষম। আমার তো ভয় হচ্ছে দেশে করোনা সংক্রমিত হলে কি ধরনের ভয়াবহ চিত্র তৈরি হতে পারে সেটা নিয়ে।

ঢাকা কলেজের একজন শিক্ষার্থী এমন উদ্বেগের কথা বললেও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নয়া ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ভীতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সাধারণ মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না যে, করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সক্ষম।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে— করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। দেশের সব সমুদ্র, স্থল, রেল এবং আকাশ পথের যাত্রীদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত পন্থায় স্ক্রিনিং শেষে নিরাপদ এ তথ্য নিশ্চিত হয়ে দেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে।

এসময় কারো শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। করোনার থাবা প্রতিরোধে দেশে তিনস্তরের কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি গাইড লাইন তৈরি করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি স্থায়ী কোয়ারেন্টাইন সেন্টার গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়াও পর্যাপ্ত শনাক্তকরণ কীট ও সরকারের চিকিৎসাসেবা প্রদানের সক্ষমতা রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দেশের স্থলবন্দরে গুরুত্বের সাথে কোনো স্ক্রিনিং করা হচ্ছে না। দায়সারা প্রস্তুতিতে করোনা মোকাবিলার কথা বলা হচ্ছে।

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা না শোধরালে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই ঢাকঢোল না পিটিয়ে নিজেদের ঘাটতিগুলো কাটিয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশের সব বিমান, রেল, স্থল এবং সমুদ্রবন্দরে করোনা ঝুঁকি মোকাবিলায় এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৯ হাজার আট জনকে স্ক্রিনিং করে দেশে প্রবেশ করার অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

এদের মধ্যে আকাশ পথে তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছেন ২ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ জন। দুই সমুদ্রবন্দরে স্ক্রিনিং হয়েছে ৫ হাজার ৪১৬ জন।

রেলে ভারত থেকে স্ক্রিনিং করে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে ৫ হাজার ২২৯ জন এবং দেশের সীমান্তের স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশ করেছেন অন্তত ২ লাখ ২৪ হাজার ৩২৯ জন। এত যাত্রী স্ক্রিনিং করেও এখনো দেশে কোনো করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে করোনার বড় ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব।

তাই জনসচেতনতায় বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে কেউ যদি আক্রান্ত হয়ে পড়ে তার চিকিৎসার জন্য কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যধি হাসপাতাল, সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোকে করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জাতীয়, জেলা এবং উপজেলাপর্যায়ে করোনা মোকাবিলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। দেশের চিকিৎসকদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

তিনি বলেন, নিয়মিত স্ক্যানিং করে মানুষ দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। সেখানে কারো শরীরে কোন অস্বাভাবিক তাপমাত্রা দেখা দিলে তাকে সাথে সাথে কোয়ারান্টাইনে রাখার নির্দেশনা দেয়া আছে।

এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে একটি করোনা মোকাবিলায় গাইড লাইনও তৈরি করা হয়েছে।

বিমানবন্দরের থার্মাল স্ক্যানার মেশিন নষ্ট হলেও সারা দেশের সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দরে হ্যান্ড স্ক্যানার মেশিন দিয়ে স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। এগুলোও সমান কাজ করে। আরও পাঁচটি নতুন থার্মাল স্ক্যানার মেশিন শিগগিইর আনা হবে।

এদিকে জাতীয় কমিটির প্রথম সমন্বয় সভা গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। উপজেলা, জেলা এবং জাতীয় তিন স্তরের কমিটি করা হয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর্যাপ্ত কীট মজুদ রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে একশ কোটি ডলার আর্থিক সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সেটা পেলে পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার করা হবে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ