শনিবার ০৬ জুন ২০২০

২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু ও রতন কান্তি দেবাশীষ (চট্টগ্রাম)

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ০৮,২০২০, ০২:১৫

মার্চ ০৮,২০২০, ০২:১৫

নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে কিশোর গ্যাং

সহিংস কিশোরদের গ্রুপ প্রাপ্তবয়স্ক সংঘবদ্ধ অপরাধী দলের মতোই গ্যাং নামে পরিচিতি পেয়েছে ইতোমধ্যেই। দেশের বিভিন্ন শহরে সক্রিয় এসব কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত কিশোরদের হিংস্রতাও দেখেছে দেশের মানুষ।

বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে সহিংস এসব গ্যাং মারামারি, খুনোখুনিও বাদ দিচ্ছে না। ঠুনকো বিষয়েও জড়িয়ে পড়ছে সহিংসতায়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রণোদনাই এসব কিশোরদের গ্যাংগ্রুপ হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহস জুগিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

গ্যাংভিত্তিক এসব কিশোরদেরই আবার রাজনৈতিক সহিংসতায়ও জড়াচ্ছেন কিছু দেশপ্রেমিক রাজনীতিক (পৃষ্ঠপোষকরা)।

অথচ কিছুসংখ্যক ঘটনায় দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনো কখনো গ্যাং কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে দু্-একজন কিশোর সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও মূলত আড়ালেই থেকে যাচ্ছে পৃষ্ঠপোষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধপ্রবণ মানুষরা শুধু সেইসব মানুষেরই ক্ষতি করে না, যাদের ওপর তারা অপরাধ ঘটায়। এরা পুরো সমাজেরই ক্ষতিসাধন করে।

এদের কারণে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘটছে অবনতি।

তাদের মধ্যে যারা শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার পৃষ্ঠপোষকতা করে, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর এবং সমাজের জন্য ভয়ংকর। তারাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটা অংশকে বিপথগামী করছে, নষ্ট করছে তাদের ভবিষ্যৎও।

এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অপরাধ সংগঠনের পর গণমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর সংবাদ শিরোনামে উঠে এলেও তাদের পেছনের অশুভ পৃষ্ঠপোষকেরা বরাবরই থেকে যাচ্ছে আড়ালে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আসন্ন।

এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে এমন বেশকিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম উঠে আসে, যারা কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। চট্টগ্রাম মহানগরের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান সিটি কর্পোরেশন পরিচালনার জন্য তারা মহানগরের বাসিন্দাদের সমর্থন পেতে চান।

কাউন্সিলর পদে প্রার্থীও হয়েছেন এমন বেশকজন ব্যক্তি। যারা কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদার হিসেবে পরিচিত অপরাধী চক্রের পৃষ্ঠপোষক। এরা অনেকেই ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন বা সহযোগী সংগঠনের নেতা, কর্মী ও সমর্থক।

এদের মধ্যে কয়েকজন আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে খোদ ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনও পেয়েছেন। বাকিদের ভাগ্যে দলীয় সমর্থন না জোটায় বিদ্রোহীতে পরিণত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম মহানগরে তৎপর কিশোর গ্যাংগুলোর পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যা সবমিলিয়ে এক ডজনও নয়— এমন ধারণা হলেও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা অনেক বেশি।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের হিসাবের খাতায়ই ৪৮ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়। আসন্ন নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের কয়েকজনের নামও পুলিশের সেই তালিকায় রয়েছে।

তাদের মধ্যে যারা দলীয় সমর্থন পেয়েছেন তাদের মধ্যেও রয়েছে দুজন প্রার্থী, যারা কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক বলে জানা যায়।

ক্লিন ইমেজের লোকজনকে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে— এমনটা সবারই জানা থাকলেও কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের কপালেও জুটছে দলীয় সমর্থন— এ তথ্য কজনের জানা? এমনটাই প্রশ্ন মহানগরীর বাসিন্দাদের।

এদিকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ১৩ নং ওয়ার্ডের প্রার্থী ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুপরিচিত।

তার এলাকা ১৩ নং ওয়ার্ডে কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে খুনোখুনিতে গত বছরের ২৬ আগস্ট দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এক কিশোর মারাও যায়।

আর ১৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সমর্থনপ্রাপ্ত প্রার্থী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য আবুল হাসনাত গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত কলেজছাত্রী দিদার হত্যামামলার আসামি ছিলেন।

এসব তথ্য গণমাধ্যমেও প্রচার হয় ফলাও করে। অন্যদিকে এ নির্বাচনে দলীয় সমর্থন যারা পাননি কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন তারা প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গেই জড়িত।

তাদের মধ্যে একজন গুরুতর সন্ত্রাসী, পাঁচ মামলার আসামি এবং র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাবন্দি। দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর কোনো ব্যক্তি জনপ্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে না।

তবুও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে জনপ্রতিনিধিত্বের জন্য লড়াই করছে সেসব ব্যক্তি, যারা কিশোরদের পৃষ্ঠপোষকতা করে গ্যাং সৃষ্টি করছেন। করছেন সমাজের পরিবেশ নষ্ট।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস) আমার সংবাদকে বলেন, এ সংক্রান্তে আমরা গত বছরের শেষের দিকে একটি তালিকা করেছি। এ তালিকাভুক্তদের মধ্য থেকে দু-একজন প্রার্থী হয়েছে বলেও জানতে পেরেছি।

তবে আমরা সকল প্রকার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর অবস্থানে রয়েছি, যাতে তারা বিশৃঙ্খল কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ