মঙ্গলবার ৩১ মার্চ ২০২০

১৭ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু

মার্চ ২২,২০২০, ০১:১৫

মার্চ ২২,২০২০, ০১:১৫

চিকিৎসকরাই হতে পারেন সংকটের কারণ!

গোটা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক। এরই মধ্যে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। গতকাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে, এমনটাই জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।

এদিকে এই ভাইরাস মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতিই গ্রহণ করেছে সরকার। বিশেষ করে প্রবাসফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করা, পাশাপাশি যারা এখনো বিদেশ থেকে যারা আসছেন তাদের সরাসরি সেনা তত্ত্বাবধানে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও দফায় দফায় বৈঠক করে করোনা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিচ্ছেন। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি ঠিক থাকলেও করোনা নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হতে পারে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে— এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

ইতোমধ্যেই বেসরকারি এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে মৌসুমী জ্বর, সর্দিজ্বরের মতো সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা দিতেও অনীহা প্রকাশ করছেন চিকিৎসকরা।

শুধু তাই নয়, চিকিৎসা না দেয়ারও অভিযোগও উঠেছে। তার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত শনিবার কানাডাফেরত অসুস্থ নাজমা আমিন ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জ্বর নিয়ে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাবলু চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় করোনা সংকটে চিকিৎসকদের এমন চিকিৎসাহীনতার মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

আর এ মনোভাবেই করোনা পরিস্থিতিতে মহাসংকটের কারণ হতে পারেন খোদ চিকিৎসকরাই— মনে করছেন অনেকে।

এছাড়াও গতকাল শনিবার খোদ রাজধানীর উত্তরায় মেডিকেল কলেজ ফর উইমেন্স অ্যান্ড হসপিটালে চিকিৎসকরা চিসিৎসাসেবা নয়, বরং চলমান করোনা পরিস্থিতিতে ছুটি চেয়েই হাসপাতালের সামনে ঘণ্টাব্যাপী আন্দোলন করেছেন। চিকিৎসকদের এমন মনোভাব আর আচরণে জনমনে আতঙ্কের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) না থাকার কারণে তারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

যেখানে চীন এবং ইউরোপের দেশগুলোর চিকিৎসকরা অভাবনীয় আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেছেন ইতোমধ্যে; সেখানে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের গড়িমসি, অনীহা, আতঙ্ক জনগণের মনে নানা প্রশ্ন তুলেছে।

চিকিৎসকদের পিপিই থাকবে কী থাকবে না— তার ঊর্ধ্বে গিয়েই রোগীকে চিকিৎসা দেবেন চিকিৎসক, এর অন্যথায় চিকিৎসাশাস্ত্রের সরাসরি লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কিন্তু শাস্ত্রের লঙ্ঘন করেই চিকিৎসাসেবা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। যার একমাত্র কারণ পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) সংকটে সৃষ্ট করোনা আতঙ্ক।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করে জানতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি, তবে গণমাধ্যমে বলেছেন, চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা যেমন জরুরি, তেমনি অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করাও জরুরি।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের সমস্ত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতা এবং করোনা মোকাবিলায় তারা কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করবেন সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু করোনার ক্ষেত্রেই নয়, চিকিৎসাব্যবস্থার মেরুদণ্ড চিকিৎসকদের নিয়ে বাংলাদেশে নানা অভিযোগ উঠেছে আগেও।

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে তাদের স্বার্থপরতা এবং মহান পেশার আড়ালে নিজেদের ব্যক্তিচিন্তা বড় করে দেখার প্রবণতা আবারো প্রমাণিত হয়েছে ঢামেকে নাজমা আমিন ও খুলনা মেডিকেলে বাবলু চৌধুরীর মৃত্যু ও উত্তরায় মেডিকেল কলেজ ফর উইমেন্স অ্যান্ড হসপিটালে ছুটি চেয়ে আন্দোলনের ঘটনায়।

জানা গেছে, অনেক চিকিৎসক হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে নিজেদের দায়িত্ব থেকে গুঁটিয়ে নিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশের কোনো সরকারি চাকরিজীবী চাকরির বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে না পারলেও একমাত্র চিকিৎসকরাই সরকারি চাকরির পাশাপাশি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। যা একমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব।

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগের একটি তারা হাসপাতালগুলোতে নিয়মমাফিক সেবা দেন না। দায়িত্বে অবহেলা করেন। সরকারি হাসপাতালের বদলে ব্যক্তিগত চেম্বার এবং যেখানে রোগী দেখলে বেশি অর্থ পাওয়া যেতে পারে, সেই কাজেই বেশি মনোযোগী তারা।

দ্বিতীয় অভিযোগ, ইচ্ছেমতো টেস্ট দেন এবং নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেই টেস্ট করতে রোগীদের বাধ্য করেন। বিনিময়ে কমিশন লাভ করছেন তারা।

তৃতীয় সাধারণ অভিযোগ, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির ব্র্যান্ড নেইম ব্যবহার করেন জেনেরিক নেইমের বদলে এবং ওই নির্দিষ্ট ওষুধ কেনার জন্যও রোগীদের বাধ্য করেন।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এরকমও অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছ থেকে মাসোহারা নেন। বৈজ্ঞানিক সম্মেলনসহ চিকিৎসকদের বিভিন্ন সম্মেলনের সব টাকাই জোগায় ওষুধ কোম্পানি আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো।

অথচ এতোসব অভিযোগের ভীড়েও বাংলাদেশের মানুষের রোগ-শোকের শেষ ভরসা দেশের চিকিৎসকরা। বিত্তবানরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে পারলেও সাধারণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত জনগণের শেষ ভরসাই দেশের চিকিৎসক।

কিন্তু চলমান করোনা আতঙ্কে চিকিৎসকরাই যদি চিকিৎসা সেবা প্রদানে অহীনা প্রকাশ করেন তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়— প্রশ্ন সাধারণ মানুষেরই।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবাপ্রতাশ্যী একাধিক রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানায়, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা তাদের মহান পেশার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে।

পেশার মর্যাদা রক্ষায় ব্যক্তিস্বার্থের বদলে রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে মমত্ববোধ এবং দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবেন চিকিৎসকরা— এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

শুধু চিকিৎসকরাই নন, স্বাস্থ্যকর্মীরাও বর্তমান করোনা আতঙ্কের মধ্যে নিজেদের গুটিয়ে নেয়া শুরু করেছেন। অজানা আতঙ্কে ভুগছেন তারাও।

অনেকেই বলছেন, যদি করোনার বিস্তৃতি ঘটে তাহলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যই একটা বড় সংকট সৃষ্টি হবে। যে সংকট করোনা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলতে পারে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ