মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল ২০২০

২৪ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৪,২০২০, ০২:১৯

মার্চ ২৪,২০২০, ০২:১৯

পাঁচ চ্যালেঞ্জে সরকার

  • গুজবের মহামারি
  • লকডাউন নিয়ে দোটানায়
  • করোনা নিয়ে প্রস্তুতির অভাব
  • অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করা
  • দ্রব্যমূল্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ

করোনা ভাইরাস আতঙ্কে দেশজুড়ে চলছে স্বেচ্ছাবন্দি কার্যক্রম। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না জনগণ, রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা, ঈদের ছুটির আমেজের মতোই পরিস্থিতি তৈরি করিয়েছে করোনা।

জনগণের মধ্যে নানা রকম আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা কাজ করছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষজন পড়েছেন নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। এ পরিস্থিতি সরকারের সামনে দাঁড় করিয়েছে পাঁচটি কঠিন চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে দেশের মানুষকে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস থেকে রক্ষা করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অনেকেই।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবকিছুতেই দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সরকার দেরি করে ফেলেছে কি না এবং দেরি করার ফলে করোনার ভয়াবহতা বাড়বে কি না তা নিয়ে জনমনে সৃষ্ট উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছে।

সামনে থাকা পাঁচটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মাধ্যমে জনমনে বিরাজ করা উৎকণ্ঠা নিরসনই সরকারের পাঁচ চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলেও মনে করছেন অনেকে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে আমার সংবাদকে তিনি বলেন, প্রস্তুতি গ্রহণে দেরি করা এবং যেসব প্রস্তুতি এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেছে তাতে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কতটা সক্ষম হবে সরকার, তা নিয়ে আমি মন্তব্য করবো না।

তবে আমি বলবো, করোনা নিয়ে পরীক্ষা আরও বাড়ানো উচিত। আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক পরীক্ষায় এ পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব।

গুজবের মহামারি
সরকারের সামনে পাঁচটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি গুজব। করোনা ভাইরাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একশ্রেণির অতি উৎসাহী জনতার কারণে গুজবের মহামারিও চলছে দেশজুড়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনা নিয়ে নানারকম গালগল্প, গুজব, মিথ্যা তথ্যের ছড়াছড়ি হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এবং এই গুজব সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, একই সাথে ক্ষোভ-অসন্তোষও তৈরি করছে জনমনে।

অনতিবিলম্বে গুজব নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় এ সমস্ত গুজবের কারণে সরকারের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা সৃষ্টি হবে। সেই অনাস্থা যেন কখনোই তৈরি না হয়, সেজন্য গুজব দমনের ক্ষেত্রে কার্যত এবং যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গুজব নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক এআইজি সোহেল রানা আমার সংবাদকে বলেন, গুজব রটিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর রোধ করতে আমাদের মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি বিশাল প্লাটফর্ম বিধায় এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ খুব সহজ নয়।

তবুও, গুজব ছড়ানোর অভিযোগে ইতোমধ্যে খাগড়াছড়ি থেকে ধর্মীয় পরিচয়ধারী একজনকে তার সহযোগী অন্যান্য লোকজনসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চট্টগাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে চিকিৎসক পরিচয়ধারী একজনকে।

লকডাউন নিয়ে দোটানায়
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনা আতঙ্কে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ এরপর দিল্লি শহর লকডাউন করে দেয়। এছাড়া কুয়েত, সৌদি আরব ও শ্রীলঙ্কাসহ বেশকটি দেশে জারি হয় কারফিউ।

এছাড়া অন্য যেসব দেশ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং মোকাবিলায় যে সফল বা ইতোমধ্যে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে তাদেরও প্রথম পদক্ষেপই ছিলো লকডাউন করে জনগণের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।

সেই লকডাউন নিয়ে এখনো দোটানায় রয়েছে সরকার। সরকার মনে করছে, নিম্ন আয়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠী লকডাউন করলে কীভাবে চলবে।

তাছাড়া মাসের শেষদিকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতনভাতা না পেয়ে লকডাউন করার ফলে সমস্যা আরও জটিলতর হতে পারে— ইত্যাকার নানান সমস্যার কারণেই সরকার এখনো পর্যন্ত দোটানায় রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

কিন্তু এই দোটানা থেকে দ্রুত বের হয়ে একটা উপায় বের করতেই হবে— এমনটাই বলছেন আতঙ্কগ্রস্ত জনগণ। যত দ্রুত জনসমাগম এবং জনগণের চলাফিরাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে ততই করোনা মোকাবিলা সহজ হবে এবং এক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত চ্যালেঞ্জের মুখেই রয়েছে সরকার।

করোনা নিয়ে প্রস্তুতির অভাব
করোনা ভাইরাস সর্বপ্রথম চীনে আঘাত করার পর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশে। এরপরই এ ভাইরাসের অস্তিত্ব মেলে বাংলাদেশে। কিন্তু চীন থেকে শুরু হয়ে অন্যান্য দেশ হয়ে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে আসা পর্যন্ত মোকাবিলার পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য দুমাস সময় পেয়েছিল সরকার। দুমাসে সরকারের যে প্রস্তুতি নেয়ার কথা ছিলো তা যথাযথ গ্রহণ করেনি সরকার।

যারা চিকিৎসা করবেন তাদের (চিকিৎসক) পারসোনাল প্রোটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) থেকে শুরু করে আইসিইউ ইউনিট, এমনকি বিদেশ থেকে যারা আসবেন তাদের কীভাবে রাখা হবে, তাদের কীভাবে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে, যারা বিদেশ থেকে আসবেন এবং লক্ষণ দেখা যাবে তাদের কীভাবে দ্রুত পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রস্তুতির অভাব রয়েই গেছে। এছাড়া সমন্বয়ের অভাব এবং এক ধরনের অগোছালো ভাবও দেখা গেছে, যা এখনো দেখা যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক গতকালও বলেছেন, চিকিৎসকদের পিপিই এখনো তেমন প্রয়োজন নেই। অথচ শুরু থেকেই চিকিৎসকরা পিপিই সংকটের কথা বলেই যাচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, পিপিই সংকটে চিকিৎসকরা মৌসুমী জ্বরের চিকিৎসা দিতেও অনীহা প্রকাশ করেছেন। যে কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাহীনতায় মারা গেছে কানাডা প্রবাসী এক তরুণী ও বাবুল চৌধুরী।

সর্বপ্রথম এ সংকটই সমন্বিত করা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দক্ষতা অর্জন করাই বর্তমান সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করা
করোনার প্রভাবে ইতোমধ্যে গার্মেন্টশিল্পে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। অনেক পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ইউরোপীয় এবং আমেরিকান ক্রেতারা তাদের অর্ডার সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে এবং সেখানে তারা ন্যূনতম পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয়নি।

শুধু গার্মেন্টশিল্প নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক মন্দার বাতাস বইতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। এ করোনা পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হতে থাকবে ততই অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক থেকে নাজুকতর হতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত ১১ বছরে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখাই এ সরকারের সবথেকে বড় পজেটিভ দিক ছিলো। কিন্তু সেই অর্থনীতিই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে এবং যদি স্থবির হয়েই পড়ে এমন আশঙ্কায় সরকারের জন্য আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করা।

দ্রব্যমূল্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
করোনার সুযোগে একশ্রেণির মুনাফালোভী ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা মাঠে নেমে তদারকি করছে, তবে সেটা যথেষ্ট নয় বলে ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ মনে করছে।

দ্রব্যমূল্যের দাম, বিশেষ করে চাল-ডাল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। এটা যদি আরও বৃদ্ধি পেলে তা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন অবস্থা তৈরি করবে এবং এটা মোকাবিলা করা সরকারের জন্য পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম একটি।

সরকারের সামনে থাকা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ সার্বক্ষণিক মাঠে রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেল রানা বলেন, দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি রোধে বাজার ভিজিট করা হচ্ছে। অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।

মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু, সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে কেনাকাটা করতে থাকায় দ্রব্যের দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা না পেলে এটি নিয়ন্ত্রণ পুলিশের একার পক্ষে সহজ নয়।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ