মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল ২০২০

২৪ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

জাহাঙ্গীর আলম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৫,২০২০, ০৮:৫৫

মার্চ ২৫,২০২০, ০৮:৫৫

করোনার ভয়াবহ থাবা

করোনায় স্থবির উন্নয়ন কাজ

  • আটকে গেলো এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে পাওয়ার প্রকল্প
  • চার মাসে এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা ঝুঁকিপূর্ণ
  • পরে বাড়তি কাজ করে টার্গেট অর্জনের চেষ্টা করা হবে : পরিকল্পনামন্ত্রী

ভিতরে ঢোকা যাবে না। দেখেন না করোনা ভাইরাসের কারণে নোটিস দেয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে গত সোমবার যেতে চাইলে এভাবে গেটে দায়িত্বরত এসআই তপন ও আনসার হাসান প্রবেশে বাধা দেন আরিফ নামে এক কর্মকর্তাকে। এ সময় আরিফ বলেন, আমি সরকারি অফিসার, অফিসের কাজে এসেছি। পিইসি সভা হবে।

তাই প্রকল্পটি নিয়ে এসেছি। আমাকে যেতে দেন। তারপরও তাকে ভেতরে যেতে দেয়া হয়নি। এটি হচ্ছে উন্নয়নকাজ অনুমোদনের জায়গা পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তব চিত্র। এর প্রধান গেটের বিভিন্ন জায়গায় নোটিসও ঝোলানো হয়েছে।

তাতে বলা হয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় চত্বরে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকবে। শুধু তাই নয়, করোনার কারণে মন্ত্রিসভার গত সোমবারের সভা বাতিল করার পর গতকাল মঙ্গলবার একনেক সভাও বাতিল করা হয়েছে।

সভায় প্রতি এমপির জন্য ২০ কোটি টাকার প্রকল্প, সারা দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার কথা ছিলো। এভাবে করোনার থাবায় উন্নয়নকাজ বন্ধ থাকায় চলতি অর্থবছরে সংশোধন করে এডিপির আকার কমিয়ে এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করলেও তা বাস্তবায়ন করা নম্ভব নয়।

কারণ গত আট মাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮০ হাজার কোটি টাকা। বাকি চার মাসে ব্যয় করতে হবে এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় এ ব্যয় করা ঝুঁকিপূর্ণ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নুরুল আমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান স্যারের নির্দেশে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যাতে যে কেউ প্রবেশ করতে না পারে। করোনার প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি ভালো হলে চলাফেরার গতিও স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

আর পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, করোনা গ্লোবাল সমস্যা। উন্নত দেশও আক্রান্ত হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এতে অর্থনীতির ক্ষতি হবে। তাই আতংকিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে।

সংশোধন করেও বাকি অর্থ চার মাসে ব্যয় করা সম্ভব কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি যাই হোক পরে বাড়তি কাজ করে টার্গেট অর্জনের চেষ্টা করা হবে।

সূত্র জানায়, করোনা ভাইরাসে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারের রুটিন ওয়ার্কও বন্ধ করা হয়েছে। প্রতি সোমবার মন্ত্রিসভার মিটিং এমনকি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভাও বাতিল করা হয়েছে। যেখানে উন্নয়ন কাজের অনুমোদন দেয়া হয়।

অন্যান্য দিনের মতো গতকাল মঙ্গলবারও একনেক সভা হবার কথা ছিলো। কিন্তু করোনার কারণে তা বাতিল করা হয়েছে। যেখানে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ অনুমোদন দেয়ার কথা ছিলো।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে এসে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট নির্মাণে তৃতীয়বারের মতো বড় অঙ্কের এ অর্থ পেতে যাচ্ছেন।

৩০০ জনের মধ্যে ২৮০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনি এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে ২০ কোটি টাকা করে পাবেন। আগামী চার বছরে প্রতিবছর পাঁচ কোটি টাকা করে ২০ কোটি টাকা পাবেন এমপিরা। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের আওতায় ২০টি আসনের এমপিরা এই সুবিধা পাবেন না।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা এ সুবিধার বাইরে থাকবেন। ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩’-এর আওতায় এমপিরা এই টাকা পাবেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠনের পর প্রত্যেক এমপি নিজ আসনের অবকাঠামো উন্নয়নে ১৫ কোটি টাকা করে পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে এমপিদের ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। একাদশ সংসদের সংসদ সদস্যরা এবার তাদের নির্বাচনি এলাকার উন্নয়নে ৩০ কোটি টাকা করে চেয়েছিলেন।

কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, প্রত্যেক এমপির নির্বাচনি আসনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক প্রকল্প চলমান আছে। তাছাড়া ১০ বছরে রাস্তাঘাট নির্মাণে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নও হয়েছে।

তাই এত টাকা বরাদ্দ দেয়ার প্রয়োজন নেই। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে পিইসি সভাসহ সব প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় দফায় এ প্রকল্পের আওতায় নতুন করে উপজেলা সড়ক নির্মাণ করা হবে ৩০৫ কিলোমিটার। এই ৩০৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ২৯০ কোটি টাকা।

ইউনিয়নে সড়ক নির্মাণ করা হবে ৬৬০ কিলোমিটার। এতে খরচ ধরা হয়েছে ৫২৮ কোটি টাকা। গ্রাম সড়ক উন্নয়ন হবে পাঁচ হাজার ২০০ কিলোমিটার। খরচ ধরা হয়েছে চার হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ হবে এক হাজার ৯০ কিলোমিটার। খরচ ধরা হয়েছে ৩৮১ কোটি টাকা। গ্রামীণ সড়কে ১০০ মিটারের নিচের দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে সাত হাজার ৯৯২ মিটার।

শুধু এ প্রকল্পটি নয়, পরিকল্পনা কমিশনে আজ ২০২১ সালে সবার ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা কার্যকর করতে আট বিভাগের জন্য শতভাগ পল্লী বিদ্যুতায়নের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ সংশোধিত প্রকল্প দুটিও অনুমোদন পাওয়ার কথা ছিলো।

গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) আট বিভাগের জন্য প্রকল্প দুটি তৈরি করে। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ দুটি প্রকল্প ২০১৭ সালে অনুমোদনও দিয়েছে সরকার। যা ২০১৯ সালে বাস্তবায়ন করার কথা।

এর মাধ্যমে ৯৬ হাজার কি.মি নতুন লাইন নির্মাণের কথা। যাতে ৩৪ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া যায়। তা আমলে নিয়ে বিআরইবি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। একে ভরসা করে আগামী জুনেই শতভাগ বিদ্যুৎ দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

গ্রাহকরা যাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায় তা নিশ্চিত করতে প্রকল্প দুটি সংশোধন করা হচ্ছে। এতে আরও সাত লাখ গ্রাহক সংযোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সময় বাড়ছে দুই বছর। ব্যয়ও বাড়ছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।

প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে সব প্রক্রিয়া শেষে আজ একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু করোনায় তা সম্ভব হলো না।

কর্মকর্তারা বলছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস করতে হচ্ছে। কোনো প্রকল্প আসছে না মন্ত্রণালয় থেকে। অজানা আতংকে প্রাণে বাঁচাই কঠিন। তাই সরকার ছুটি ঘোষণা করলেই ভালো। বাসা-বাড়িতে চুপচাপ থাকা যাবে। শুধু সরকারি কাজের এই যে করুণদশা তাই নয়, বেসরকারি খাতের কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।

গতকাল মাদারীপুর জেলার আসাদ নামে এক সাইড ইঞ্জিনিয়ার এ প্রতিবেদককে বলেন, সপ্তক কোম্পানিতে জিগাতলায় কাজ করতাম। চারদিকে অজানা আতংক। এলাকাতেও আতংক। তারপরও জানের ভয়ে চলে যাচ্ছি এলাকায়।

তিনি আরও বলেন, শুধু আমি একাই নই, প্রায় কোম্পানির লোকজন চলে যাচ্ছে। সব কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।

সূত্র আরও জানায়, প্রতিবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও সরকার উন্নয়ন কাজের জন্য বেশি করে দুই লাখ ১৫ হাজার ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। তাতে দেড় হাজারেরও বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা।

কিন্তু আশানুরুপ ব্যয় করতে পারেনি ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। গত আট মাসে ব্যয় হয়েছে ৮০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা বা ৩৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। তাই বাকি চার মাসে কাজ করতে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।

অর্থাৎ দুই লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে জুনের মধ্যে। কিন্তু চীনে শুরু হয়ে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ থাবা বাংলাদেশেও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

কাল থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ছুটিও ঘোষণা করেছে সরকার। শুধু তাই নয়, অনেক এলাকা লকডাউনও করা হয়েছে। প্রতিদিনই পরিস্থিতি খারাপের দিকে। তাই আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ