বৃহস্পতিবার ০৯ এপ্রিল ২০২০

২৫ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৬,২০২০, ০২:১৮

মার্চ ২৬,২০২০, ০২:১৮

করোনার আঘাত অর্থনীতিতে কমবে রাজস্ব আদায় ও প্রবৃদ্ধি

করোনার প্রভাবে থমকে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। এতে প্রভাব পড়বে রাজস্ব আদায়ের ওপর। রাজস্ব আদায় কমলে কমে যাবে এর প্রবৃদ্ধি। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দ্রুত বিস্তার করছে করোনা ভাইরাস।

প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের আক্রমণ মানব শরীরের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে। করোনার প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতেও ভয়াবহ মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। সরকারিভাবে নীতিসহায়তার পাশাপাশি নগদ বরাদ্দ দিয়ে অর্থনীতিতে করোনার সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে; কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক কম।

‘লকডাউন’-এর মতো অবস্থায় নিয়ে করোনার প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতা নেই বাংলাদেশের। তাই বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৯৬টি দেশ ও অঞ্চলে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৮০ হাজার। মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার। বাংলাদেশে গতকাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৯ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা বিশ্ব অর্থনীতিতে রীতিমত ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে। শিল্পোৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তিধর দেশগুলোও ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন।

অর্থনৈতিক এ মহাদুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিজ নিজ দেশের আর্থিক খাত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সর্বোপরি নিজ জনগণকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে প্রণোদনামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো প্যাকেজ এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রপ্তানি, পর্যটন ও যোগাযোগ খাত। বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি মূল উদ্দীপক পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। এসবের বাজার ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। শিল্পের কাঁচামালসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির জন্য ভারত ও চীনের ওপর নির্ভরশীল সবচেয়ে বেশি।

এই দেশগুলো করোনার কারণে লকডাউন অবস্থায় রয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে পণ্য শিপমেন্টসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ। কাঁচামালের অভাবে পোশাকশিল্প বন্ধের উপক্রম। রপ্তানির বাজার-দেশগুলোও লকডাউনে। পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কর্মরত। কারখানা বন্ধ হলে এসব মানুষ বেকার হয়ে যাবে; অর্থনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। একদিকে বৈদেশিক আয় কমে যাবে অন্যদিকে কর্ম হারিয়ে মানুষ বেকারে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, ইউরোপ ও চীনে আক্রমণের ফলে সংকট বাড়ছে।

ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণ পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তা হলে আমাদের অর্থনীতিতে কী হবে, তা বলতে পারবো না। আমাদের রপ্তানি খাতে একটা ঝড় বয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তিনি বলেন, যেভাবে ক্রয় আদেশ বাতিল হচ্ছে এতে কারখানা বন্ধ হলে অনেকেই চাকরি হারাবেন। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তাদের নিজস্ব তাগিদে সম্ভব হবে না।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলো সংকট কাটাতে বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বিপর্যয় আনবে এ সংক্রমণ। লকডাউন করে সব মানুষের খাদ্য ও চিকিৎসা দেয়ার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। তবে চরম ক্ষতি এড়াতে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। সরকার বিশেষ তহবিল গঠন করে বেকারত্বকালে ভাতা দিতে পারে।

এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখার স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ পরিশোধসূচি সহজ করতে পারে। বাজেটনীতি ও মুদ্রানীতিতে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়ানো যায়। এসব পদক্ষেপ নেয়া গেলে আর্থিক ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ বলেন, বাংলাদেশের সক্ষমতাও খুব সীমিত।

অনেক উন্নত দেশও যেখানে হিমশিম খেয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের সমস্যা হওয়ারই কথা। আমাদের সক্ষমতা যতটুকু, ততটুকুই আমাদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনার সংক্রমণ অর্থনৈতিক মন্দা এনেছে আরও আনবে। এটি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজেট ও মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে রপ্তানি তথা পোশাক খাতের সংকট চোখে পড়ছে। সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে এসএমই খাতে বিপর্যয় নামবে। হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এদের টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে বরাদ্দ দিতে হবে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ