মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল ২০২০

২৪ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

রাসেল মাহমুদ

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৬,২০২০, ০২:২৪

মার্চ ২৬,২০২০, ০২:২৪

করোনা রোধে মাঠে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

দেশব্যাপী করোনা ভাইরাসের বিস্তার বাড়ার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। ইতোমধ্যে ৩৯ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন পাঁচজন। স্পষ্টতই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারকরা। জাতীয় জীবনে নেমে এসেছে মহা এক সংকটময় মুহূর্ত।

আর এই কঠিন সময়ে দেশের প্রয়োজনে নিজের সামর্থ্য দিয়ে অবদান রাখছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পিছিয়ে নেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। অবদান রাখছেন করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধে।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস রোধে এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি এর প্রতিষেধক। আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

এ অবস্থায় সচেতনতা আর অল্প কিছু কাজ করলেই এ রোগের সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষ করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে এ ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা। পাশাপাশি জনসমাগম এড়িয়ে চলার প্রতিও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

করোনা ভাইরাস থেকে জাতিকে মুক্ত রাখার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও বিনামূল্যে বিতরণ করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সাংগঠনিকভাবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নও হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও বিনামূল্যে বিতরণ করেছে।

এছাড়া জনসচেতসতা তৈরির জন্য হ্যান্ডবিল ও লিফলেট বিতরণ করেছে অনেক শিক্ষার্থী ও সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা।

জানা গেছে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীরা করোনা প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফর্মুলা অনুসরণ করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও বিতরণ করেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দেয়ার জন্য নিজস্ব ল্যাবে এ হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান সৈয়দ কৌশিক আহমেদ বলেন, আমাদের বিভাগটা এখনো অনেক ছোট। তারপরও বৃহত্তর স্বার্থে আমরা এই উদ্যোগ গ্রহণ করি।

বিভাগ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের টাকা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করি এবং আজকে বিতরণ করেছি। এই উদ্যোগ করোনা প্রতিরোধে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের এসময়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় ফার্মেসি বিভাগের এই উদ্যোগ অনেক ভালো।

আমি ফার্মেসি বিভাগের সুচিন্তা এবং কাজকে সাধুবাদ জানাই। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষে লিফলেট বিতরণ করেছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রতি তারা ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ, দিন মজুর, রিকশাচালক, পথশিশুসহ পথচারীদের মাঝে লিফলেট বিতরণ করে। সেই সাথে সবাইকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে কিভাবে নিজেকে দূরে রাখা যায় সে ব্যাপারেও পরামর্শ প্রদান করেন।

এছাড়াও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে কিভাবে হাত পরিস্কার করে করোনা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে হয় তা বুঝিয়ে বলছেন জনসাধারণকে।

এই উদ্যোগের সাথে জড়িত একজন শিক্ষার্থী বলেন, এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকতে সবাইকে সচেতন করতেই আমাদের এই উদ্যোগ।আমরা দেশের সাধারণ জনগণ যারা এই ভাইরাস সম্পর্কে না জেনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষেই এই উদ্যোগ গ্রহণ।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে মুক্ত থাকার অন্যতম উপকরণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছে কবি নজরুল সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

২৩ মার্চ কলেজের রসায়ন বিভাগের পরীক্ষাগারে নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।

রসায়ন বিভাগের প্রধান প্রফেসর মাহমুদ ও প্রভাষক সেলিম আল মামুনের নেতৃত্ব রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় এ কাজ সম্পন্ন হয়।

রসায়ন বিভাগের প্রধান প্রফেসর মাহমুদ বলেন, বাজারের হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চড়া মূল্য থাকায় সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা এ কাজের উদ্যোগ নিয়েছি।

আর্থিক এবং উৎপাদন স্বল্পতার কারণে প্রাথমিকভাবে আমরা এগুলো কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থীদের, আশ-পাশে গরিব জনগণের মাঝে সরবারহ করবো।

তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেলে আমরা আরও বেশি পরিমাণ প্রস্তুত করে সাধারণ জনগণের মাঝে বিতরণ করবো।

পরে বোতলজাত করা স্যানিটাইজারগুলো কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং আশপাশের সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করেন কলেজের অধ্যক্ষ আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার।

করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রতি ফার্মেসি বিভাগের পরীক্ষাগারে তাদের নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফর্মুলায় প্রাথমিকভাবে ১০০ মিলির ১০০টি হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করা হয়েছে।  বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় দু-একদিনের মাঝেই আরও এক হাজার তৈরি করা হবে।

ফার্মেসি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মোছা. রোজিনা পারুল জানান, আমরা আপাতত স্বল্প পরিসরে এটা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আশপাশে যারা অর্থাভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে পারে না তাদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে এটি তৈরি করা হয়।

জীবাণুনাশকটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এটি প্রস্তুত করেছি। কিন্তু এটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেদের ফান্ড থেকে।

প্রথমদিন আমরা ২০০ বোতল তৈরি করেছি। যার জন্য খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। নিজেদের সাধ্যমতো ও ফান্ড পেলে এটি আরও বেশি প্রস্তুত করে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, করোনা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করছে।

শিক্ষকরা যখন আমার কাছে এসেছিলেন তখন আমি করোনা প্রতিরোধে কিছু করা যায় কিনা দেখতে বলেছি। জীবাণুনাশকটি তৈরি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সবসময় সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানান।

এসব বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা করোনা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে তারা বলেছেন, জাতির এই ক্রান্তিকালে দেশের মানুষের প্রয়োজনে তারা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পেলে নিজেদের সেবক হিসেবে নিয়োজিত করবেন।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ