রবিবার ১২ জুলাই ২০২০

২৮ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

আসাদুজ্জামান আজম

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৯,২০২০, ০১:০৯

এপ্রিল ০৯,২০২০, ০১:০৯

বোরো ধান নিয়ে বিপাকে সাত জেলার কৃষক

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মরণঘাতক কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বোরো ধান আবাদে। জমিতে শত শত একর পাকা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের ৭ জেলার কৃষক। শ্রমিক এবং ধান কাটার মেশিন সংকটে পড়েছেন তারা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধান কাটতে না পারলে অকাল বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলে ফসল তলিয়ে যাবে।

সরকারের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলার কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা। তথ্য মতে, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সিলেটের একাংশের অন্তত আড়াইশ হাওরে বোরো আবাদ হয়।

দেশের মোট বোরে ফসলের প্রায় ১৯ শতাংশ আসে এসব হাওর থেকে। গত দুই বছর অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে কৃষকরা বোরো ধান ঘরে উঠাতে পারেননি। এতে একফসলি জমির ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। এবার চড়া সুধে ঋণ নিয়ে আবার সেই জমিতে আবাদ করেন।

এবার যদি ফসল ঘরে উঠাতে না পারেন তবে জমি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। স্থানীয় কৃষকরা জানান, বোরো ফসল উঠিয়েই ধান বিক্রি করে ধান কাটার শ্রমিক, মাড়াই এবং ঋণ পরিশোধ করতে হয়। এবার করোনার কারণে ধানের দাম আরও কমে যাওয়া শঙ্কা করছেন তারা।

এমনটা যদি হয়, তবে কৃষকরা এবারো ঋণের বোঝা কমাতে পারবেন না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র মতে, দেশের খাদ্য সরবরাহের বড় অংশটি নিশ্চিত হয় বোরোর ধানের মাধ্যমে। সরকারি গুদামে মজুদের মূল অংশটিও নির্ভর করে এ ফসল থেকে। এবার বোরোতে দুই কোটি টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে মূলত বোরো কাটা এখনো পুরোদমে শুরু করা যায়নি। এবার করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে। কিশোরগঞ্জ ইটনা ধইলং হাওরে প্রায় দুই হাজার মণের ফসল করেছেন বাচ্চু মিয়া।

তিনি জানান, পুরো ধান কাটতে আমার প্রয়োজন ৪০ জন শ্রমিক প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ১২ জনকে ম্যানেজ করতে পেরেছি। ইতোমধ্যে বিআর ২৮ ধান পেকে গেছে।

এক সপ্তাহ মধ্যে এ ধান না কাটতে না পারলে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। বাকি জাতের ধান আগামী ১০ দিনের মধ্যে কেটে শেষ করতে হবে। না হয় হাওরে পানি চলে আসবে। এখন কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ধান কাটার কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার দেয়া হয়েছে। ধান কাটার পুরো সময়টুকুতে হাওরে উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, নিকলী এবং তাড়াইল ইউএনও এবং কৃষি কর্মকর্তারা সমন্বয় করে কাজ করবেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা রিপার ও হারভেস্টার কিনেছি। যন্ত্রপাতিগুলো হাওরে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন ১৮০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার সরবরাহের বরাদ্দ দেয়া হয়।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে হাওরাঞ্চলে ৩৬২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও এক হাজার ৫৬টি রিপার সচল রয়েছে। এ ছাড়াও পুরনো মেরামতযোগ্য ২২০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ৪৮৭টি রিপার অতি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চার ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, সারা দেশে উৎপাদিত ধানের ১৮ শতাংশের বেশি আসে হাওরাঞ্চল থেকে। কিন্তু কোনো রকম বন্যা হলেই ফসলগুলো তলিয়ে যায়। এতে পথে বসতে হয় কৃষকদের।

এবার করোনা ভাইরাসের কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হাওর নিয়ে কাজ করেন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম নামে একটি সংগঠন।

সংগঠনটির গবেষণা সেল প্রধান আব্দুল আলীম বলেন, এবার করোনা ভাইরাস বোরো ফসলের তুলতে মারাত্মক সমস্যা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধান কাটতে না পারলে পানিতে তলে যাবে। হাওরে পানি প্রবেশ করতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ দিন। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই সময়ের মধ্যেই ধান কেটে ফেলা সম্ভব।

কৃষি সম্প্রসারণের মহাপরিচালক ড আবদুল মঈদ লেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ৫০ পার্সেন্ট পরিশোধের মাধ্যমে ধান কাটার মেশিন দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ধান কাটার শ্রমিক সংকট জটিল আকার দেখা দিলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কৃষি সচিব নাসিরুজ্জামান বলেন, ধান কাটার শ্রমিক কিছুটা সমস্যা হতে পারে। সে জন্য এবার আমরা অতিরিক্ত ধান কাটার যন্ত্রপাতি দিয়েছি।

অন্যান্য জেলা থেকে ধান কাটতে আসার শ্রমিকরা যেনো সমস্যায় না পড়েন সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে হাওর এলাকায় শ্রমিকরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেই উদ্যোগ নেয়া হবে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ