বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০

২৪ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

এপ্রিল ১০,২০২০, ০২:১৯

এপ্রিল ১০,২০২০, ০২:৩৬

সংক্রমণ এড়াতে বাড়ছে স্বেচ্ছা লকডাউন!

  • সচেতন হচ্ছে মানুষ সংক্রমণ এড়াতে নানা পদক্ষেপ
  • ঢাকায় ৪২ এলাকায় সারাদেশে ২৬৭ টি উপজেলায় স্বেচ্ছা লকডাউন
  • প্রশাসনের উদ্যোগ নেই বলেই স্বতঃস্ফূর্ত লকডাউন
  • স্বেচ্ছা লকডাউনে দিনাজপুরের ১৭০ পরিবার

করোনাভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে পুরো বিশ্ব। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের নেই কোনো প্রতিষেধক। উপায় একটাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।

শুরুতে এ নিয়ে সচেতন হওয়ার জন্য নানা নির্দেশনা দেয়া হলেও খুব একটা আমলে নেননি নাগরিকরা। তবে এখন ভয়াবহতা বুঝতে শুরু করেছেন শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের লোকেরাও। ফলে কোথাও একজন রোগী শনাক্ত হলে পুরো বাসা বা এলাকা লকডাউন করে দিচ্ছে প্রশাসন।

তাই ঝুঁকি এড়াতে নিজেরাই অঘোষিত লকডাউন শুরু করেছেন। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ সদস্যরা সাধারণ মানুষকে ঘরে ফেরাতে যেখানে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় স্বেচ্ছায় লকডাউনে এগিয়ে আসছেন স্থানীয় তরুণরা।

পাড়া, মহল্লা বা গ্রামে রাস্তা বন্ধ করে টাঙিয়ে দেয়া হচ্ছে হাতে লেখা নোটিশ। অনুরোধ করা হচ্ছে অপ্রয়োজনে যেন অন্য এলাকার লোকজন যেন এই এলাকায় না আসেন। একইভাবে স্থানীয় লোকজনকে জানানো হচ্ছে যেন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের না হন।

জানা যায়, ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জেলাভিত্তিক লকডাউনের দিকে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে ২৫টি জেলা লকডাউন করেছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন।

আর গতকাল থেকে বেশ কয়েকটি জেলায় ঢোকা ও বের হওয়া প্রায় বন্ধ করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি বুঝে জেলাভিত্তিক লকডাউন আরো বাড়বে। করোনার ছোঁয়া থেকে জেলাগুলোকে বাঁচাতেই স্থানীয় প্রশাসন এমন উদ্যোগ নিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর অনেকেই নিজেদের উদ্যোগে তাদের বাসা-বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছেন। আবাসিক ভবনে অপরিচিত, গৃহকর্মী, স্বজন কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। বাইরেও কাউকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না জরুরি প্রয়োজন ছাড়া।

শুধু ঢাকা নয় ঢাকার বাইরেও কিছু কিছু এলাকা এমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনসাধারণ এই পথে হাঁটছেন। ঢাকা শহরের অন্তত ৪২ টি এলাকায় চলছে স্বেচ্ছা লকডাউন। সারাদেশে ৬৭ টি উপজেলায় গ্রামবাসীর স্ব উদ্যেগে লকডাউন করা হয়েছে। খুব বেশি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বাসা বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জেলাভিত্তিক লকডাউনের বাইরেও যেসব উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন ও গ্রামে করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে বা করোনা উপসর্গ রয়েছে সেসব জনপদকে এলাকাবাসী নিজেরাই লকডাউন করে দিচ্ছেন।

এভাবে দেশজুড়ে শতাধিক গ্রামকে এলাকাবাসী লকডাউন করেছে। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম আগে থেকেই অঘোষিত লকডাউনে রয়েছে।

বনশ্রী আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, রাত আটটায় এ এলাকা যতটা নীরব, আগে রাত ১২ টাতেও এ নীরবতা দেখেননি তারা। প্রতিটি বাসার গেটে তালা। বাসায় আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোরতা। চুরি ছিনতাইয়ের কথা বিবেচনায় রাস্তায় রাখা হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা।

এই এলাকার বাসিন্দা সিপন তালুকদার বলেন, বাসা থেকে বলে দেয়া হয়েছে, যে কোনো আত্মীয় স্বজন যেন বাসায় না আসে। এবং তাদের কেউ বলা হয়েছে যে আমরাও আপনাদের বাসায় যাবো না। তাই সবসময় গেট লক করে রাখি।

ঢাকার পাশাপাশি একই চিত্র বন্দর নগরী চট্রগ্রামেও। চট্টগ্রাম মহানগরসহ উপজেলার বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লায় ‘স্বেচ্ছা লকডাউনে’র হিড়িক পড়েছে।

বিভিন্ন গ্রামের পাড়া-মহল্লার রাস্তাঘাটের প্রবেশমুখে বাঁশ-গাছের বেড়া দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টির মাধ্যমে অঘোষিত লকডাউন দেওয়া হচ্ছে। সামনে লিখেও দেওয়া হচ্ছে ‘লকডাউন’।

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও ফটিকছড়ি, মিরসরাই, সীতাকুণ্ড উপজেলা এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলাগুলোতে এমন লকডাউনের চিত্র চোখে পড়ছে। চট্টগ্রাম নগরীর হামজারবাগ, আল ফালাহ গলি, আগ্রাবাদ ও হালিশহরেও বেশ কিছু গলিতে বাসিন্দাদের উদ্যোগে ‘লকডাউন’ লিখে পথ আটকে দেওয়া হয়েছে।

লকডাউন করা হয়েছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর, ঘাটাইল ও মির্জাপুরের বেশ কয়েকটি গ্রাম। করোনা সক্রামন এড়াতে গ্রামের বাসিন্দার নিজেরাই স্বেচ্ছায় লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে এসব লকডাউন যাওয়া এলাকায় করোনাভাইরাসের উপসর্গ নেই কারো, নেই কোনো জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টের বিশেষ কোনো রোগী। তবুও করোনা সতর্কতায় স্বেচ্ছায় পুরো গ্রামকে লকডাউন করেছেন করেছেন তারা। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি ছাড়া বহিরাগতদের এলাকায় অপ্রয়োজনে প্রবেশ না করার অনুরোধ করা হয়েছে।

ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চুয়াডাঙ্গার একটি এলাকা ‘স্বেচ্ছায় লকডাউন’ ঘোষণা করেছে স্থানীয়রা। চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের কোর্টপাড়া এলাকার একাংশ বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে জনবিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। তবে ওই এলাকার কেউ করোনা শনাক্ত হয়নি।

ওই এলাকার প্রবেশদ্বার ও বের হওয়ার পয়েন্টে বাঁশ দিয়ে আটকে রেখে গতিরোধ করা হচ্ছে বহিরাগত লোকজনকে। তেমনি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ওই মহল্লার কাউকে বাইরে বের না হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

‘আসুন আমরা নিজে সচেতন হই, পরিবার এবং মহল্লাবাসিকে সচেতন করি’ আপনার সচেতনতায় আমরা সম্মিলিতভাবে করতে পারি ভয়াবহ অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এ এলাকায় প্রবেশ বা বের না হওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে’ এ ধরনের বিভিন্ন উক্তি দিয়ে দেয়াল লেখনের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে।

নিজ উদ্যোগে ‘লকডাউন’ করা লোকজন বলছেন, একজন করোনা আক্রান্ত হলে পুরো এলাকা বা ভবন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আসা যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হয়।

তাই আগেভাগেই নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে যাতে করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকা যায়। কোথাও কোথাও এলাকার তরুণদের দিয়ে অনানুষ্ঠানিক কমিটি করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দোহাকুলা ইউনিয়নের বোয়ালিয়া ও নওয়াপাড়া গ্রামকে সোমবার লকডাউন ঘোষণা করেছে স্থানীয় যুবকরা। গ্রামের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখতে নিজেরাই লকডাউনের ঘোষণা করেন তারা।

জানা গেছে, গ্রাম দুটির ছয়টি প্রবেশ পথে বাঁশ দিয়ে ফটক তৈরি করে বাধা দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রামজুড়ে ছিটানো হয়েছে জীবাণুনাশক। প্রবেশ পথে রাখা হয়েছে হ্যান্ডস্যানিটাইজার। বাইরের এলাকার কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না তাদের গ্রামে। আবার যৌক্তিক কারণ ছাড়া কাউকে গ্রাম থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না।

ফরিদপুরের সঙ্গে সব জেলার যোগাযোগ বন্ধ : বিভিন্ন থানা ও গ্রামের লোকজন নিজ উদ্যেগে তাদের এলাকা লকডাউন করেছে। গ্রামে গ্রামে চলছে মাইকিং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন তরুণেরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর থানার কৈজুরী ইউপি চেয়ারম্যান আবু মোতালেব তরফদার বলেন, প্রতিদিন বাইরের লোকজন এই দুই গ্রামে এসে ভিড় করছে। আড্ডাবাজি করছে। এটা আমাকে জানায় কয়েকজন যুবক। আমি তাদেরকে বলেছি বাইরের লোকজন প্রবেশ বন্ধ করে দিতে।

কৈজুরী গ্রামে ছয়টি প্রবেশ পথে বাঁশ দিয়ে ফটক তৈরি করে বাধা দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গ্রামজুড়ে ছিটানো হয়েছে জীবাণুনাশক। প্রবেশ পথে রাখা হয়েছে হ্যান্ডস্যানিটাইজার। বাইরের এলাকার কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না তাদের গ্রামে। আবার যৌক্তিক কারণ ছাড়া কাউকে গ্রাম থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না।

এদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে গেলো মঙ্গলবার থেকে ফরিদপুর জেলার সঙ্গে অন্য জেলার সব ধরনের পরিবহন যোগাযোগ বন্ধ করা হয়েছে জানিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ফরিদপুর জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক অতুল সরকার স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রশাসনের অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো প্রকার যানবাহন এ জেলা হতে বাইরে যাবে না এবং বাইরে থেকে এ জেলায় প্রবেশ করবে না।

অত্যাবশ্যকীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দোকান সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। অন্যান্য সব দোকানপাট, সাপ্তাহিক হাট, প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিবহন পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে ওষুধের দোকান, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান যথারীতি খোলা থাকবে।

জানতে চাইলে অতুল সরকার বলেন, আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমারসংবাদ/এসআর/এআই