বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০

২৪ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

রফিকুল ইসলাম

এপ্রিল ১২,২০২০, ০৪:০০

এপ্রিল ১২,২০২০, ০৪:০০

করোনায় লুটপাটে ব্যস্ত জনপ্রতিনিধিরা

 

করোনাভাইরাসে অসহায় গোটা দেশ। বৈশ্বিক এ মহামারি মোকাবিলায় নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে মধ্যে খাদ্য সহায়তা প্রদান করছে সরকার। জেলা-উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব ত্রান সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। তবে অসহায় মানুষের এসব ত্রান সামগ্রি লুটপাতে ব্যস্ত হয়েছে এক শ্রেনীর চক্র, যাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধ ও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের জড়িত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে ত্রাণ চুরির ঘটনা। আর এই সকল ত্রাণ চুরি সাথে যুক্ত প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা। অথচ ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতি বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন দলটির দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় গ্রেপ্তার হয়েছে বেশকজন প্রভাবশালী নেতা। দায়িত্বশীল নেতাদের এমন আচরনে ম্লান হচ্ছে সরকারের সব অর্জন। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের হাই-কমান্ড। তারা বলছে, করোনায় অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষের ত্রাণ লোপাট কারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ত্রাণ সহায়তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সতর্কতা কাজে আসছে না। গত কয়েক দিনে সারাদেশে উদ্ধারকৃত সরকারি চালের পরিমান তার প্রমান মেলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সহযোগিতা যেন সবাই সমান ভাবে পায়। এ জন্য তালিকা তৈরি করে ত্রাণ সামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। এই কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। সরকার প্রধানের এমন বক্তব্যের পরও থেমে নেই ত্রাণ লোপাটের ঘটণা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। অভিযোগ ওঠা জনপ্রতিনিধি বিষয়ে তথ্য প্রমান সহ প্রতিবেদন চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। গতকাল শনিবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয় এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রেরণ করেছে। ত্রান সহায়তা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও ফৌজধারী মামলা করা হবে বলে নির্দেশনায় বলা হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে সরকার তিন দফায় বাড়িয়েছে সাধারণ ছুটি। দীর্ঘদিন কাজকর্ম না থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছে দিনমুজুর ও শ্রমজীবী মানুষ। শ্রমজীবী এই সকল মানুষের পাশে দাড়িয়েছে প্রশংসা কুড়িয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। আবার ত্রাণ বিতরণে কিছুটা ভিন্নচিত্র রয়েছে। দেশের বেশকিছু স্থানে ইউপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা ত্রাণ বিতরণের নামে আত্মসাৎ করছে। কিন্তু ওই সকল অঞ্চলের দিনমুজুর মানুষের মাঝে বাড়ছেই ত্রাণের হাহাকার।

তথ্যমতে, গতকাল শনিবার জামালপুরে সদরের নরুন্দি বাজার এলাকায় তুলশীরচর ইউনিয়নের মানিকারচর ওয়ার্ডের ওএমএস ডিলার তোফাজ্জল হোসেনের গুদামে অভিযান চালায় স্থানীয় প্রশাসন। এ সময় তার গুদাম থেকে অবৈধভাবে রাখা ১২৬টি বস্তায় ৭ হাজার ৪৪০ কেজি চাল জব্দ করে ওএমএস ডিলার তোফাজ্জল হোসেনকে আটক করা হয়। আটক তোফাজ্জল হোসেন তুলশীরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। এ দিন একই বাজারে উপজেলা যুবলীগ সদস্য রানা মিয়া খোকার গুদামে অভিযান চালিয়ে ২১৬ বস্তা ওএমএস এর সরকারি চাল জব্দ করেছে পুলিশ। অথচ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এই জেলার কাচারীপাড়ায় কর্মহীন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষ ত্রাণের দাবিতে নিজ নিজ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। গতকাল এই কর্মসূচি পালন করেন তারা। এসময় ভুক্তভোগীরা জানান, কোন কাজ না থাকায় তারা বাড়িতে অবস্থান করছেন, কিন্তু কোন ত্রাণ না পাওয়ায় গত ১৫ দিন যাবত অনাহার-অর্ধাহারে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় রোয়াইলবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে স্থানীয় ওএমএসের ডিলার আমিনুর রহমান শাকিলের বরাদ্দ ৯০ বস্তা চাল ভাঙ্গারির দোকান থেকে জব্দ করেছে পুলিশ। পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলায় চাল আত্মসাতের অভিযোগে আবুল কালাম সুতার নামের এক ইউপি সদস্য ও ওই চোরাই চাল ক্রেতা চক্রের সদস্য গোলাম মোস্তফাকে আটক করা হয়। গত শুক্রবার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায় ২৫ বস্তা চাল উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। একই দিনে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুরে চাল কালোবাজারে বিক্রি করে হাতেনাতে ধরা পড়েন আবুল কাশেম নামের এক ডিলার। একই সাথে বৃহস্পতিবার শেরপুরে ৩৩ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। উপজেলার চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের পোড়ার দোকান এলাকায় চৌকিদার জহুরুল হকের বাড়ি থেকে এ চাল উদ্ধার করা হয়। কুমিল্লার দেবিদ্বারে দরিদ্রদের ১০ টাকা কেজি চাল আত্মসাতের অভিযোগে একজনের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। ওই ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান মোল্লাকে আটক করা হয়। পীরগঞ্জের গুঞ্জিপাড়ায় কালোবাজারে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ন্যায্যমূল্যের চাল পাচারকালে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় ৯০ বস্তা চালসহ একটি ট্রাক্টর জব্দ করা হয়েছে। পরে ডিলারের গোডাউনের ৬৫ বস্তা চালসহ চাবি ও মাস্টাররোল জব্দ করা হয়। গত বৃহস্পতিবার বগুড়ার সোনাতলায় ৫০ বস্তা চালসহ গ্রেফতার হন স্থানীয় কৃষক লীগ নেতা। গত বুধবার রাতে রানীনগরে একডালা ইউনিয়নের জলকৈ গ্রামে শাহীনের বাড়ি থেকে ৯ বস্তা চাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার ফরিদপুরের সালথায় থেকে ১৪ বস্তা চাল জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ইউপি সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে চাল আত্মসাৎএর অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতারা।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক আমার সংবাদকে বলেন, ত্রাণে কোনো ধরণে অনিয়ম সহ্য করা হবে না। এই বিষয়ে কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছেন আমাদের সভানেত্রী। তারপরও এই ধরণের কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দীন নাছিম বলেন, কোনো দুর্নীতিবাজদের স্থান আওয়ামী লীগের নেই। এ বিষয়ে আমরা জেলা উপজেলা নেতাকর্মীদের কঠোর নির্দেশণা দিয়েছি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, করোনা রোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই মুহূর্তে এই ধরণের অভিযোগে আমরা ক্ষুব্ধ।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, এই করোনা ভাইরাসের মহামারী চলাকালে অসহায় মানুষদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত চাল আত্মসাত করে তারা মানুষ না। এদের মানুষ বলা যায় না, এরা মানুষরূপী জানোয়ার। এদের প্রতি আমি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করছি ও নিন্দা জানাই।

আমারসংবাদ/জেআই