বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০

২৪ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

এপ্রিল ১৬,২০২০, ০২:১৪

এপ্রিল ১৬,২০২০, ০২:২৬

থুথু আইন আছে প্রয়োগ নেই!

 *হাঁচি-কাঁশি থুথুতে ছড়ায় করোনা 
*আইন থাকলেও শাস্তি যতসামান্য
*আইন প্রয়োগে উদাসীনতায় বাড়ছে না জনসচেতনতা
*প্রশাসন আইনটি প্রয়োগে কঠোর হলে সক্রামন কমানো সম্ভব মত বিশেষজ্ঞদের

করোনা ভাইরাস। বৈশ্বিক মহামারিতে পরিণত হওয়া ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে পুরো বিশ্ব। সংক্রামণ এড়াতে সচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে গণমাধ্যগুলোতে। ভাইরাসটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির থুথু, হাচি, কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। এতে আক্রান্ত ব্যাক্তি সংস্পর্শে এলে সুস্থ ব্যক্তিও আক্রান্ত হয়।

ফলে থুথু শিষ্টাচার মেনে চলতে মানুষকে দেয়া হচ্ছে নানা পরামর্শ। থুথু, কফ, হাঁচি-কাশির মাধ্যমে করোনাভাইরাসসহ সার্চ, মার্স, যক্ষা, শ্বাসকষ্ট, ব্রংকাইটিস, হাঁপানি বা অ্যাজমা, কাশি, মাথাব্যথাসহ বহু রোগের বিস্তার ঘটায়। ফলে দেশে যত্রতত্র থুথু ফেলানো প্রতিরোধে রয়েছে আইন। যা অমান্য করলে রয়েছে শাস্তির ব্যবস্থাও।

কিন্তু আইনটি কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে এ আইনের নেই কোনো প্রয়োগ। এমনকি সঠিক প্রচারণার অভাবে আইনটি সম্পর্কে জানেন না সাধারণ মানুষও। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবেও থেমে নেই সাধারণ মানুষের যততত্র হাঁচি কাশি ও থুথু ফেলা। থুথু আইনের শাস্তির বিষয়ে জনসাধারণকে অবহিত করতে পারলে করোনা সংক্রামণ কিছুটা কমে আসবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

সেইসাথে আইন থাকলে তার প্রয়োগ না হলে সেই আইনে বিভ্রান্তি ছড়ায় বলেও মনে করেন তারা। থুথু আইন শুধু বাংলাদেশে নয়, অনেক দেশেই যত্রতত্র থুথু ফেললে শাস্তির বিধান রয়েছে।

কিছু দেশে রয়েছে কঠোর শাস্তির নজিরও। যেমন সৌদি আরবে রাস্তায় থুথু ফেললে ১০০ থেকে ১৫০ রিয়াল জরিমানা করা হয়। গঙ্গায় বর্জ্য বা থুথু ফেললে তিন বছর কারাদণ্ড বা ১০ হাজার রুপি জরিমানার বিধান রেখে ভারতে ২০১১ সালে আইন করা হয়।

আর ২০১৫ সালে মুম্বাইয়ের রাস্তায় থুথু বা পানের পিক ফেলার দায়ে পাঁচ হাজার রুপি জরিমানা ও ১ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত সরকারি দফতর ও রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কারের বিধান রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের থুথু আইন এত কঠোরও নয় তবে আইন প্রয়োগে উদাসীনতা থাকায় এ বিষয়ে জনসচেতনতা তেমন একটা বাড়ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখন সময় এসেছে করোনাসহ অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে থুথু আইনটি প্রয়োগ ও ব্যবহার অতি জরুরী। সবার আগে প্রশাসনের উচিত থুথু শিষ্টারচার মেনে চলার জন্য যে দেশে আইন আছে সেটা সম্পর্কে মানুষকে জানানো।

তবে থুথু আইনটি শ্রম আইনের অংশ না করে অতি দ্রুত পৃথক একটা স্বতন্ত আইন করার দাগিত দেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের থুথু আইনের বিষয়টিও স্বরন করে দেন তারা।

এদিকে পরিবেশবাদিরা মনে করেন, অন্য আইনের সাথে গুলিয়ে না ফেলে। যত্রতত্র থুথু ফেলা নিষিদ্ধ করে পৃথক আইন এবং জরিমানা করার বিধান রাখাতে হবে।

পাশাপাশি জনগণকে যেখানে সেখানে প্রকাশ্যে কফ থুথু ফেলা বন্ধ করার বিষয়ে সচেতনতামূলক আন্দোলন গড়ে তোলার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

এমনকি কফ থুথু যেখানে সেখানে না ফেলে রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে ফেলতে উৎসাহিত করতে পরামর্শ দেন পরিবেশবাদিরা।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আনজীম আল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘যেখানে সেখানে থুথু ফেলার নিষেধাজ্ঞা বা পাবলিক পরিসরে সিগারেট খাওয়া নিয়ে আইন থাকলেও তার কোনও প্রয়োগ নেই। যদি কোনো আইনের প্রয়োগ না থাকে তখন সেটি থাকা না থাকা সমান হয়ে যায় এবং এটা বিভ্রান্তি ছড়ায়।’

এই আইন ও ধারাগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আইনটি যেমন আছে, তার বাস্তবায়ন দেখতে পাওয়াটা জরুরি। আবার আইনটি যদি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে থাকে, তবে তার অস্তিত্ব থাকা উচিত না।’

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় জনসমক্ষে থুথু ফেলাকে। যেখানে সেখানে যখন তখন কফ থুথু ফেলা শুধু বদ অভ্যাসই নয় এর কারণে আর্থিক ও সামাজিকভাবে একটা দেশ অনেক ক্ষতির শিকার হয়।

থুথুর ওপর মশা বা মাছি বসে। পরে ওই মশা বা মাছি খাবারের ওপর বসলে জীবাণু ছড়ায়। থুথুর মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগের জীবাণু ছড়ানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। থুথু শুকিয়ে বাতাসের মাধ্যমে জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

ফলে মানুষ শ্বসনতন্ত্রের বিভিন্ন রোগসহ যেমন ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা ইত্যাদিসহ ভাইরাসজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয় বলে চিকিৎসকদের অভিমত।

বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিষেশজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘করোনার কোনও ভ্যাকসিন নাই, ওষুধ নাই। তাই একে প্রতিরোধ করতে হবে। এছাড়া আর উপায় নাই।

আর প্রতিরোধ করতে হলে যেখানে-সেখানে থুথু ফেলা যাবে না। সর্দি-কাশি হলে রুমাল ও টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। আর অবশ্যই সাবান দিয়ে রুমাল ধুয়ে ফেলতে হবে।

টিস্যু ব্যবহার করলে ব্যবহারের পর তা ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলতে হবে, যেন টিস্যু থেকে জীবাণু না ছড়াতে পারে। থুথু আইন মেনে চলতে হবে সবাইকে। তবেই এটা ছড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর ৬০(১) ধারায় বলা আছে যে, ‘প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের সুবিধাজনক স্থানে পর্যাপ্ত সংখ্যক আবর্জনা ফেলার বাক্স ও পিকদানী থাকতে হবে এবং সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।’

৬০(২) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কোনও প্রতিষ্ঠানের আঙিনার মধ্যে কেউ বাক্স ও পিকদানী ছাড়া ময়লা বা থুথু ফেলতে পারবেন না।

৬০(৩) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘এই বিধান লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

এছাড়া রাজশাহী মহানগরী পুলিশ আইন-১৯৯২ এর ৮৬ ধারায় উল্লেখ আছে, কোনও ব্যক্তি সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নোটিশ অমান্য করে ধূমপান করলে বা থুথু ফেললে তাকে একশ’ টাকা জরিমানা করা যাবে।

তবে সিলেট মহানগরী পুলিশ আইন-২০০৯ ও বরিশাল মহানগরী পুলিশ আইন-২০০৯ অনুযায়ী তিনশ’ টাকা জরিমানা করা যায়।

তবে দ্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স, দ্য চিটাগং মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স এবং দ্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্সে একশ’ টাকা জরিমানা করার বিধান আছে।এছাড়া সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন-২০১৮।

এ আইনের ২৫ (২) বিধান মতে, কেউ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বাধা দিলে বা নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানালে তাকে তিন মাস কারাদণ্ড, অনূর্ধ্ব ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে।

আর ২৬ এর উপধারা ২ মতে, যদি যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা থাকার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য দেন তাহলে ওই ব্যক্তির অনুরূপ কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তাকে অনূর্ধ্ব ২ (দুই) মাস কারাদণ্ড, বা অনূর্ধ্ব ২৫ (পঁচিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ধারা-১৪ তে বলা আছে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারীরা যদি মনে করে, কোনো সংক্রমিত ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করা না হলে তার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারে, তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে অন্য কোনো স্থানে স্থানান্তর বা জনবিচ্ছিন্ন করা যাবে।

এ বিষয়ে সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, গবেষক, আইনগ্রন্থ প্রণেতা সিরাজ প্রমানিক বলেন, একটু খেয়াল করলে দেখা যায় রাস্তায় চলতে থাকা পথচারী, দাঁড়িয়ে বা অলস বসে থাকা অনেক মানুষকেই রাস্তা, ফুটপাত বা মার্কেটের সামনে অবলীলায় থুথু, কফ, পানের পিক ফেলে। দৃশ্যটি বাংলাদেশের যে কোন বড় শহরের বাসিন্দাদের জন্য স্বাভাবিক।

যেখানে সেখানে যখন তখন কফ থুথু ফেলা বদ অভ্যাস বলে মনে করা হয় কিন্তু এই অভ্যাসের কারণে আর্থিক ও সামাজিকভাবে একটা দেশ অনেক ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

তাছাড়া কফ থুথু শুধুমাত্র অপরিচ্ছন্নতা বা দেখতে নোংরা লাগার বিষয় না এটি পরিবেশেও মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। ব্যর্থতা যে আমরা অনেক আইনই প্রয়োগ করতে পারি না। যখন সবাই আইন অমান্য করেন তখন আইন প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে ওঠে।

আমারসংবাদ/এসআর/এআই