বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০

২৪ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

মে ১৯,২০২০, ০৩:৪০

মে ১৯,২০২০, ০৩:৪২

মহামারিতেও নারীর মুক্তি নেই!

*লকডাউনে নারীর সঙ্গে বাড়ছে পুরুষ নির্যাতন
*এপ্রিলে ২৭ জেলায় ৪২৪৯ নারী নির্যাতিত: এমজেএফ
*২ মাসে ৯৯৯ নাম্বারে ৫০১৯ ভুক্তভোগীর অভিযোগ
*কর্মহীন হয়ে সারাক্ষণ ঘরে থাকায় বাড়ছে সহিংসতা মত বিশেষজ্ঞদের

ফেরদৌসি বেগম। বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালে। গত ৫ মে রাতে স্বামী রফিকুল ইসলাম বেধড়ক মারধর করেন এই গৃহবধূকে। পাশবিক নির্যাতনে যৌনাঙ্গসহ কোমরের নিম্নাংশে থেতলে দেয়া হয়। এমন ভয়াবহ নির্যাতনে অচেতন হয়ে পড়েন ফেরদৌসি।

পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। স্বামীর ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন দুই সন্তানের জননী। পরে নির্যাতনের ঘটনায় ভূক্তভোগী এই নারী বুধবার বাদী হয়ে ত্রিশাল থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নারী। কিন্তু পুলিশ অভিযুক্তকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

নাজিরা ইসলাম। স্বামী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তারিক -উজ-জামান। ওএসডি হয়ে বর্তমানে সংস্থাপণ মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত আছেন। অপরাধ নির্মূল করাই যার দায়িত্ব। আইনের রক্ষকও বটে।

প্রায়শই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সাজা দেন অপরাধীদের। অথচ তিনিই এখন আইনের চোখে অপরাধী। কারন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যৌতুকের দাবিতে তিনি প্রায়ই স্ত্রীকে মারধর করেন।

গত ১০ করোনার মধ্যেই স্ত্রীকে পিটিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়েছেন। নিজ স্বামী কর্তৃক প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যানত সহ্য করতে না পেরে গত ৯ মার্চ মামলাও ঢুকে দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে।

শুধু ফেরদৌসি ও নাজিরাই নয় করোনা ভাইরাস লকডাউনে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা।কেউ কেউ লকডাউনে ঘর থেকে বের হতে না পেরে বিষন্নতায় সহিংস হচ্ছে পরিবারের সদ্যসদের উপর।

ফলে নিজ ঘরের নারী ও শিশুরাই এই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন৷ এমনকি মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়েও স্বামীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন স্ত্রী৷ কিছু জায়গায় আবার স্ত্রীর হাতে স্বামী নির্যাতনের খবরও আসছে গণমাধ্যমে।

অপরদিকে বাল্যবিবাহও থেমে নেই৷ প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের উপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ছাড়াও ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে আসছে। বাদ যাচ্ছেনা বৃদ্ধরাও। মহামারীর মধ্যেও পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, ধর্ষণ, অপহরণ ও যৌন হয়রানির মত ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়তই।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও শালিস কেন্দ্র, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর পর্যবেক্ষণ এমনকি জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিবেদনও বলছে, এসময় পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কথা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কর্মহীন হওয়া, সারাক্ষণ ঘরে থাকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর করোনায় থাকা, পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে নারী নির্যাতন ও বাল্য বিবাহের মতো ঘটনা।

তারা বলছেন, মুলত বাসা থেকে বাইরে বেরুতে না পারার মানসিক চাপ,বাড়তি খরচ সবমিলে মানুষ দিশেহারা। তাই অনিশ্চিয়তা, হতাশা , একঘেয়েমি জীবন মানুষকে কর্তৃত্বপরায়ণ, খিটখিটে, উগ্রমেজাজী করে তুলেছে। ফলে অনেকের আচরন হয়ে উঠছে মারমুখী, আগ্রাসী। যার প্রথম শিকার হচ্ছে পরিবারের সদস্য অর্থাৎ নারী ও শিশুরা।

গবেষক ও নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, যারা নির্যাতনকারী তাদের কাছে পরিস্থিতি কোনও ব্যাপার নয়। ব্যাপার হচ্ছে নারী বা শিশু, যাদের সে নির্যাতন করবে, তারা কতটা হাতের কাছে রয়েছে। ফলে একদিকে সে তার জীবন কীভাবে টেকাবে সেই শঙ্কা, আরেকদিকে অজানা এক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়। এই দুই মিলিয়ে সে হয়ে উঠছে নির্যাতনকারী।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন তাদের এক জরিপে গত ৬ মে, লকডাউনে এপ্রিল মাসের এই তথ্য তুলে ধরেছে৷ সেখানে দেখা যাচ্ছে, দেশের ২৭টি জেলায় এপ্রিল মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন নারী এবং ৪৫৬ টি শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন৷ বাল্যবিবাহ হয়েছে ৩৩টি৷

২৪ টি সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে ২৭ জেলার ৫৮ উপজেলার ৬০২টি গ্রাম ও ৪ টি সিটি কর্পোরেশনের ১৭ হাজার ২০৩ জন নারী ও শিশুদের সাথে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়৷

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার দুই হাজার আট, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৩০৮ জন নারী৷ এর বাইরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন চার জন নারী, হত্যা করা হয়েছে এক জনকে এবং যৌন হয়রানি করা হয়েছে ২০ জন নারীকে৷

উত্তরদাতা চার হাজার ২৪৯ শিশুর মধ্যে ৪২৪ জন শিশু পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে৷ বাল্যবিয়ে হয়েছে ৩৩ টি এবং অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২ টি৷ চারটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ১৬ জনকে ধর্ষণ চেষ্টা করা হয়, অপহৃত হয়েছে দুই জন, যৌন হয়রানির শিকার ১০ জন এবং ত্রাণ নেওয়ার সময় ১০ টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয় ৷

জরিপে অংশ নেয়া এক হাজার ৬৭২ জন নারী এবং ৪২৪ টি শিশু আগে কখনো নির্যাতনের শিকার হয়নি৷ শিশুদের মধ্যে শতকরা ৯২ ভাগ তাদের বাবা-মা ও আত্মীয়দের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে ৷ আর নারীরা বেশির ভাগই স্বামীর হাতে৷

পুলিশ হেডকোয়ার্টার-এর তথ্য মতে গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে ৯৯৯ নম্বরে পারিবারিক সহিংসতা বিষয় ২ হাজার ৪৩৮টি, নারী নির্যাতনের এক হাজার ৬৩৫টি, বাল্যবিবাহ এক হাজার ৫৮৪, ইভটিজিং ৩৬২ এবং শিশু নির্যাতনের ৫৭টি কল আসে।

গত ২৯ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভায়লেন্স এগেন্টস উইমেন-এর মনিটরিং থেকে জানা যায়- কুমিল্লা জেলার হোমনায় রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এক বিধবা নারীকে গণধর্ষণ এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার তালুক খুটামারা বটতলা এলাকায় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, কুষ্টিয়া শহরের কমলাপুরে বাড়ি ভাড়া দিতে না পারায় ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীকে শরীরে পেট্টোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কুলতলী গ্রামে চার সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ, বরগুনার তালতলী উপজেলায় সাত বছরের মেয়েকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে মাকে গণধর্ষণ এবং নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় বাল্য বিবাহের মতো ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অর্পিতা দাস জানান, আমরা এক হাজার ৬৭২ জন নারীকে পেয়েছি যারা আগে কখনো নির্যাতনের শিকার হননি৷ এটা প্রমাণ করে যে লকডাউনের মধ্যে নির্যাতন বাড়ছে৷ আর এই নির্যাতনে স্বামীরাই প্রধানত জড়িত৷

কারণ তাদের কোনো কাজ নেই৷ অধিকাংশের আয় নাই৷ খাবার নেই৷ তারা বাইরে যেতে পারছেনা, আড্ডা দিতে পারছে না৷ এই সবকিছুর জন্য তারা আবার নারীকেই দায়ী করছে৷নারীকে দায়ী করার এই মানসিকতার পিছনে নির্যাতনের প্রচলিত মানসিকতাই কাজ করছে৷ এর বাইরে শ্বশুর শাশুড়ি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ভূমিকা আছে৷

তিনি জানান, আমাদের সাথে টেলিফোনে কথা বলা এবং অভিযোগ করার কারণেও নারীরা নির্যাতনের শিকারহয়েছে৷ তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ পেয়েছি আমরা৷

নিজ ঘরে নারীরা নিরাপদ নয় কেন এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, ‘ঘর এমন জায়গা, যেখানে নির্যাতন করলে কেউ দেখতে পায় না। তার নির্যাতনের ধরনটাও ভয়াবহ হয়। ঘরের নির্যাতন মেয়েরা বাইরে প্রকাশও করতে চান না। তাই তারা দিনের পর দিন নীরবে সহ্য করে যান। বলার সুযোগ পান না।’

পারিবারিক সহিংসতার বিচারের ব্যাপারে এই শিক্ষক বলেন, ‘যে দেশে খুন করলেও সেটার বিচার হয় না, সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা একটা সাধারণ বিষয়। থানা-পুলিশ এবং আদালতে কোনো সুস্থ মানুষ যেতে চায় না।

সহিংসতার যেসব ঘটনা প্রকাশ পায়, মামলা হয়; সেগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, আইনি জটিলতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ সহায়তা না পাওয়ার কারণে মামলা কম হয়। হলেও তা খুব একটা আলোর মুখ দেখে না।’

‘শুধু স্বামী নন, শ্বশুরবাড়ির পরিবেশের কারণেও মেয়েটি নির্যাতিত হয়। পারিবারিক পরিবেশ একটা গুরুত্ব বহন করে। নিজের পরিবারে যদি নারী-পুরুষ বৈষম্য থাকে, তাহলে সেই পরিবারের ছেলেটি নারীকে অবহেলার চোখে দেখতে থাকে।’

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সভাপতি রওশন আরা রুশো বলেন, ‘নিজ পরিবারে কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে এই নিকৃষ্ট সমাজব্যবস্থাই দায়ী। কারণ, নিজের পরিবার হলো নারীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল, সেখানে তারা নির্যাতনের শিকার হবেন, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’

আমারসংবাদ/এসআর/এআই