বুধবার ০৮ জুলাই ২০২০

২৪ আষাঢ় ১৪২৭

ই-পেপার

শরিফ রুবেল

মে ২১,২০২০, ১০:১৮

মে ২১,২০২০, ০৩:৩৪

ভার্চুয়াল কোর্টে বিপাকে প্রবীণ আইনজীবীরা!

*৬ দিনে ১৪ হাজার আসামির জামিন
*ভার্চুয়াল কোর্ট বন্ধে জেলায় জেলায় বিক্ষোভ
*ভার্চ্যুয়ালেও আইনজীবীদের কোর্টে যেতে হচ্ছে
*অনেকের নেই ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, স্ক্যানার মেশিন
*জি.আর সেকশন, পুলিশ স্টেশন, কারা কর্তৃপক্ষকে ডিজিটালাইজের দাবি বিশেষজ্ঞদের

প্রযুক্তি জ্ঞান কম। যেটুকো আছে ভার্চুয়াল কোর্টের প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অধিকাংশের তথ্য প্রযুক্তি জ্ঞান শুধু সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যাবহারেই সীমাবদ্ধ। আইনজীবীদের প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব থাকায় ভার্চুয়াল কোর্ট সফল হতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিনিয়তই।

সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তির নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে প্রবীন আইনজীবীদের। শুধু সিনিয়রেরাই নয় প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় ‘ভার্চ্যুয়াল আদালত’ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কিছুকিছু নবীর আইনজীবীরাও।

জেষ্ঠ্যরা অনেকেই কম্পিউটার কিংবা স্মার্ট ফোন চালাতে জানেন না। অন্যের সহযোগিতা নিতে ছুটতে হচ্ছে এদিক ওদিক। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকল্পে ‘ভার্চ্যুয়াল কোর্ট’র চালু হলেও এ থেকে তেমন সুফল পাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন ‘ভার্চ্যুয়াল-বিরোধী’ আইনজীবীরা।

ভার্চ্যুয়াল কোর্ট বন্ধের দাবিবে বিক্ষোভ হয়েছে কোথাও কোথাও। এমনকি বেশকিছু জেলা বার সমিতি এই কোর্ট বন্ধেরও দাবি তুলেছে। তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলার আইনজীবীরা আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেননি।

তবে এই অচলাবস্থা নিরসন হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। ভার্চুয়াল কোর্টে বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও আইনজীবীদের বিভিন্ন কারনে আদালত প্রাঙ্গণে যেতেই হচ্ছে।

ফলে কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা, প্রাক-প্রস্তুতি বা কর্মশালা ও প্রশিক্ষন ছাড়া ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করাতে খেই হারাতে হয়েছে আইনজীবীদের। প্রবীণ আইনজীবীদের অনেকেই ডিজিটাল সিস্টেমে অভ্যস্থ না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছে তারা।

বিশ্লেষকেরা বলেন, জি.আর সেকশন, পুলিশ স্টেশন, কারা কর্তৃপক্ষকে ডিজিটালাইজ না করে শুধু ভিডিও কলে শুনানি গ্রহণ করলেই ভার্চুয়াল কোর্টের উদ্দেশ্য সফল হবে না। এই সিস্টেমে আদালতের মত স্পর্শকাতর জায়গার তথ্যগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।

ইমেইলে আবেদন পাঠানোর পরে সাথে সাথে রিসিভ সংক্রান্ত বার্তা দেয়া হয় না। আবেদন ঠিকভাবে করা গেলো কিনা সেটা জানার সুযোগ নাই। ব্যক্তিগত ভাবে আমি নিজেও এই সমস্যায় পড়েছি।

বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ, শরীয়তপুর, আদালতে চার দিন আগে ইমেল পাঠিয়েও কোন ফিরতি বার্তা পাইনি। আবার অনেককে ফিরতি মেইলে আবেদন অসম্পূর্ণ বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু কি কারণে অসম্পূর্ণ সেটা জানানো হয়নি।

ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আলী খান হাসান বলেন, ভার্চ্যুয়াল সুবিধা নিতেও আইনজীবীদের কোর্টে আসতে হচ্ছে। অধিকাংশ আইনজীবী প্রক্রিয়াটা বুঝতে পারছেন না। পিটিশন কম্পোজকরা সহ অন্য বিষয়ে অন্যের সহযোগিতা নিতে কোর্টে আসতেই হচ্ছে।

সে ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব কতটা বজায় রাখা সম্ভব ? ভিডিও কনফারেন্স কজন আইনজীবীই বা বোঝেন? আমরা তাই প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে ঢাকা আইনজীবী সমিতি ভার্চ্যুয়াল কোর্ট বাতিল করে প্রচলিত আদালত খুলে দেয়ার আহবান জানাচ্ছি।

খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমএম মুজিবর রহমান বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে বেশিরভাগ আইনজীবী বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। তবে, বেশি বিড়ম্বনায় পড়ছেন বয়স্ক আইনজীবীরা।’

টাঙ্গাইল জেলা অ্যাডভোকেট বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এ কে এম নাছিমুল আক্তার বলেন, টাঙ্গাইলের অধিকাংশ আইনজীবী ভার্চুয়াল কোর্ট করতে আগ্রহী নন। কারণ ভার্চুয়াল কোর্ট করতে যে প্রযুক্তিগত সরঞ্জমাদি প্রয়োজন এবং যে ধরনের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন তা আমাদের অনেকেরই নেই।

এ জন্য আপাতত এই ভার্চুয়াল কোর্ট না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে আমরা সামাজিক দূরত্ব মেনে সপ্তাহে দুই দিন আগের মতো অ্যাকচুয়াল কোর্ট করতে আগ্রহী।

রাজশাহী বারের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ তৌফিক জাহেদী বলেন. রাজশাহী বারের ৯০ ভাগ আইনজীবী প্রযুক্তিগত বা ডিজিটাল কার্যক্রমে অভ্যস্ত নন। প্রক্রিয়া সম্পর্কেও ন্যূনতম ধারণা পাননি তারা। দু’চার জন ভার্চ্যুয়াল কোর্ট নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও অধিকাংশই এই সিস্টেমে আগ্রহী নন।

জামালপুর জেলা বারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ এনায়েত হোসেন হিটলার বলেন, ১০ মে ভার্চ্যুয়াল কোর্টের বিষয়ে নির্দেশনা আসে। আমরা নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা ভার্চ্যুয়াল কোর্টে অংশ গহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

একই বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমানউল্লাহ আকাশ বলেন, ভার্চ্যুয়াল কোর্ট পরিচারনার জন্য ইউএনডিপির পক্ষ থেকে আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা ছিলো। তেমন প্রশিক্ষণ না থাকায় অধিকাংশ আইনজীবী ভার্চ্যুয়াল কোর্টে আগ্রহী নন।

ভার্চ্যুয়াল কোর্ট রীতিমতো বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে পাবনা আইনজীবী সমিতি।

এর সভাপতি সাহাবুদ্দিন সবুজ বলেন, স্ব স্ব অবস্থানে থেকে ভার্চ্যুয়াল কোর্ট চালাতে হলে সবার বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্ট ফোন,ল্যাপটপ, স্ক্যানার মেশিন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকা জরুরি। এ মুহূর্তে এসব কেনার মতো সামর্থ্য নেই।

ভার্চ্যুয়াল কোর্ট বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিলও করেছে বরিশাল আইনজীবী সমিতি। বারের সাধারণ সম্পাদক কাইয়ুম খান কায়ছার বলেন, বরিশালে ইন্টারনেটের গতি খুবই কম। আইনজীবীদের বড় একটি অংশ প্রবীণ হওয়ায় তারা ফেসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাদি চালাতে পারেন না। তাই ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতি আমরা বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে জেলা বারগুলোতে উদ্ভুত পরিস্থিতি দ্রুত নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ব্যারিস্টার সাইফুর রহমান।

গতকাল বুধবার তিনি বলেন, কিছু কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিলো। সেগুলো নিরসনও হয়ে গেছে।

সব জেলা বারে একজন করে ‘ ফোকাল পারসন’ দেয়া হয়েছে। আইনজীবীদেরকে তারা সহযোগিতা করছেন। এর সুফলও আসতে শুরু করেছে। প্রতিটি জেলা আদালতে গড়ে ৫০/৬০ জন করে জামিন পেয়েছেন। সারাদেশে এ সংখ্যা হাজারের মতো।

আমারসংবাদ/এসআর/এআই