বৃহস্পতিবার ২৮ মে ২০২০

১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

শাহ আলম নূর

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৪,২০২০, ০২:০৯

এপ্রিল ০৪,২০২০, ০২:০৯

রমজানে অস্থির হতে পারে নিত্যপণ্যের বাজার

বিকল্প বাজারের সন্ধানে সরকার

করোনার প্রভাবে দেশের অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত। ঠিক সেই সময় রমজানকে সামনে রেখে অস্থির হয়ে উঠতে পারে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার। সরকারও আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় আট পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে সরকার একাধিক বিকল্প বাজারের সন্ধান করছে। এক দেশের বাজার থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে যাতে সহজেই অন্যত্র যাওয়া যায় এজন্য এমন উদ্যোগ বলে তারা জানিয়েছে।

বিকল্প হিসেবে সরকার ১৮টি দেশের ব্যাপারে চিন্তা করছে। বিকল্প বাজার থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় পণ্য এনে সরবরাহ লাইন স্বাভাবিক রাখা হবে। সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসের থাবা বিস্তার সংশ্লিষ্টদের ভাবনায় ফেলেছে।

ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে একের পর এক দেশে লকডাউন করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে চাহিদামতো পণ্য না পাওয়ার শঙ্কা ব্যক্ত করছেন ব্যবসায়ীরা।

তারা বলছেন, আসছে রমজানসহ আগামীতে চিনি, ভোজ্যতেল, আদা, রসুন, মসুর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুরের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখার কথা ভাবছে সরকার। সারাবিশ্বে করোনার প্রকোপ প্রলম্বিত হলে এসব পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদেও টান পড়তে পারে।

জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই সরকার বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে— বিকল্প উৎস থেকে যদি পণ্য পাওয়া যায়, তাহলে বিশেষ ব্যবস্থায় তা দেশে আনা হবে।

এ ক্ষেত্রে লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হবে। করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে পণ্য আনলে কোনো সমস্যা হবে কি না— তা নিশ্চিত হয়েই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই— রমজানে মানুষ যেন নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।
এটা তাদের প্রতিশ্রুতি এবং একটা চ্যালেঞ্জ।

এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা, মজুদ, আমদানি, সরবরাহ পরিস্থিতি ও আমদানিতে বিকল্প দেশ খোঁজার জন্য প্রতিবেদন তৈরি করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দিয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ট্যারিফ কমিশন পণ্যের চাহিদা, মজুদ, আমদানি পরিস্থিতি, সরবরাহ ও আমদানিতে বিকল্প দেশের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তারা বলছেন দেশে আদার চাহিদা বছরে ৩ লাখ টন।

এ পর্যন্ত দেশে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন। আর বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। বেশিরভাগ আদা চীন থেকে আমদানি হয়। চীন করোনার ধাক্কা সামলাচ্ছে।

এ অবস্থায় দেশটি কোনো কারণে রপ্তানি বন্ধ করলে আদার সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কাজেই পণ্যটির সরবরাহ ঠিক রাখতে বিকল্প দেশ হিসেবে ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানির বিষয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইতোমধ্যে এসব দেশও করোনায় আক্রান্ত।

এছাড়া দেশে বছরে রসুনের চাহিদা ৬ লাখ টন। স্থানীয় উৎপাদন ৫ লাখ ৫২ হাজার টন। বাদবাকি চাহিদা আমদানি করে সরবরাহ ঠিক রাখতে হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চীন থেকে বর্তমানে ৯৬ শতাংশ রসুন আমদানি করে। এছাড়া ২ শতাংশ মিয়ানমার ও ১ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করে। বর্তমানে আমদানির উৎস চীন ছাড়া রসুনের বিকল্প নেই বললেই চলে। তবুও মালয়েশিয়া, মিসরের মতো বিকল্প উৎস থেকে রসুন আমদানি করা যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতি বছর দেশে চিনির চাহিদা ১৮ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে দেশে উৎপান হয়েছে ৬২ হাজার টন। অবশিষ্ট চাহিদা পূরণের বিষয়টি আমদানিনির্ভর।

সেক্ষেত্রে ব্রাজিল থেকে ৮৯ শতাংশ এবং ভারত থেকে ৯ শতাংশ চিনি আমদানি করা হয়। তবে জরুরি প্রয়োজনে ভারত ও ব্রাজিল ছাড়াও মিয়ানমান, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, মেক্সিকো এবং নেদারল্যান্ডস থেকে চিনি আমদানি করা যেতে পারে।

দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২০ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় ২ লাখ ১৭ হাজার টন। বাকিটা আমদানি করতে হয়। সেক্ষেত্রে সয়াবিন তেল আর্জেন্টিনা থেকে ৯১ শতাংশ, ব্রাজিল থেকে ৫ শতাংশ ও প্যারাগুয়ে থেকে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ আমদানি করা হয়।

তবে আপৎকালীন সময় এই তিন দেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়া থেকে সয়াবিন তেল আমদানি করা যেতে পারে। কিন্তু তিনটি দেশই করোনায় আক্রান্ত।

এছাড়া পাম অয়েলের ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৯৩ শতাংশ এবং মালয়েশিয়া থেকে ৭ শতাংশ তেল আমদানি করা হয়। তবে জরুরিভিত্তিতে থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, পাপুয়া নিউগিনি থেকে পাম অয়েল আমদানি করা যেতে পারে।

একইভাবে দেশে বছরে মসুরের ডালের চাহিদা ৫ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার টন। বাকি চাহিদা আমদানি করে সরবরাহ ঠিক রাখতে হয়। কানাডা, তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া থেকে মসুর ডাল আমদানি করা হয়।
তবে আপৎকালীন সময় ভারত, মিয়ানমান, মিসর, রাশিয়া ও চীন থেকে আমদানি করতে পারে।

বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ শাফি মাহমুদ বলেন, করোনার কারণে এখন আমরা আমদানিতে ঝুঁকি নিচ্ছি না। অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানিকারকরাও সীমিত পরিমাণে রপ্তানি করছেন।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ আমদানি হয়েছে তা দিয়ে রমজান পর্যন্ত অনায়াসেই পার করে দেয়া যাবে। তবে শঙ্কার কারণে মানুষ যদি অতিরিক্ত কিনে মজুদ করে তবে সেটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সে সময় অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও বিকল্প দেশ থেকে পণ্য না পাওয়ার অশঙ্কা আছে। অন্যদিকে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন।

এর মধ্যে দেশে এখন পর্যন্ত ১৭ লাখ ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। বাকিটা আমদানি করে সরবরাহ ঠিক রাখতে হয়। এ পণ্যটি আমদানির বেশিরভাগ ভারত থেকে হয়।

তবে মিয়ানমান, চীন ও মিসর থেকেও অল্প পরিমাণে আমদানি করা হয়। তাই ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- পেঁয়াজ আমদানির বিকল্প উৎস হিসেবে মিয়ানমার, চীন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মিসর, তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করে আমদানি করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ছোলার বার্ষিক চাহিদা এক লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ৫ হাজার টন। বাকিটা অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে ছোলার কোনো ধরনের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে ভারত, মিয়ানমান, তুরস্ক ও রাশিয়া থেকে আমদানি করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, রমজানসহ দেশে যেকোনো পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে বিকল্প দেশের নাম তৈরি করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।

তবে যেসব দেশের নাম দেয়া হয়েছে, সেগুলোও করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। তাই একটু চিন্তা আছে। তবে দেশে এখন এ আট পণ্যের চাহিদার তুলনায় বেশি সরবরাহ আছে।

তিনি বলেন, যে পরিমান পণ্য আছে তা দিয়ে রমজান ও করোনা মোকাবিলা ভালোভাবে করা যাবে। তবে ভোক্তারা যাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনতে না পারেন সেদিকে নজর রাখতে হবে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, রমজানের এক দেড় মাস আগেই সাধারণত পণ্যগুলোর আমদানি হয়ে থাকে। সেই হিসেবে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যেভাবে প্যানিক বায়িং হচ্ছে তাতে গিয়ে রমজানের আগে সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

তবে সরকার যদি সাপ্লাই চেইনটা স্বাভাবিক রাখে ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে গাইড করে তবে এ সমস্যা থেকে বের হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলায় সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে হবে। সব সময় যাতে খাবারের সরবরাহ ঠিক থাকে এজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা রাখতে হবে।

আমারসংবাদ/এআই