শুক্রবার ১০ এপ্রিল ২০২০

২৬ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

আমার সংবাদ ডেস্ক

ফেব্রুয়ারি ০৮,২০২০, ০৬:০৯

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

নাম নিয়ে যত বিড়ম্বনা

মনীষীরা বলেছেন, নামে কি-ই বা আসে যায়! নামের চেয়ে কর্মের গুরুত্ব বেশি, তা সে মানুষের হোক কি স্থানের। তবে নামে আসলেই আসে যায়- অন্তত তেমনটাই দেখা গেছে সম্প্রতি। এজন্যই হয়ত বাংলায় আরেকটি প্রবচন চালু আছে, এক দেশের বুলি আরেক দেশের গালি। দেশে বেশ কিছু স্থানের নাম আছে এমন দ্বৈত অর্থের বা বিব্রতকর শব্দবন্ধ দিয়ে, সেগুলো নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনা শুরু হয়েছে, উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নীলফামারীতে সম্প্রতি একটি স্কুলের নাম ‘মানুষ-মারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ থেকে পরিবর্তন করে ‘মানুষ-গড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ করার পর। এছাড়াও পঞ্চগড়ের বোদা, নওগাঁর পত্নীতলা, খুলনার সোনাপোতা, রাঙ্গামাটির চুমোচুমি, ঝিনাইদহের চুলকানি বাজার, চাঁদপুরের ল্যাংটার হাট, টাঙ্গাইলের মহিষমারা, ফেনীর ছাগল নাইয়া থানা, গাইবান্ধা জেলা, পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা এবং ঢাকার ভূতের গলি উল্লেখযোগ্য। দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পঞ্চগড়ের একটি উপজেলার নাম বোদা। এই নামটি নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে অনেকের। সেখানকার বাসিন্দা ও বাইরে থেকে সেখানে থাকতে যান এমন অনেকেরই আপত্তি রয়েছে, জায়গাটির ব্যাপারে। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে উপজেলা পরিচিতি অংশে লেখা আছে, এক সময় বোদা উপজেলায় বদেশ্বরী নামে একটি মন্দির ছিল, যার নামানুসারে ঐ এলাকার নামকরণ হয়। পত্নী শব্দটি স্ত্রী শব্দের একটি প্রতিশব্দ, যে কারণে এই উপজেলাটি নিয়েও অনেকে হাস্যরস করে থাকেন। পত্নীতলা বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার একটি উপজেলা। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নে পত্নীতলা উপজেলা পরিচিতি অংশে লেখা আছে, নামটি এসেছে পত্তনীতোলা, পাঠানতোলা কিংবা পাটনীতোলা শব্দ থেকে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, পাঠান রাজত্বকালে বরেন্দ্র এলাকার অনেক পরগণা পাঠান জমিদারদের অধীন ছিল। পাঠান নৃপতি বা রাজ কর্মচারীরা বর্তমান পত্নীতলা বাজারে অবস্থান করে জমি পত্তন দেওয়ার কাজ সমাধা করতেন। সেই পত্তন শব্দ থেকে পত্তনী এবং ক্রমে পত্তনীতোলা বা পাঠানতোলা নামকরণ হয়, সেখান থেকে ক্রমে আসে পত্নীতলা নামটি। রাঙ্গামাটি জেলার জুরাছড়ি উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম চুমাচুমি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেক তামাশা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন, এই নামটি এসেছে সেখানকার একটি নদী থেকে। জুরাছড়ি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বিরো চাকমা বলেন, সুবলং নদীটির চাকমা নাম শলক নদী। সেই দুইটি উপনদী মুখোমুখি হয়েছে জুরাছড়িতে। মুখোমুখি শব্দটিকে চাকমা ভাষায় বলা হয় সুমোসুমি, যা দুইটি উপনদীর মুখোমুখি হবার সংযোগস্থলকে নির্দেশ করে। কালক্রমে সুমোসুমি শব্দটি এই চুমোচুমি বা চুমাচুমি নামটি এসেছে। খুলনা জেলা শহরে অবস্থিত একটি জায়গায় নাম সোনাপোতা। সোনা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ধাতব পদার্থের নাম, সন্দেহ নেই। খুলনা জেলা শহরে এই নামে বেশ কয়েকটি স্কুল এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে নামটি নিয়ে অনেকেরই অস্বস্তি রয়েছে। কিন্তু খুলনা শহরের পুরনো বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শহরের যে অংশের নাম সোনাপোতা, আগে সেই জায়গাটির নাম ছিল ময়লাপোতা। কারণ সেখানে একটি বড় ময়লার ডিপো ছিলো, পরবর্তীতে আশির দশকে ঐ জায়গার নামকরণ করা হয় সোনাপোতা। চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার একটি বাজারের নাম ল্যাংটার হাট। বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী মতলব জেলার বদরপুরে একটি মাজার রয়েছে যার নাম সোলেমান ল্যাংটার মাজার। সেখান থেকেই মূলত বাজারের নামকরণ করা হয়েছে। এসব নামের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোষ্ট করেছে বিবিসি বাংলা। ওই পোষ্টে দেড় হাজারের বেশি মানুষ মন্তব্য করেছেন। অনেকে নামগুলো পরিবর্তনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তবে এর মধ্য একটি বড় অংশ জায়গার নাম পরিবর্তনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের যুক্তি ওইসব এলাকায় যারা জন্মেছেন ও বেড়ে উঠেছেন, তাদের কাছে হয়ত নামগুলো আলাদা করে বিব্রতকর নয়, যে কারণে তাদের কাছে নামগুলো স্বাভাবিক শোনায়। এছাড়া তাদের আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, প্রতিটি নামের পেছনে একটি ইতিহাস থাকে, যা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকার কারণেই নামগুলো বিকৃত করে মানুষ। ফলে নাম পরিবর্তন না করে তাদের প্রস্তাব হচ্ছে প্রতিটি নামের সঠিক ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা হোক। আমারসংবাদ/জেআই