মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

১৪ আশ্বিন ১৪২৭

ই-পেপার

রাসেল মাহমুদ

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১৪,২০২০, ০৫:১৬

ফেব্রুয়ারি ১৪,২০২০, ১১:১৬

বইমেলায় ফাগুনের ছোঁয়া

প্রতিবছর ১৩ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাল্গুন হলেও এ বছর হয়েছে ব্যতিক্রম। এ বছর ফাল্গুনের প্রথম দিনটি হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। এদিন বিশ্বভালোবাসা দিবসও। তবে বসন্তের দিনটি একদিন পর হলেও অমর একুশে গ্রন্থমেলায় লেগেছিলো বসন্তের ছোঁয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার বইমেলার ১২তম দিনে নেমেছিলো তারুণ্যের ঢল।

তরুণ-তরুণীরা এদিন সেজেছিলো ফাগুনের রঙ বাসন্তী দিয়ে। তরুণরা পরেছিলো বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি আর তরুণীরা বাসন্তী রঙয়ের শাড়ি। মেলাজুড়ে বাসন্তী রঙ একাকার হয়ে যায়! শীতের রুক্ষ, হিমেল ভাব কাটিয়ে প্রকৃতিতে নতুনের সজীবতা আসার পর বসন্ত আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এসেছে। বাঙালির জীবনেও লেগেছে প্রকৃতির সজীব ছোঁয়া। তাই ফাগুনের প্রথম দিনটি আসার পূর্বেই বর্ণিল আয়োজন ছিলো চোখে পড়ার মতো।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আহা, আজি এ বসন্তে এতো ফুল ফোটে/এতো বাঁশি বাজে, এতো পাখি গায়’ গানের সঙ্গেই এ বছর বাঙালি বরণ করবে ঋতুরাজ বসন্তকে। প্রতিবছরের মতো এ বছরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় সকালে ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ স্লোগানে বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।

তবে বসন্তের প্রথম দিনটি আসার আগেই মনে লেগেছে বসন্তের আমেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাসরিন জাহানের মন খারাপ হয়েছে বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস একই দিনে হওয়ায়। তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, দুইটা দিন আলাদা হলে দুরকম করে উদযাপন করতাম। কিন্তু এ বছর একই দিনে হওয়ায় খারাপ লাগছে। তাই আজ ব্যস্ত না হলেও মেলায় ঘুরতে এসেছি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঋজু বলেন, বসন্ত বাঙালির প্রাণের উৎসব। আর ভালোবাসা দিবস আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে পালিত হচ্ছে। ফলে দুইটা দিনই বাঙালির জীবনে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। এবার একই দিনে দুইটা দিন পড়ায় আনন্দটাও বেশি হবে। তবে বসন্তের আনন্দ অনেকে আজই করে নিচ্ছে।

রাবেয়া নামের এক তরুণী বলেন, বসন্ত উৎসব আমার অনেক ভালো লাগে। কারণ চারপাশে রঙের একটা আমেজ থাকে। প্রতিবছরই এ উৎসবকে নতুন মনে হয়। বসন্ত শুধু যে উচ্ছ্বাসের রঙ ছড়ায় তা নয়, বরং এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে উজ্জীবিত করে। এবছর এর সাথে যোগ হবে ভালোবাসা দিবস। ভালোই হবে।

এদিকে, বসন্তের আগের দিন গতকাল বৃহস্পতিবারের বিকালটি বইমেলায় ভিন্ন আমেজ তৈরি করে। প্রকৃতির রুক্ষতা দূরে সড়িয়ে ফাগুনের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল মেলা প্রাঙ্গণ। শুধু কি তাই! ফাগুনের মাতাল হাওয়ায় ভালোবাসার রঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল প্রেমিক হূদয়ও। বসন্তের মধুর হাওয়ায় উড়েছিলো সম্প্রীতির নিশান। এদিন অমর একুশে গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে পাঞ্জাবি পরা তরুণদের সাথে বাসন্তী রঙে রাঙা তরুণীদের যুগল উপস্থিতি সত্যিই ছিলো মনোমুগ্ধকর।

শুধু তরুণ-তরুণীই নয়, নানাবয়সি গৃহবধূ-গৃহস্বামীও সেজেগুজে এসেছিলেন বইমেলার আঙিনায়। ছোট-বড় সব মেয়ের মাথায় ছিলো গোলাপরাঙা টায়রা। প্রিয় মানুষকে বই উপহার দেয়ার জন্য ভিড় জমেছিল স্টল-প্যাভিলিয়নগুলোতে। তবে ফাগুনের আজ শুক্রবার মেলায় পাঠক-দর্শনার্থী আরও বেশি হবে বলে জানান প্রকাশকরা। তারা জানান, মেলায় উপস্থিত দর্শনার্থীদের বেশিরভাগই ঘুরতে এসেছেন। বিক্রি বেশি হলেও উপস্থিতির তুলনায় কম।

স্টল-প্যাভিলিয়নগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ বছর মেলার কবিতার বই বেশি এলেও গল্প ও উপন্যাসই বেশি বিক্রি হয়েছে। প্রেমের কবিতার বই বিক্রি হলেও তা খুবই কম।

আহমেদ সেলিম নামের একজন প্রকাশক বলেন, মেলায় উপস্থিতি আজ বেশ ভালো। বিক্রিও তুলনামূলক ভালো। তবে উপস্থিতি যে পরিমাণে দেখা যাচ্ছে সে তুলনায় বই বিক্রি কম।

পাতা প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী অরিন বলেন, আমাদের স্টলে উপন্যাসের চাহিদা বেশি। তবে পহেলা ফাল্গুনের আগের দিন হিসেবে বিক্রি বেশি মোটামুটি। আগামীকাল বেশি বই বিক্রি হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ছিলো অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১২তম দিন। মেলা চলে বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন মেলায় নতুন বই এসেছে ১৮০টি।

বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সুব্রত বড়ুয়া রচিত ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন বড়ুয়া। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন লুৎফর রহমান রিটন এবং মনি হায়দার। লেখকের বক্তব্য প্রদান করেন সুব্রত বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এনডিসি।

প্রাবন্ধিক বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ-দর্শন জানা এবং চর্চা করা। নতুন প্রজন্মের নবীন-তরুণদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যত আগ্রহ সৃষ্টি করা যাবে, তারা ততই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সোনার বাংলা গড়ার পক্ষে এটা হতে পারে অত্যন্ত জরুরি উদ্যোগ। সুব্রত বড়ুয়া রচিত বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা গ্রন্থখানি কিছুটা হলেও আমাদের এগিয়ে দেবে সেই লক্ষ্যে। উক্তি-ভাষ্যে, আলোচনায় বঙ্গবন্ধুকে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে বিশ্বনেতার মানদণ্ডে।

আলোচকবৃন্দ বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিশাল সমুদ্রের মতো যিনি তার চেতনায় ধারণ করেছেন বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা’ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখক সুব্রত বড়ুয়া বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী জীবনকে ইতিহাস ও তথ্যের ভিত্তিতে তুলে আনার প্রয়াস পেয়েছেন। এককথায় বলা যায় সাবলীল ভাষায় লেখা বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মবিষয়ক এটি এক অনন্য গ্রন্থ।

গ্রন্থের লেখক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনকথা’ গ্রন্থটি লেখার পেছনে যে দুটি বিষয় আমার প্রেরণা হয়ে কাজ করেছে তা হলো বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। এ গ্রন্থে আমি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর জীবনকে ইতিহাস, সংগ্রাম ও কর্মের প্রেক্ষাপটে তুলে আনার চেষ্টা করেছি।

সভাপতির বক্তব্যে ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এনডিসি বলেন, সুব্রত বড়ুয়ার লিখিত এ গ্রন্থ অত্যন্ত তথ্যনিষ্ঠ এবং বিশ্লেষণ-ঋদ্ধ। আমাদের এবং নতুন প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় একটি গ্রন্থ। বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু একই সূত্রে গাঁথা। অতীতে বহুবার বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে দেবার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে কিন্তু তা সফল হয়নি। কারণ, বাংলার প্রতিটি মানুষের হূদয়ে বঙ্গবন্ধু চিরকালের জন্য স্থান করে নিয়েছেন।

‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, মৌলি আজাদ, রাসেল আশেকী এবং শোয়েব সর্বনাম।

‘কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ’ করেন কবি মাহবুব সাদিক, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা, মুনীর সিরাজ এবং মাসুদ হাসান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মো. শাহাদাৎ হোসেন, অনিমেষ কর এবং তামান্না সারোয়ার নীপা। নৃত্য পরিবেশন করেন সৌন্দর্য প্রিয়দর্শিনী ঝুম্পা-এর পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘জলতরঙ্গ ডান্স কোম্পানি’র নৃত্য শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী দীনাত জাহান মুন্নী, আঞ্জুমান আরা শিমুল, কাজী মুয়ীদ শাহরিয়ার সিরাজ জয়, মো. রেজওয়ানুল হক এবং সঞ্জয় কুমার দাস।

যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন পলাশ হালদার (পারকেশন), টুটুল বড়ুয়া (বেইজ গিটার), এমিল মুরছালিন (গিটার), মো জাহিদুর রহমান (কী-বোর্ড) এবং পলাশ চক্রবর্তী (অক্টোপ্যাড)।

আজকের অনুষ্ঠানসূচি : আজ শুক্রবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৩তম দিন। মেলা চলবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশু প্রহর। সকাল ১০টায় শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আসাদ চৌধুরী রচিত ‘সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শোয়াইব জিবরান।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন আনিসুর রহমান এবং নূরুন্নাহার মুক্তা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক খুরশীদা বেগম। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আমারসংবাদ/এমএআই