বৃহস্পতিবার ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

৮ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ১২,২০২০, ০৫:০২

ফেব্রুয়ারি ১২,২০২০, ০৫:০৬

অমর একুশে গ্রন্থমেলার আখ্যান

বছর ঘুরে আবার এলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা। গ্রন্থমেলা বা বই মেলা শব্দ দু’টির যেকোনো একটি শুনলেই আমাদের মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মহামিলন মেলা। কোন এক অদৃশ্য মায়াবলে লাখো মানুষকে টেনে আনে একাডেমির বর্ধমান হাউজ ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

গ্রন্থমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা, আত্মার মেলা। আত্মার সাথে যেমন আত্মার সম্পর্ক, তেমনি আবহমানকাল ধরে বাঙালির সাথে বইয়ের সম্পর্ক। ঢাকার দু’টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কারণে এবারের গ্রন্থমেলা একদিন পিছিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করেন। চলবে বাকি ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে। ইতোমধ্যে বই মেলার কয়েকটা দিন অতিবাহিত হয়েছে। এখন কেবল বইয়ের মৌ মৌ গন্ধ চারদিকে।

ফলে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আখ্যান বা অঙ্কুরকথন বলার এখনই মোক্ষম সময়। (১). বাংলাদেশে প্রথম গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচ তলায়। এটি ছিলো মূলত শিশু গ্রন্থমেলা। শিশু বিভাগে নানা বর্ণের আকাশের কল্পকাহিনী, ছড়া ও ছবির বই ছিলো মেলার উল্লেখযোগ্য দিক। এ মেলাটি আয়োজন করেছিলেন প্রয়াত কথা সাহিত্যিক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েন উদদীন। তিনি একসময় বাংলা একাডেমিতেও চাকরি করতেন।

শিশু গ্রন্থমেলা আয়োজন করে সরদার জয়েন উদদীন পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারেন নি। আরও সুপরিসরে গ্রন্থমেলা আয়োজনের সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সুযোগও পেয়ে যান। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহায়তায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। এই গ্রন্থমেলায় আলোচনা পর্বের ব্যবস্থা করা হয়।

আলোচনা পর্বে অংশ নেন খ্যাতিমান অধ্যাপক আব্দুল হাই, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ। বাংলাদেশে গ্রন্থমেলা নিয়ে সাংগঠনিক কর্মের চিন্তন ও কর্মপ্রয়াস সরদার জয়েন উদদীনের মস্তিস্ক প্রসূত। (২). ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৃঢ়চেতা সরদার জয়েন উদদীন সাহেব থেমে থাকেননি।

নবোদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশের জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে সরদার জয়েন উদদীন স্বাধীন ও স্বার্বভৌম দৃষ্টিতে গ্রন্থমেলাকে এগিয়ে নেন।

স্বাধীন দেশের এমন বইবান্ধব চিত্তক মানুষটি ইউনেস্কো ঘোষিত আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ হিসেবে ১৯৭২ সালকে সামনে পেয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে বাংলা একাডেমিতে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন।

১৯৭২ সালের ২০-২৬ ডিসেম্বর সপ্তাহব্যাপী এই গ্রন্থমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে আয়োজিত হয়েছিল। এই বই মেলায় ইউনেস্কোসহ ভারত, জাপান, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভিয়েতনাম, ব্রিটেন, বুলগেরিয়া অংশ নেয়।

এ অনুষ্ঠানের সময় বাংলা একাডেমির দেয়ালের বাইরে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন।

তার দেখাদেখি যুক্ত হন মুক্তধারা প্রকাশনীর শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহা ও বর্ণমিছিলের কর্ণধার তাজুল ইসলাম। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।

এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি তার নিজস্ব বই প্রদর্শন ও ম্যুরাল প্রদর্শনের আয়োজন করে। এই গণজমায়েতকে সামনে রেখে নিজামি, চিত্তবাবু, বর্ণমিছিলসহ সাত-আটজন প্রকাশক একাডেমির ভিতরে পূর্বদিকের দেয়ালঘেঁষে বই সাজিয়ে বসে যান।

বই বিক্রির এই বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা বাংলা একাডেমিকে সুপরিকল্পিত গ্রন্থমেলা আয়োজনের জন্য ভাবিয়ে তোলে। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন সামরিক আইন প্রশাসক প্রয়াত জিয়াউর রহমানের সময়ে তৎকালীন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে সরাসরি মেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন।

১৯৭৯ সালে বই মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। ওই সময় ৭ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৮১ সালে বই মেলার মেয়াদ ২১ দিনের পরিবর্তে ১৪ দিন করা হয়।

এরপর প্রকাশকদের দাবির মুখে মেলার মেয়াদ আবার ২১ দিনে বৃদ্ধি করা হয়। মেলার উদ্যোক্তা বাংলা একাডেমি। সহযোগিতায় ছিলো জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি।

১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মনজুরে মওলা গ্রন্থমেলার নামকরণ করেন ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। মূলত ‘৫২ এর ভাষা শহীদদের অম্লান স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ নামকরণ করা হয়েছিল।

১৯৮৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলা একাডেমি এই নামেই গ্রন্থমেলার আয়োজন করে আসছে। ১৯৮৪ সালে এসে গ্রন্থমেলার জন্য বিধিবদ্ধ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান একুশে গ্রন্থমেলাকে বাংলা একাডেমির মুখোমুখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমপ্রসারণ করেন। (৩). এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন চোখে পড়ার মতো।

অতিতের সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে বৃহৎ পরিসরে অর্থাৎ সাড়ে সাত লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়েছে। পুরা মেলা জুড়ে উদ্ভাসিত হবে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিচ্ছবি। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন ও আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে এ মেলাকে বঙ্গবন্ধুর নামে উৎসর্গ করা হয়েছে।

মেলার সবচেয়ে আকর্ষণ একাডেমি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণমূলক রচনা ‘আমার দেখা নয়া চীন’। একে একে বাংলা একাডেমি থেকে সারা মাসব্যাপী আরও ২৬ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হবে।

এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আগামী দু‘বছরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরও ১০০ গ্রন্থ প্রকাশ করবে বাংলা একাডেমি। আর মাস জুড়ে অনুষ্ঠান মঞ্চের আলোচনার বিষয় হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। প্রতিদিনের মেলা মঞ্চের আলোচনা সেমিনার, শিশুদের চিত্রাঙ্গন প্রতিযোগিতা, গান, আবৃত্তি, নৃত্যসহ সবকিছু আবৃত্তি হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, এবারের মেলায় একাডেমি প্রাঙ্গনে ১২৬ টি প্রতিষ্ঠানের ১৭৯ টি ইউনিট ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪৩৪ টি প্রতিষ্ঠানের ৬৯৪ টি ইউনিটসহ মোট ৫৬০ টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩ টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ৩৩ টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৩৪ টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেয়া হয়েছে ‘লিটল ম্যাগ চত্বর’।

শিশু চত্বরের আয়তনও বাড়ছে। মেলায় এবার যুক্ত হচ্ছে ফুড কোর্ট। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের দুই প্রান্তে প্রতিটি ফুড কোর্টে ২০ টি খাবার দোকান থাকবে। সেই সঙ্গে মেলায় থাকছে ভিন্ন ধাঁচের ‘লেখক বলছি’ মঞ্চ ও বরাবরের ন্যায় গ্রন্থ উন্মোচনের আয়োজনও।

অমর একুশে গ্রন্থমেলার উত্তাপ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ুক সুবৃহৎ ভূভাগের চারদিকে। বই হোক মানবজীবনের অমর অক্ষয় সাধনা। জয়তু অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

লেখক : শিক্ষার্থী সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আমারসংবাদ/এসটিএমএ