বুধবার ০৮ এপ্রিল ২০২০

২৫ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

ফেব্রুয়ারি ১৪,২০২০, ০৮:৪৭

ফেব্রুয়ারি ১৪,২০২০, ০৮:৫০

ভালোবাসার অনুভূতিতে হোক হৃদয়ের বন্ধন

ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ সৃষ্টির সবকিছু। শুধু একটি দিনে আবদ্ধ থাকেনা ভালোবাসা। তবুও ভালোবাসার জন্যে একটি দিনকে বিশেষভাবে নির্ধারণ করে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে ভালোবাসা দিবস। তাই আজ অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। নানান আয়োজনে বিশ্বব্যাপী ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস পালিত হচ্ছে।

আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারতের আগ্রায় সম্রাট শাহজাহানের তৈরি করা তাজমহল দেখলে বোঝা যাবে নুরজাহানের জন্য কতটা তার প্রেম ছিলো। বিশ্বখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার রোমিও জুলিয়েট নাটকে যন্ত্রণার কথা অত্যন্ত করুণভাবে বর্ণনা করেছেন। প্রতিটি মানুষ নিজের জীবনে ভালোবাসা না থাকলেও ভালোবাসার ছোঁয়া পেতে চান। ভালোবাসা মানে শুধু একটি দিনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়।

প্রেমিক হূদয় প্রতি মুহূর্তে তার প্রেমাসক্তকে উপলব্ধি করতে থাকে, এরই নাম ভালোবাসা। যে যন্ত্রণার আগুন অন্তরকে জ্বালাতে থাকে ততবেশি সে ভালোবাসার মানুষের কথা মনে করতে থাকে। হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার (রহ.) একটি বিখ্যাত পুস্তক ‘প্রেমিকের শাস্তি’তে লিখেছেন স্রষ্টার কাছ থেকে যখন প্রেমিক হূদয় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে, তখন তার অবস্থানটা জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়। আর যখন স্রষ্টা প্রেমিক হূদয়কে শান্ত করে দেন, তখন তার হূদয়ে বেহেশতের দরজা খুলে যায়’।

জীবন চলার পথে আমাদের নানা রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কখনো পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে কখনোবা প্রতিকূলে। ফলে মনে তৈরি হয় নানা রঙের আবেগ। এই আবেগ আমাদের মধ্যে রাগ, হিংসা, ঘৃণা কিংবা ভালোবাসা ও আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। তবে সবটা কিন্তু সময়োপযোগী নয় বরং প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত আবেগের বেড়াজালে আটকা পড়ি আমরা। সংকটের শুরু হয় তখনই। আমরা কি ভেতরের আবেগ নিয়ে ভাবি কিংবা খেয়াল রাখি যে, ঠিক এই মুহূর্তে কী অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি? দেখা যাবে খুব একটা খেয়াল করা হয় না।

বেশির ভাগ সময় মন ভালো কিংবা খারাপ লাগছে এসব দায়সারা কথা বলে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাই আমরা। ভালোলাগার মধ্যে ভালোবাসা, আনন্দের অনুভূতি এবং খারাপ লাগার মধ্যে রাগ, বিরক্তি অথবা হিংসার অনুভূতি থাকতে পারে, তা সুনির্দিষ্টভাবে ভেবে দেখা হয় না। এর প্রমাণ মেলে অভিধানেও। ইংরেজির চেয়ে বাংলা শব্দভাণ্ডারে আবেগের নাম অনেক কম। তাই আমরা যখন ভাবতে বসি কেমন অনুভব করছি তখন ঠিক আবেগ প্রকাশের যথোপযুক্ত শব্দ খুঁজে পাই না।

আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো তরুণ-তরুণীদের মাঝে এইদিনটিকে ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই। প্রিয়জনের সাথে একান্তে সময় কাটানো, পরস্পরকে উপহার দেয়া, সর্বোপরি নিজের লুকানো মনের কথাগুলো প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয় অনেকেই। ভালোবাসা নামের চার অক্ষরের এই শব্দটিতে লুকিয়ে আছে মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। ভালোবাসা নিয়ে অসংখ্য উপন্যাস, কবিতা গান নাটক সিনেমা তৈরি হলেও এখনও পর্যন্ত এর কোনো সুনির্দিষ্ট সজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কেউ। অনেকেই মনে করেন মানুষের আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশের নামই ভালোবাসা।

বিশেষ কোনো মানুষের জন্য স্নেহের শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ভালোবাসা। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ’র মতে, ভালোবাসা হইলো শরমের ব্যাপার- তবে দরকার আছে, এটাই সবচেয়ে উত্তম বলে মনে হয়’।

তারপরও মাঝে মাঝে কবির ভাষায় আবেগের জোয়ারে ভেসে ভালোবাসার সংজ্ঞা দেয় অনেকেই। কবি গুরু ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন- ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি-এই সুরে কাছে কাছে-দূরে, জলে-স্থলে বাজায় বাঁশি’।

তবুও ভালোবাসাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা যায়। ভালোবাসা বিভিন্ন রকম হতে পারে, মা বাবার প্রতি ভালোবাসা, দেশের জন্য ভালোবাসা, আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা, ধর্মীয় ভালোবাসা, মানবিক ভালোবাসা ইত্যাদি। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, সবাইকে ভালোবাসবো এটার জন্য আবার বিশেষ দিবস কেন? ভালোবাসা একটি সর্বজনীন সত্ত্বা। কিন্তু কবে থেকে এই ভালোবাসা দিবস শুরু তার কোনো হিসাব না থাকলেও একটু পিছনে ফিরলেই দেখা যাবে, এই ভালোবাসা দিবস নিয়েও হরেক রকম ইতিহাস প্রচলিত আছে।

যেভাবে শুরু ভালোবাসা দিবস :- ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রি ছিলেন। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এই ধর্মযাজক ছিলেন শিশুপ্রেমিক, সামাজিক ও সদালাপি এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচারক। আর রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী। সম্রাটের পক্ষ থেকে তাকে দেব-দেবীর পূজা করতে বলা হলে ভ্যালেন্টাইন তা অস্বীকার করায় তাকে কারারুদ্ধ করা হয়।

সম্রাটের বারবার খ্রিস্টধর্ম ত্যাগের আদেশ প্রত্যাখ্যান করলে ২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। সেই থেকেই দিনটির শুরু। আরও একটি প্রচলিত ঘটনা আছে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে নিয়ে। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কারারুদ্ধ হওয়ার পর প্রেমাসক্ত যুবক-যুবতীদের অনেকেই প্রতিদিন তাকে কারাগারে দেখতে আসত এবং ফুল উপহার দিত। তারা বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক কথা বলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে উদ্দীপ্ত রাখত।

এক কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়েও ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে যেত। অনেকক্ষণ ধরে তারা দু’জন প্রাণ খুলে কথা বলতো। একসময় ভ্যালেন্টাইন তার প্রেমে পড়ে যায়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় অন্ধ মেয়েটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। ভ্যালেন্টাইনের ভালোবাসা ও তার প্রতি দেশের যুবক-যুবতীদের ভালোবাসার কথা সম্রাটের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এছাড়া খ্রিস্টীয় ইতিহাস মতে, ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের সাম্রাজ্যবাদী, রক্তপিপাষু রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের প্রয়োজন পড়ে এক বিশাল সৈন্যবাহিনীর।
একসময় তার সেনাবাহিনীতে সেনা সংকট দেখা দেয়। কিন্তু কেউ তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি নয়। সম্রাট লক্ষ্য করলেন যে, অবিবাহিত যুবকরা যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে অত্যাধিক ধৈর্যশীল হয়।

ফলে তিনি যুবকদের বিবাহ কিংবা যুগলবন্দি হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যাতে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ না করে। তার এ ঘোষণায় দেশের যুবক-যুবতীরা ক্ষেপে যায়। যুবক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক ধর্মযাজকও সম্রাটের এ নিষেধাজ্ঞা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি।

প্রথমে তিনি সেন্ট মারিয়াসকে ভালোবেসে বিয়ের মাধ্যমে রাজার আদেশকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার গির্জায় গোপনে বিয়ে পড়ানোর কাজও চালাতে থাকেন। একটি রুমে বর-বধূ বসিয়ে মোমবাতির স্বল্প আলোয় ভ্যালেন্টাইন ফিস ফিস করে বিয়ের মন্ত্র পড়াতেন। কিন্তু এ বিষয়টি একসময়ে সম্রাট ক্লডিয়াসের কানে গেলে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন।

২৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি সৈন্যরা ভ্যালেন্টাইনকে হাত-পা বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে সম্রাটের সামনে হাজির করলে তিনি তাকে হত্যার আদেশ দেন। আরেকটি খ্রিস্টীয় ইতিহাস মতে, গোটা ইউরোপে যখন খ্রিস্টান ধর্মের জয়জয়কার, তখনও ঘটা করে পালিত হতো রোমীয় একটি রীতি।

মধ্য ফেব্রুয়ারিতে গ্রামের সকল যুবকরা সমস্ত মেয়েদের নাম চিরকুটে লিখে একটি পাত্রে বা বাক্সে জমা করত। অতঃপর ওই বাক্স হতে প্রত্যেক যুবক একটি করে চিরকুট তুলতো, যার হাতে যে মেয়ের নাম উঠতো, সে ওই মেয়ের প্রেমে মগ্ন থাকতো।

আর তাকে চিঠি লিখতো, এ বলে ‘প্রতিমা মাতার নামে তোমার প্রতি এ পত্র প্রেরণ করছি।’ বছর শেষে এ সম্পর্ক নবায়ণ বা পরিবর্তন করা হতো। এ রীতিটি কয়েকজন পাদ্রির গোচরীভূত হলে তারা একে সমূলে উৎপাটন করা অসম্ভব ভেবে শুধু নাম পাল্টে দিয়ে একে খ্রিস্টান ধর্মায়ণ করে দেয় এবং ঘোষণা করে এখন থেকে এ পত্রগুলো সেন্ট ভ্যালেন্টাইন-এর নামে প্রেরণ করতে হবে।

কারণ এটা খ্রিস্টান নিদর্শন, যাতে এটা কালক্রমে খ্রিস্টান ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। অন্য আরেকটি মতে, প্রাচীন রোমে দেবতাদের রানী জুনোর সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছুটি পালন করা হতো। রোমানরা বিশ্বাস করতো যে, জুনোর ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কোনো বিয়ে সফল হয় না। ছুটির পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি লুপারকালিয়া ভোজ উৎসবে হাজারও তরুণের মেলায় র্যাফেল ড্র এর মাধ্যমে সঙ্গী বাছাই প্রক্রিয়া চলতো।

এ উৎসবে উপস্থিত তরুণীরা তাদের নামাঙ্কিত কাগজের স্লিপ জনসম্মুখে রাখা একটি বড় পাত্রে ফেলত। সেখান থেকে যুবকের তোলা স্লিপের তরুণীকে কাছে ডেকে নিত। কখনও এ জুটি সারা বছরের জন্য স্থায়ী হতো এবং ভালোবাসার সিঁড়ি বেয়ে বিয়েতে গড়াতো ওই সম্পর্ক।

খ্রিস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন করা থেকে বিরত থাকার জন্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এছাড়া অষ্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময় এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়। বর্তমানকালে, পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করে এই ভালোবাসা দিবসের জন্য কার্ড, ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী ও শুভেচ্ছা কার্ড ক্রয় করতে এবং আনুমানিক প্রায় ২.৫ কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশে যেভাবে শুরু :- ১৯৯৩ সালের দিকে আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবসের আবির্ভাব ঘটে। সাংবাদিক শফিক রেহমান পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে। পাশ্চাত্যের রীতিনীতিতে তিনি ছিলেন অভ্যস্ত। দেশে ফিরে তিনিই ভালোবাসা দিবসের শুরুটি করেন।

এ নিয়ে অনেক ধরনের মতবিরোধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত শফিক রেহমানের চিন্তাটি নতুন প্রজন্মকে বেশি আকর্ষণ করে। সে থেকে এই আমাদের দেশে দিনটির শুরু। আর তাই ১৪ ফেব্রুয়ারি মানেই প্রজন্মের কাছে একটি কাঙ্ক্ষিত দিন।

শুধুমাত্র ১৪ ফেব্রুয়ারিই নয়, বছরের প্রতিটি দিনেই সেন্ট বা সন্তো ভ্যালেন্টাইনের রাঙা ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মনে। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে পৃথিবীর সকল ভালোলাগার- ভালোবাসার মানুষের প্রতি রইলো আমার অফুরন্ত ভালোবাসা।

লেখক : সিনিয়র সাব এডিটর, দৈনিক আমার সংবাদ

আমারসংবাদ/এসটিএমএ