রবিবার ২৯ মার্চ ২০২০

১৫ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

ডা. মো. আশরাফুল হক

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ২৬,২০২০, ০২:৩৭

মার্চ ২৬,২০২০, ০২:৪৪

আইসিইউ চিকিৎসকদের সামনে কঠিন সময়

মহামারির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা। যেসব দেশে করোনার সংক্রমণ হয়েছে সেসব দেশে স্বাস্থ্যসেবীদের মধ্যে একটি নতুন বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব হয়েছে, যাকে তারা নাম দিয়েছেন ঝওউঊ ঝকওখখ মানে পার্শ্ববর্তী গুণ, যার দ্বারা অনেকেই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের চিকিৎসকদের সহযোগিতা করতে পারছেন।

এটি জানা জরুরি যে দেশের জনগণের বোঝা উচিত ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের কাজ কী? যেহেতু আগামী দিনগুলোর জন্য এটি খুবই জরুরি বিষয়। সব বড় হাসপাতালে আইসিইউ সেবা মানে যেখানে খুবই জটিল রোগী, যাদের জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

যা না হলে তাদের জীবনাশঙ্কা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা দেওয়া হয় নানা রকম মেশিন ও ওষুধ দিয়ে, যা তাদের শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ অর্গানের কাজ করে, সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগ তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তনে ভূমিকা পালন করে।

এই ধরনের চিকিৎসা ওয়ার্ডে সম্ভব নয়। এটি একটি সমন্বিত সেবা, যেখানে নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, ফার্মাসিস্ট, পুষ্টিবিদ জড়িত থাকেন। রেডিওলজিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, সার্জন, কার্ডিওলজিস্ট ও প্যাথোলজিস্টের সহযোগিতা নিয়ে আইসিইউ চিকিৎসক সেবা প্রদান করেন।

এই ধরনের টিম অ্যাপ্রোচ আইসিইউয়ের জন্য খুবই স্বাভাবিক বিষয়; তবে কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে ভিন্নতা আছে। এখানে লেভেল-৩ পর্যায়ের সাপোর্টের প্রয়োজন।

লেভেল-১ সাপোর্ট হলো, যেখানে রোগীর অক্সিজেনের প্রয়োজন; কিন্তু তা নাকে বা মুখের ওপর দেওয়া মাস্কের সাহায্যে দেওয়া সম্ভব।

যখন রোগীর ভেন্টিলেশন মানে লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন নেই, কিন্তু শরীরের একটি অর্গান সাপোর্টের জন্য মেশিনের দরকার হয়; যেমন—কিডনি ফেইলিওরের জন্য ডায়ালিসিস করা লাগে, প্রেসার কমে যাওয়ার জন্য শিরাপথে মেশিনের সাহায্যে ওষুধ দেওয়া লাগে, প্রেসার দেখার জন্য মনিটরের প্রয়োজন হয়।

ফলে দুজন রোগীর জন্য কমপক্ষে একজন নার্সের প্রয়োজন হয়, তখন তা হলো লেভেল-২ সাপোর্ট। আর লেভেল-৩ হলো, যেখানে লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন একের অধিক অর্গানের জন্য।

ফলে সেখানে একজন নার্স একজন রোগীর জন্য নিয়োজিত থাকেন, সঙ্গে একজন চিকিৎসকের প্রয়োজন, যিনি ২৪ ঘণ্টা মনিটর করতে পারেন। এত নিবিড় সেবা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যসেবীদের ঝুঁকি তাই খুবই বেড়ে যায় করোনায় আক্রান্ত রোগীর সেবা দেওয়ার সময়।

ব্রিটিশ আইসিইউ চিকিৎসক টিম কুক লন্ডনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, কভিড-১৯ মোকাবিলায় আইসিইউ সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন প্রায় সাত গুণ।

এই সক্ষমতা বলতে তিনি চারটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছেন— স্থান, সেবাকর্মী, যাবতীয় আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র এবং পরিশেষে গুণগত মান।

আইসিইউয়ের জন্য যে স্থান প্রয়োজন তার ব্যাপ্তি বিশাল। এর মধ্যে থাকে মূল কক্ষের বাইরে পার্শ্ববর্তী নিরাপদ কক্ষ, অক্সিজেন— এয়ার- সাকার মেশিনের জন্য সুবিধা, ল্যাব ও আইটি সাপোর্ট এবং বিবিধ জিনিসপত্র রাখার স্থান।

সেবাকর্মী যারা রয়েছেন, তাদের সংকট যেকোনো সময়ে হতে পারে, যেহেতু মহামারির সময়ে যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে বা আইসোলেশনের প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর ব্যবহূত জিনিসপত্র প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজন হয় বিধায় তাদের নিরবচ্ছিন্ন জোগানের প্রয়োজন।

বড় বড় হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবহূত হয় বড় কোনো অপারেশনের পর রোগীর সাপোর্টের জন্য। এসব স্থান কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্বাচিত হলে এসব অপারেশন করার সুযোগ আর থাকে না।

কারণ সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয় না। আবার অন্য অনেক হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবহূত হয় হঠাৎ খারাপ হওয়া রোগীদের সেবার জন্য। এই সেবা তখন বন্ধ করে দিতে হয়।

কভিড-১৯ চিকিৎসায় যেহেতু লেভেল-৩ পর্যায়ের সাপোর্টের প্রয়োজন, সেখানে একজন নার্স একজনের জন্য নির্ধারিত, সেখানে এসব পরিস্থিতিতে লোকবল সংকটের জন্য অপারেশন থিয়েটারের সেবাদানকারীদের নিয়োগ করা হয়।

ফলে সেই স্থান শূন্য হয়ে যায়। কোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এমন দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। সমগ্র বিশ্বের সেবাদানকারী মানুষগুলো অসাধারণ ভূমিকা পালন করে চলেছে এই দুর্যোগ মোকাবিলায়।

হাসপাতালগুলো তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করছে যতটুকু তাদের পক্ষে সম্ভব; কিন্তু এখনো আমরা অনুধাবন করতে পারছি না এই দুর্যোগের ঢেউ কত জোরে আঘাত করতে পারে আমাদের ওপর। স্বাভাবিক অবস্থায় আইসিইউ অনেক জীবন বাঁচায়; কিন্তু বর্তমান সময়টা ভিন্ন।

শিগগিরই এটির উপযুক্ত তরিকা নির্ধারণ সম্ভব নয় আবার অনেকের সেই ধরনের সাপোর্টের প্রয়োজন না-ও হতে পারে। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে রোগীরা এক রোগ নিয়ে আসে আবার অন্য রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যেহেতু এই সময়ে শরীরের ক্ষমতা থাকে সর্বনিম্ন।

জীবন বাঁচানো হয়ে যায় অনেক কঠিন, কারো বা সুস্থতার জন্য অনেক দিন সময় লাগে, যা প্রায় মাসের অধিকও হতে পারে। রোগীর পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য সেবাকর্মীদের সঙ্গে পরিবারের ভূমিকাও অনেক।

চিকিৎসার নৈতিক অংশ হলো— ভালো চিকিৎসা প্রদান, ক্ষতি এড়িয়ে চলা, ন্যায্যতার ভিত্তিতে চিকিৎসা ও রোগীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক চিকিৎসা প্রদানের নিশ্চয়তা।

এসবের ওপর নির্ভর করে আইসিইউয়ে রোগীর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে এসব কিছু চিন্তা করার অবকাশ চিকিৎসকের থাকে না। সিদ্ধান্ত নিতে হয় কাকে চিকিৎসা দিলে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইতালিতে বর্তমানে চিকিৎসকরা অনেকটা জোর করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যার নাম ট্রায়াজ, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি এমন যে কোথায় বেশি মনোযোগ দিলে ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।

অনেকেই বলেন, চিকিৎসকরা এমনটিই করে থাকেন বেশির ভাগ সময়। টিম কুক এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, প্রতিদিন চিকিৎসকরা রোগীর চিকিৎসা নিয়ে অনেকটা ঝামেলার মধ্যে পড়েন।

কারণ তাদের সামনে সীমিত সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যখন রিসোর্স সংক্রান্ত ট্রায়াজ নিয়ে কাজ করতে হয় তখন চিন্তা করা হয় কোনটি ভালো এবং কোনটি বেশির ভাগের জন্য ভালো।

এটিই হলো মৌলিক পরিবর্তন। যখন চিকিৎসকদের চিন্তা করতে হয় কতটুকু সামর্থ্য রয়েছে, যা অতিরিক্ত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যখন সব রোগীর চিকিৎসা একেবারে শতভাগ দেওয়া সম্ভব হয় না তখন মূল চিন্তা থাকে কোনটি সমাজের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যখন এমন কিছুর সৃষ্টি হবে তখন অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ থাকবে না।

কিন্তু এটি চিকিৎসকরা একা করতে পারবেন না। প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে কী করা উচিত, সেই সিদ্ধান্ত নিতে সমাজের বাকিদের অংশগ্রহণ করা উচিত। বর্তমান সংকটপূর্ণ অবস্থায় চিকিৎসক, সমাজসেবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা জরুরি।

এই মহামারি মোকাবিলায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে। জনগণ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও নিজ থেকে আইসোলেশনের মাধ্যমে এই মহামারিতে আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারে খুব সহজেই।

এরই মাধ্যমে আপনি এবং আপনার স্বজন রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারে। এর মাধ্যমে আইসিইউয়ে স্থান সংকট কমবে, যা হয়তো অন্য কারো জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি