সোমবার ০১ জুন ২০২০

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

মোমিন মেহেদী

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০৩:১৬

এপ্রিল ০৮,২০২০, ০৩:২০

করোনা ভাইরাসে বা উপোস মৃত্যু!

করোনাক্রান্ত্র বাংলাদেশে নির্মমভাবে বরগুনার আমতলীয় থানায় ওসির রুমে মানুষ হত্যা, মসজিদে ধর্ষণ, ত্রাণের টাকা ভাগাভাগির পাশাপাশি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজায় পুলিশি নিরাপত্তা চেয়ে আইজিপি বরাবর একটি চিঠি দেয়ার ঘটনা ঘটে।

চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার স্বাক্ষরিত এ চিঠিটি দেয়া হয়েছে। হায়রে দেশ, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরে এসেও মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরে এসেও জাতির পিতার নাম বিক্রি করে জমি দখল হয়, শত বর্ষ পালন হয় কিন্তু তার কথা মেনে কেউ দুর্নীতি থেকে সরে আসে না।

বরং দুর্নীতি, দমননীতির রাজনীতির রাজনীতি করা হয়। অবশ্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বশ্রেষ্ঠ একটি কাজের উদাহরণ টেনেছেন।

তার সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা ছয় মাস স্থগিত হওয়ার পর সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন শেষে গত ২৫ মার্চ মুক্তি পান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

দীর্ঘ ২৫ মাস কারাবন্দি থাকার পর ছয় মাসের জন্য মুক্তি পাওয়ার পর করোনা ভাইরাসের কারণে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন বিএনপি প্রধান। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম সৌখিন দেশ থাইল্যান্ডের রাজা ঘটালেন ভিন্ন ঘটনা। রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন জার্মানিতে এক বিলাসবহুল হোটেলে ‘সেলফ আইসোলেশনে’ অবস্থান করছেন।

সঙ্গে রয়েছেন ২০ জন ‘হারেম সুন্দরী’ উপপত্নী। রাজার এই কাণ্ড নিয়ে থাইল্যান্ডজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ৬৭ বছর বয়সী এই রাজার সঙ্গে রয়েছেন ২০ জন উপপত্নী।

এছাড়াও রয়েছেন অসংখ্য চাকর-বাকর। তবে রাজার সঙ্গে তার চার স্ত্রীর কেউ আছে কিনা তা জানা যায়নি। থাইল্যান্ডের বাসিন্দারা বিদেশে বিলাসবহুল হোটেলে রাজার এভাবে আলাদা থাকার খবর পেয়ে বেজায় ক্ষেপেছেন।

তারা থাইল্যান্ডের নিয়ম ভেঙে সামাজিক মাধ্যমে এর কড়া সমালোচনা করছেন। থাইল্যান্ডে ইতোমধ্যে টুইটারে হ্যাশট্যাগ দিয়ে হোয়াই ডু উই নিড আ কিং’ ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। দেশটির এক মানবাধিকার কর্মী থাইল্যান্ডজুড়ে করোনা ভাইরাসের ভয়ঙ্কর রূপ নেয়ার সময় এভাবে রাজার জার্মানি ভ্রমণের প্রসঙ্গটি তুলেছেন। আর তা তোলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টুইটারে রাজার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ওই প্রশ্নের ঝড় বয়ে যায়।

থাইল্যান্ডের আইনানুযায়ী, রাজাকে কেউ অপমান করলে কিংবা রাজার সমালোচনা করলে তার ১৫ বছরের জেল হতে পারে। থাইল্যান্ডে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩৮৮ জনের করোনা ধরা পড়েছে।

জার্মান ট্যাবলয়েড পত্রিকা ‘বিল্ড’ জানিয়েছে, রাজা মহা ভাজিরালংকর্ন পুরো গ্র্যান্ড হোটেল সোনেনবিচল বুক করেছেন। কেননা, করোনার থাবা থেকে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও রাজা-মহারাজারাও রেহাই পাচ্ছেন না।

ইতোমধ্যে আক্রান্ত ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও তার ছেলে প্রিন্স চার্লস। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন স্পেনের রাজকন্যা মারিয়া। তবে থাইল্যান্ডের রাজা এখনও আক্রান্ত হননি।

বাংলাদেশের রাজা না থাকলেও রাজার মত জীবনযাপন করেন এমন অন্তত হাজার রাজা- জীবন নিয়ে আছেন চরম আরামে। এমন একটা পরিস্থিতিতে সরকারের বিরুদ্ধে ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক দল বিএনপির অভিযোগের শেষ নেই।

তাদের অভিযোগ-‘সরকারের পলিসি হলো, ‘নো কিট, নো করোনা। নো টেস্ট, নো করোনা। নো পেসেন্ট, নো করোনা। যে পলিসি করে ইরান ও ইতালি সরকার তাদের দেশের সর্বনাশ করেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে গোটা বিশ্ব থেকে।

অথচ আমরাও সেই লুকানোর পলিসি দিয়েই সবকিছু ম্যানেজ করতে চলেছি। উল্টো প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে সরকারের এই লুকানো পলিসি যাতে কেউ প্রকাশ না করতে পারে তার জন্য নানা রকমের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই লুকানোর পলিসির নাম দিয়েছে ‘গুজব’।’

আজ এমন এক অকল্পনীয় ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আপনাদের সমীপে উপস্থিত হয়েছি, যখন করোনা ভাইরাসের মহাদুর্যোগের কারণে সামনে বসে সরাসরি কথা বলার মতো পরিবেশ নেই। কোভিড-১৯ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নিয়েছে।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, দুই মাস সময় পেলেও সরকার সমস্যার দিকে কোনও মনোযোগ দেয়নি। উপদ্রুত দেশগুলো থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনকারী প্রবাসী ভাই-বোনদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণে কোয়ারেন্টাইন করার সরকারি ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, সমন্বয়হীনতা ও প্রস্তুতির অভাব দেশকে কত বড় বিপদে ফেলতে পারে।

মহাবিপদ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নেই, সমন্বয় নেই, আক্রান্ত রোগী শনাক্তকরণের পর্যাপ্ত উপকরণ ও ব্যবস্থাপনা দেশে নেই; নেই চিকিৎসকদের রক্ষার ব্যবস্থা, নেই যথেষ্ট মাস্ক, স্যানিটাইজার ও ভেন্টিলেটর। পরীক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া সরকার আক্রান্ত সংখ্যার যে তথ্য দিচ্ছে তা বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে না’।

এত এত কথার খৈ যে ফোটাচ্ছে বিএনপি, তারা পেরেছে কি জনগণের পাশে দাঁড়াতে? পারেনি। বরং তাদের চেয়ে অন্তত ৩০ বছর পর রাজনীতিতে এসেছে, ছাত্র-যুব-জনতাকে সাথে নিয়ে কাজ করছে নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবির রাজনীতিকরা।

নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অভুক্ত-ছিন্নমূল জনগণকে খাবার দিয়েছে, মাস্ক দিয়েছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়েছে। তারা সকারের বিরুদ্ধে কথা না বলে কাজ করে যাচ্ছে ছাত্র-যুব-জনতাকে সাথে নিয়ে অন্যায়-অপরাধ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে। “করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে গত ঘণ্টায় পাঁচজনের মৃত্যুর সংবাদ ছাপা হয়েছে বরের কাগজে।

কী ভীতিকর পরিস্থিতি! ইলেকট্রনিক্স, প্রিন্ট মিডিয়ার খবরের সঙ্গেও সরকারের ব্রিফিংয়ের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বারবার বলে আসছে, করোনা আক্রান্তদের শনাক্ত করতে যত বেশি সম্ভব পরীক্ষা করতে হবে। অথচ সরকারের পুরো ব্যবস্থাপনা হলো পানিতে হালবিহীন নৌকার দুরাবস্থা যেমন।

আর বড় বড় লেকচার চলছে সারাদেশে। বলা হচ্ছে- প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও নগদ টাকা ছাড়সহ সারাদেশের জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল।

তাদের সঙ্গে অফিস করছেন মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তারাও। পর্যায়ক্রমে ডিউটি করছেন তারা। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন প্রতিমন্ত্রী একান্ত সচিব (পিএস) খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান।

আপনাদের মত আমিও খেয়াল করেছি যে, করোনা ভাইরাসের কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশের সকল অফিস-আদালত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি দেয়া হয়েছে। অঘোষিত লকডাউনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে কর্মহীন হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।

এসব কর্মহীন মানুষকে সহায়তা দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে করে অর্ধহারে-অনাহারে রয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। খাবার পাচ্ছে না তারা, পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য।

তবু বলা হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রী আমাদের টেলিফোনে নির্দেশ দিয়েছেন যে, এই লকডাউনে কোনো রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ফেরিওয়ালা, চা বিক্রেতা, দিনমজুর কেউ যেন খাদ্যকষ্টে না ভোগে। সবার পাশে যেন প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও দলের নেতাকর্মীরা খাদ্য নিয়ে হাজির হন।’ বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো।

গত ২৪ মার্চ ২৪ হাজার ৭০০ টন চাল এবং ৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও তা জনগণ পর্যন্ত পৌছেনি, পৌঁছেনি পরে ২৮ মার্চ আবার সাড়ে ৬ হাজার টন চাল ও এক কোটি ৩১ লাখ টাকা নতুন করে বরাদ্দের অধিকাংশ খাবার আর টাকাই। বরং করোনার ভয়ে ঘরবন্দি মানুষের মাঝে বিরাজ করছে নানা শঙ্কা। কাজ না থাকায় অতিদরিদ্ররাও পড়েছেন বিপাকে।

এ বিপদেও তাদের পাশে নেই বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি। সংসদ সদস্য, মেয়র থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার সবারই একই হাল। এমপিদের দুই-একজন ঢাকায় বসে ভিডিও কনফারেন্সে দলীয় নেতাদের সান্ত্বনা দিলেও সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের সহায়তা করতে দেখা যাচ্ছে না।

কেউ কেউ আবার মোবাইল ফোন ধরা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছেন। অথচ এই নেতাদেরই অনেকে ভোটের সময় জনগণের জন্য জীবন দিয়ে দেয়ার ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছিলেন। করোনা ভীতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঘর থেকে বের হচ্ছেন না অধিকাংশ সিটি করপোরেশনের মেয়রগণ।

যদিও বিভিন্ন পয়েন্টে হাতধোয়া, অধিকাংশ ওয়ার্ডে জীবাণুনাশক পানি ছিটানো এবং সর্বশেষ দরিদ্র মানুষদের ১০ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু এবং ২ কেজি করে ডাল বিতরণ করার ঘোষণা আছে, বাস্তবে তার ছিটেফোটাও নেই।যে কারণে আজ দেশে সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে যতটা না উদ্বিগ্ন, তার থেকে অনেক বেশি উৎকণ্ঠিত খাদ্য ও পেটের ক্ষুধা নিয়ে।

তাদের একটিই কথা- সব বন্ধ থাকলে আমরা খামু কেমনে? বউ-বাচ্চারে কী খাওয়ামু? ভিক্ষা করতে গ্রামে বের হলে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ আতঙ্কে মানুষ ভিক্ষা না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। আমাদের করোনা ভাইরাসে মরতে অইবো না।

কিছু দিন এমনভাবে চললে আমরা এমনেই না খাইয়া মইরা যামু। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল আখাউড়ার উত্তর ইউনিয়নের রামধনগর গ্রামের অন্ধপল্লীর ৪০টি পরিবারে ছেলে-বৃদ্ধ, শিশু ও নারী নিয়ে অন্তত শতাধিক অন্ধ সুবিধাবঞ্চিত ভিক্ষুক আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে ট্রেনযাত্রীদের ওপর নির্ভরশীল।

তারা আখাউড়া রেলস্টেশনে চলাচলকারী বিভিন্ন আন্তঃনগর, মেইল ও লোকাল ট্রেন যাত্রীদের কাছে হাত পেতে যা পায় তা দিয়ে চলে তাদের সংসার। করোনা মহামারীর কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় অন্ধপল্লীর বাসিন্দাদের রেলস্টেশনে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ভিক্ষা করতে গ্রামে বের হলে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে গ্রামের মানুষ ভিক্ষা না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। তাই দিন আনে দিন খাওয়া অন্ধ জনগোষ্ঠীর আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

এভাবে বন্ধ হয়ে আছে অসংখ্য এলাকার মানুষের রুজির রাস্তা। না আছে সরকারি, না আছে বেসরকারি সহযোগিতা। ঘরে বসে বসে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ সবাই দিতে পারে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মত, মওলানা ভাসানীর মত অবিরত তারা রাজপথে থেকে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারে না, করতে পারে না দুবেলা দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা।

সেই কথার সূত্র ধরে বলতে চাই, আমরা আমজনতার অর্থনৈতিক মুক্তি যেমন চাই, তেমন নিরাপত্তা চাই। আর তাই চাই- খুব দ্রুত দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাসকারী জনগণকে না খেয়ে মৃত্যুর রাস্তা থেকে সরিয়ে আনা হোক।

চাই লাখ কোটি টাকার যে ধংসের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ, সেখান থেকে কৌশলে ফেরত আসুক আর দুর্নীতির মাধ্যমে যারা এডিবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে দেয়া করোনা প্রতিরোধ অনুদান আত্মসাৎ করেছে, তাদেরকে চিহ্নিত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তালিকা দেয়া হোক, কাটুক সকল সমসার জাল...।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট